কিন্তু সদানন্দকে রুখবে এমন শক্তি কার আছে তখন? নয়নতারা সদানন্দর হাত দুটো চেপে ধরে বিপদ আটকাবার চেষ্টা করলে। কিন্তু সদানন্দর গায়ে তখন যেন অসুরের শক্তির আবির্ভাব হয়েছে। সে তখনও একমনে ভারি কাঁচের দোয়াতদানিটা দিয়ে নিজের কপাল লক্ষ্য করে জোরে জোরে একটার পর একটা অনবরত আঘাত করে চলেছে। নিজেকে মারাত্মক আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে যেন সে পৃথিবীর তাবৎ লোকের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবার পথ বেছে নিয়েছে–
আর নয়নতারা সেই অস্পষ্ট অন্ধকারের মধ্যে দেখতে পেলে মানুষটার কপাল থেকে মুখে গায়ে কাপড়ে অঝোরধারায় রক্ত গড়িয়ে পড়ছে–
দেখতে দেখতে নয়নতারার মাথাটা কেমন ঘুরে গেল। সেই অস্পষ্ট অন্ধকার ঘরের ভেতরে সেই রক্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে প্রাণপণ আর্তনাদ করে উঠলো—মা—মা–মা গো—
.
হয়ত তখন মাঝরাত। মাঝরাতের বোধ হয় একটা যাদু আছে। বিশেষ করে শীতকালের মাঝরাতের। কদিন ধরে প্রীতির শরীর আর মনের ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। সেই সেদিনই প্রথম একটু চোখ দুটো বুজিয়েছিল। তারপর শেষ রাত্রের দিকে ঘুম থেকে উঠল প্রীতি। সবাই তখন অঘোরে ঘুমোচ্ছে। চারিদিকে কোথাও কারো সাড়াশব্দ নেই। প্রীতির যখন প্রথম বিয়ে হয়েছিল তখন শাশুড়ীর সঙ্গে নদীতে স্নান করতে যেত। কী কনকনে ঠাণ্ডা তখন। গ্রীষ্মকালে অত কষ্ট হতো না। কিন্তু শীতকালে ঘুম ভাঙতে চাইত না মোটে।
শাশুড়ী বলতো–তোমার কোনও ভয় নেই বউমা, দেখবে নদীর জল গরম। একবার নদীতে ডুব দিলে দেখবে সব শীত পালিয়ে গেছে–
তা সত্যিই, একবার নদীর জলে ডুব দিলে আর শীত করতো না। বাড়ি থেকে নদী বেশী দূর নয়। রাস্তার দুপাশে চৌধুরীদের বাঁশঝাড়। কেউ কোথাও নেই। ছোট মশাই কর্তাবাবুর ঘরে গিয়ে শুয়েছেন। বাইরের উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালো সে। আকাশে তারাগুলো তখন পিট পিট করে চাইছে। কোথাও এতটুকু ধোঁয়া নেই, কুয়াশা নেই। কী মনে করে হঠাৎ তার খেয়াল হলো সেই নদীতে গিয়ে স্নান করে এলে ভাল হয়।
পাশেই রান্নাঘর। রান্নাঘরের ওপাশে গৌরী থাকে। সেখানে দরজার সামনে গিয়ে ডাকলে–গৌরী, ওলো গৌরী–
গৌরী বউদির গলা পেয়ে ধড়মড় করে উঠে পড়েছে। কিছু বিপদ হলো নাকি বউদির!
দরজা খুলেই বাইরে এসেছে। বললে–কী বউদি? কী হয়েছে?
প্রীতি বললে–হ্যাঁ রে, নদীতে যাবি?
–নদীতে?
প্রীতি বললে–হ্যাঁ, তোর ছোট মশাই কর্তা মশাই-এর ঘরে শুয়েছে আজ, হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। মনে পড়ে গেল আজ তো শুক্লা ষষ্ঠী, আজকে নদীতে গিয়ে চান করে এলে হয়, তা চ–খোকাও ফিরে এসেছে, বউমার ঘরে গিয়ে শুয়েছে—
তা গৌরীও আপত্তি করবার লোক নয়। সেও তৈরি হয়ে নিয়ে সঙ্গে গেল। রাস্তা নির্জন। নদীতে একটা ডুব দিয়ে সবে উঠেছে, দেখলে একজন সাধু। সাধুকে দেখে প্রীতি তাড়াতাড়ি মাথায় ঘোমটা দিতে যেতেই সাধু এগিয়ে এল।
বললে–এত রাত্রে তুই স্নান করতে এসেছিস যে বেটি?
প্রীতি বললে–আমার মানত ছিল বাবা–আজ শুক্লা ষষ্ঠী, আমার ছেলে আজ ঘরে ফিরে এসেছে তাই চান করতে এসেছি–
সাধু কী ভাবলে কে জানে, তারপর বললে–সামনে তোর খুব বিপদ আসছে বেটি, খুব হুঁশিয়ার–
প্রীতির বুকটা থরথর করে কেঁপে উঠলো। বললে–কী বিপদ বাবা? কীসের বিপদ? আমার খোকার কোন খারাপ হবে না তো?
সাধু বললে–হবে, খারাপ হবে। তুই তোর বাড়ি থেকে আমার ভক্তকে তাড়িয়ে দিয়েছিস, তাকে অপমান করেছিস–তোর খারাপ হবে না তো কার খারাপ হবে?
প্রীতি সাধুর পা জড়িয়ে ধরতে গেল, বলতে গেল–তুমি আমার খোকার কোনও অমঙ্গল কোর না বাবা, তুমি যা চাও আমি তাই-ই দেব, আমি আমার সর্বস্ব দেব তোমাকে, আমার যা হয় হোক, আমার খোকার যেন কোনও অমঙ্গল না হয় বাবা….
বলতে বলতে সেই নদীর ধারেই প্রীতি সাধুর পা-দুটো জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলো। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও তার গলা দিয়ে কান্নার শব্দ বেরোল না। তারপর একটা অসহ্য যন্ত্রণায় আচমকা ঘুম ভেঙে গেল তার। ঘুম ভেঙে যেতেই প্রীতি চারদিকে চেয়ে দেখলে। কোথায় সাধু, গৌরীই বা কোথায়? সে তো নিজের বিছানাতেই শুয়ে রয়েছে। কেউ তো কোথাও নেই তবে?
অন্ধকারের মধ্যে চোখ দুটো ভালো করে খুলে সেই অদ্ভুত স্বপ্নটা আবার মনে করবার চেষ্টা করলে সে। এমন স্বপ্ন কেন সে দেখতে গেল! কীসের বিপদ হবে তার? কখন সে সাধুকে অপমান করলে? সাধুবাবা তো নিজেই একদিন বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।
না, স্বপ্ন স্বপ্নই। স্বপ্ন কখনও সত্যি হয় না। তার কেন বিপদ হবে। খোকা এতদিন পরে বাড়ি ফিরে এসেছে। এতদিন পরে আজ সে বউমার ঘরে শুয়েছে। খোকার কেন অমঙ্গল হতে যাবে!
প্রীতি এক মনে অদৃশ্য বিধাতা-পুরুষকে লক্ষ্য করে প্রার্থনা করতে লাগলো আমার খোকার কোনও অমঙ্গল কোর না ঠাকুর। সে ভাল থাকুক, আমার বড় সাধের একটি মাত্র ছেলে, তাকে তুমি দেখো ঠাকুর। তার ভাল কোর–
হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ শব্দে প্রীতি চমকে উঠলো।
বউমার গলার আওয়াজ না? বউমা যেন চেঁচিয়ে খোকার সঙ্গে কথা বলছে। তবে কি ঝগড়া করছে নাকি দুজনে?
আর তারপরেই সেই বুকফাটা আর্তনাদ—মা–মা–মা গো—
ধড়মড় করে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠেছে প্রীতি। তারপর আলোটা জ্বেলে নিয়ে খোকার ঘরের সামনে গিয়ে ডাকতে লাগলো–খোকা–খোকা–খোকা–
কেউ সাড়া দিলে না–
