–শুনেছি।
–কালীগঞ্জের বউকে আমাদের এই বাড়িতে খুন করা হয়েছে তা তুমি শুনেছ? জানো, তার কোনও অপরাধ ছিল না? এই যা কিছু আমাদের সম্পত্তি দেখছো সব তাদের টাকায়। মা’র সিন্দুকের মধ্যে কত টাকা কড়ি-গয়না-হীরে-মুক্তো আছে সব সেই কালীগঞ্জের বউ এর টাকায় কেনা।
নয়নতারা বললে–জানি।
–তাও জানো তুমি? আর এও কি জানো তুমি যে সেই কালীগঞ্জের বউকে কর্তাবাবু দশ হাজার টাকা দেবে বলেছিল? তাও পাছে দিতে হয় তার জন্যেই তাকে খুন করা হয়েছে? তুমি জানো, কপিল পায়রাপোড়া বলে একজন প্রজা ছিল আমাদের, সে কর্তাবাবুর অত্যাচারে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে? জানো তুমি, মানিক ঘোষ নামে একজন প্রজা একদিন ভাত খেতে বসেছিল, সেই ভাতের থালা আমাদের বংশী ঢালী পা দিয়ে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল বাকি খাজনার দায়ে? জানো, ফটিক প্রামাণিক বলে আর একজন….
নয়নতারা কথার মধ্যিখানে বাধা দিয়ে বলে উঠলো–জানি জানি, আমি সব জানি–
কথা বলতে বলতে সদানন্দ উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছিল। বললে–তুমি জানো?
–হ্যাঁ জানি। এতদিন তোমাদের বাড়িতে এসেছি, কানও খুলে রেখেছি, জানতে পারবো না? শুধু আমি কেন, এ বাড়ির কারো সেসব জানতে আর বাকি নেই–বলতে গেলে বোধ হয় এ গাঁয়েরও সবাই তা জানে।
–তাহলে? তাহলে কেন তুমি এর পরেও আমায় এ অনুরোধ করছো?
নয়নতারা বললে–যারা দোষ করেছে তাদের তুমি যত ইচ্ছে শাস্তি দাও না, আমি কিছু বলতে যাবো না, আমি কী দোষ করলুম যে আমাকে তার জন্যে শাস্তি পেতে হবে?
সদানন্দ বললে–এর উত্তর তুমি চাও?
নয়নতারা বললে–এর উত্তর না দিলে আজ আমি তোমাকে ঘর থেকে যেতে দেব না। তোমাকে বলতেই হবে তোমার কর্তাবাবুর পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমাকে করতে হবে কেন?
সদানন্দ বললে–কর্তাবাবুর পাপের প্রায়শ্চিত্ত তুমি করতে যাবে কেন? প্রায়শ্চিত্ত করবো আমি। আমিই কর্তাবাবুর একমাত্র বংশধর। আমি চাই আমার সঙ্গেই এ বংশের শেষ হয়ে যাক, এ বংশ নির্বংশ হোক, এ বংশ থেকে সব পাপ নিশ্চিহ্ন হোক–এ বংশ পবিত্র হোক–
নয়নতারা খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বললে–কিন্তু আমার কথার জবাব তো আমি পেলুম না! তুমি করবে প্রায়শ্চিত্ত, কিন্তু তার জন্যে আমি ভুগবো কেন?
সদানন্দ এ প্রশ্নের কোনও জবাব দিতে পারলে না।
নয়নতারা বললে–কই চুপ করে রইলে যে, জবাব দাও–আমি তোমার স্ত্রী হয়েছি বলে কি তোমার প্রায়শ্চিত্তের ভাগ আমাকেও নিতে হবে? এই কি তোমার জবাব?
সদানন্দ বললে–ধরে নাও না-হয় তাই–
নয়নতারা বললে–কিন্তু আমাকে কেন তুমি তাহলে এর মধ্যে জড়ালে? আমার কি তাহলে এখন থেকে কোন সাধ-আহ্লাদ থাকবে না? আমি কি তাহলে সারা জীবন এমনি করেই তোমাদের বাড়িতে একা একা রাত কাটাবো? আমার মনের কথা বলবার কোনও লোকই থাকবে না?
সদানন্দ কী জবাব দেবে বুঝতে পারলে না।
নয়নতারা সদানন্দর দুটো হাত ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললে–কী? চুপ করে রইলে কেন? জবাব দাও–বলো আমি কী নিয়ে থাকবো? আমি কাকে আশ্রয় করে বাঁচবো? আমার জীবন কেমন করে সার্থক হবে? আমি কেন তোমার পূর্বপুরুষের পাপের ভাগী হতে যাবো? এর জবাব না দিলে আমি তোমাকে আজ ছাড়বো না। তোমাকে এর জবাব আজকে দিতেই হবে–
সদানন্দ আর পারলে না। নয়নতারার দুটো হাত সরিয়ে দিয়ে বলে উঠলো–পাগলামি কোর না। সরো, পথ ছাড়ো, আমাকে যেতে দাও–
নয়নতারা চিৎকার করে উঠলো। বললে–পাগলামি আমি করছি, না তুমি করছো! বলছি তো, আমার কথার জবাব না দিলে আমি তোমাকে কিছুতেই যেতে দেব না–
সদানন্দ বললে–এই রাত্তিরবেলা কেলেঙ্কারি না করে তুমি ছাড়বে না?
নয়নতারা বললে–কেলেঙ্কারির আর বাকিটা কী রেখেছ যে কেলেঙ্কারির ভয় দেখাচ্ছ আমাকে? আমি যে এখনও তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারছি, এখনও যে আত্মঘাতী হই নি এইটেই তো আমার পক্ষে যথেষ্ট।
সদানন্দ এবার কঠোর হয়ে উঠলো। বললে–ওসব কথা আমি শুনতে চাই না। তুমি আমাকে যেতে দেবে কি না তাই বলো?
নয়নতারা বললে–আমার কথার জবাব না দিলে আমি তোমাকে যেতে দেব না–
–কীসের জবাব চাও তুমি? কোন্ কথার জবাব?
–ওই যে বললুম, তুমি যদি আমার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক না রাখো তাহলে আমি কি নিয়ে থাকবো? আমি কাকে আশ্রয় করে বাঁচবো?
সদানন্দ বললে–তুমি কি নিয়ে থাকবে তার জবাবদিহি কি আমাকে করতে হবে?
নয়নতারা বলে উঠলো–আমি তো তোমারই স্ত্রী, এর জবাবদিহি তুমি করবে না তো কে করবে?
–আবার ওই এক কথা? বলছি, আমাকে যেতে দাও–সরো—
নয়নতারা বন্ধ দরজার ওপর পিঠ ঠেকিয়ে বললে–না, আমি আজ তোমাকে কিছুতেই যেতে দেব না, তুমি তোমার যা ইচ্ছে তাই করতে পারো–
–তাহলে যেতে দেবে না তো?
বলে সদানন্দ তার প্রশ্নের জবাবের অপেক্ষায় না থেকে হঠাৎ এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসলো। সদানন্দ যেন কী ভাবলে একবার। তারপর সেখান থেকে একবার তার টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। টেবিলের ওপর কী যেন সে খোঁজবার চেষ্টা করতে লাগলো। অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না। সদানন্দ হঠাৎ সামনে যা পেলে তাই-ই হাতে তুলে নিলে। নয়নতারার মনে হলো একটা কাঁচের ভারি দোয়াতদানি সেটা। সেই দোয়াতদানিটা দিয়েই সদানন্দ তার নিজের কপালে ঢাঁই ঢাঁই করে মারতে লাগলো।
নয়নতারা এই অভাবনীয় ঘটনার পরিণতিতে এক মুহূর্তের জন্যে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। তারপর সদানন্দর সামনে গিয়ে বাধা দেবার চেষ্টা করলে। বললে–করছো কী, করছো কী?
