–কর্তব্য? সদানন্দ কথাটা শুনে যেন নিজের মনেই শব্দটা একবার উচ্চারণ করলে।
–হ্যাঁ, কর্তব্য! আমার ওপরেও তো তোমার একটা কর্তব্য আছে। বউ-এর ওপর স্বামীর যেমন একটা কর্তব্য থাকে তেমনি।
সদানন্দ বললে–তোমার সঙ্গে আমি কর্তব্য করা নিয়ে ঝগড়া করতে চাই না। এটা ঝগড়া করবার সময়ও নয়।
–ঝগড়া?
নয়নতারা যেন অবাক হয়ে গেল। বললে–ঝগড়া আমি তোমার সঙ্গে কখন করলুম? আমি কি তোমার সঙ্গে একটাও ঝগড়ার কথা বলেছি? আর এখন যদি কথাগুলো না বলি তো কখন বলবো? তোমার সঙ্গে আমার দেখাই বা হচ্ছে কখন? তুমি তো আমাকে দেখলেই মুখ ফিরিয়ে নাও
সদানন্দ বলে উঠলো–দেখ, বিয়ে আমি তোমাকে করেছি সত্যি, কিন্তু তুমি যদি ভেবে থাকো যে, আমি তোমার সঙ্গে স্বামীর মতন ব্যবহার করবো, আমরা দুজনে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বাস করবো ত সে কথা তুমি ভুলে যাও। তোমার সঙ্গে পারতপক্ষে আমার দেখা হবে না–
নয়নতারা সদানন্দর এই স্পষ্ট কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল। খানিকক্ষণ তার মুখ দিয়ে কোনও কথাই বেরোল না।
তারপর জিজ্ঞেস করলে–এই-ই কি তোমার শেষ কথা?
সদানন্দ বলেল–হ্যাঁ, এই-ই আমার শেষ কথা। কিন্তু এর পরেই তুমি হয়ত জিজ্ঞেস করবে, তাহলে আমি তোমায় বিয়ে করলুম কেন! তার উত্তরে বলি আমি ভুল করেছিলুম। আমি অন্য লোকের কথায় বিশ্বাস করে ভুল করেছিলুম। আমাকে তারা সবাই স্তোকবাক্য দিয়েছিল। সেই তাদের কথা বিশ্বাস করাই আমার অন্যায় হয়েছিল। সেই বিশ্বাস করার মধ্যে যদি কিছু অন্যায় হয়ে থাকে তো স্বীকার করছি আমি অন্যায় করেছি। তার জন্যে তুমি আমায় যা শাস্তি দেবে আমি তা মাথা পেতে নিতে রাজি আছি–
নয়নতারার চোখ ফেটে জল আসতে চাইল। কিন্তু অনেক কষ্টে তা চেপে রেখে বললে–শাস্তি? আমি তোমায় শাস্তি দেব? স্ত্রী হয়ে আমি তোমাকে শাস্তি দেব?
–তা অন্যায় যখন করেছি তখন শাস্তি অস্বীকার করবো কী করে?
নয়নতারা বললে–যখন অন্যায় করেছিলে তখন তো শাস্তির কথা তোমার মনে পড়ে নি? তখন তখন শাস্তির কথাটা মনে পড়লে হয়ত আমার জীবন এমন করে নষ্ট হতো না–হয়তো আমি এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতুম!
সদানন্দ খানিকক্ষণ কী ভাবলে। তারপর বললে–তুমি শাস্তিও দেবে না আবার যন্ত্রণাও ভোগ করবে, এর প্রতিকার আমি কী করে করবো বলো তো?
নয়নতারা বললে–কিন্তু তুমিই বলে দাও আমি তোমায় কী শাস্তি দেব?
সদানন্দ বললে–-তোমার যা শাস্তি মনে পড়ে তাই-ই দাও, আমি মাথা পেতে নেব। কিন্তু ওই যে বললুম তোমার সঙ্গে পারতপক্ষে আমার দেখা হবে না
–কিন্তু আমি যদি সেই শাস্তিই দিই? আমি যদি বলি তোমাকে রোজ রাতে আমারই ঘরে আমারই বিছানায় শুতে হবে?
সদানন্দ যেন একটু দ্বিধায় পড়লো। বললে–আমি তোমার সব শাস্তি মাথা পেতে নেব, শুধু ওই একটা শাস্তি ছাড়া–
–কিন্তু আমার মুখের দিকে চেয়ে দেখ, ও কি তোমার কাছে একটা শাস্তি?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ।
নয়নতারা সদানন্দর হাতটা তখন ছেড়ে দিয়েছে। হাত ছেড়ে দিয়ে আরো কাছে এসে সদানন্দর মুখোমুখি দাঁড়ালো। বললে–তাহলে আমি কী করবো?
–তুমি কি করবে তা তুমিই জানো, আমি কী বলব?
–কিন্তু আমি তো তোমার স্ত্রী! স্ত্রীকে সাহায্য করাও তো স্বামীর একটা ধর্ম! তুমি না সাহায্য করলে কে আমায় সাহায্য করবে? আমার আর কে এখানে আছে?
সদানন্দ বললে–কেন, তোমার শাশুড়ী আছে, শ্বশুর আছে, তোমার নিজের বাবা আছে। কে নেই তোমার? কীসের অভাব তোমার? স্বামী যার নেই সে কি বেঁচে থাকে না? মনে করো আমি নেই। মনে করে নাও বিয়ের পরই তোমার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে, আমি মরে গিয়েছি। এমন কি হয় না? এমন তো পৃথিবীতে কত মেয়ের জীবনে ঘটছে! আর তারাও তো বেঁচে আছে–
নয়নতারা বললে–এসব তুমি কী বলছো?
সদানন্দ বললে–যা বলছি তা ঠিকই বলছি। এখন আমায় যেতে দাও–
নয়নতারা দরজার দিকে পিঠ করে সদানন্দর দিকে চেয়ে রইল। বললে–আমি তোমাকে যেতে দেব না, এতদিন পরে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলবার একটা সুযোগ পেয়েছি, এ সুযোগ আমি ছাড়বো না। আজকে তোমাকে আমার কাছে থাকতেই হবে।
–তার মানে তোমার হুকুম মেনে আমাকে চলতে হবে, এই বলতে চাও?
–হুকুম বললে যদি তোমার পৌরুষে ঘা লাগে তাহলে অনুরোধ বলো। আমার এ অনুরোধ না হয় শুনলেই।
সদানন্দ বললে–যে অনুরোধ রাখা সম্ভব নয় তেমন অনুরোধ তুমি আমাকে কোর না। আমি তোমাকে মিনতি করছি, তোমার অনুরোধ আমি রাখতে পারবো না।
–কিন্তু কেন? কেন আমার অনুরোধ রাখতে পারবে না তুমি? আমাকে কি তোমার পছন্দ হয় নি? আমাকে কি খারাপ দেখতে? আমার বাবা-মা কিম্বা আমি কী তোমার সঙ্গে কোনও খারাপ ব্যবহার করেছি?
–না।
–তাহলে?
সদানন্দ বললে–বলছি তো, তুমি সুন্দরী। তোমার মত সুন্দরী বউ কম লোকেরই আছে। কিন্তু তাতে কী? আমি তো তোমার কোনও দোষ দিচ্ছি না।
–তবে কার দোষ?
সদানন্দ বললে–দোষ যে করেছে আমি তাকে শাস্তি দেবার জন্যেই তোমার অনুরোধ রাখতে পারছি না। তুমি জানো না কত তাদের দোষ! তুমি জানো না তারা কত নিষ্ঠুর তারা কত নীচ! শুনলে তোমারও ঘেন্না হবে তাদের ওপর। জানতে পারলে আমার জন্যে তোমারও কষ্ট হবে নয়ন। তখন আর আমাকে ঘরে শুতে অনুরোধ করবে না–
–আমি জানি।
সদানন্দ অবাক হয়ে গেল। বললে–তুমি জানো? তুমি সব শুনেছ?
