ছোট মশাই দীনুকে দেখেই নিজেকে সামলে নিলেন।
বললেন–না, আমি তো ডাকি নি–
দীনু নিশ্চিন্ত মনে চলে গেল। চলে যেতেই চৌধুরী মশাই আবার উঠলেন। না, মায়া দয়া করলে চলবে না। মায়া-দয়া করলে চৌধুরী বংশ গোল্লায় যাবে–
চৌধুরী মশাই টিপি টিপি পায়ে কর্তাবাবুর দিকে আবার এগিয়ে যেতে লাগলেন।
.
কালীগঞ্জের বউ যে মিছিমিছি কর্তাবাবুকে অভিশাপ দেয় নি–তার প্রমাণ সেই দিন রাত্রেই পাওয়া গেল। সদানন্দ আর নয়নতারার জীবনে সে এক স্মরণীয় রাত। নয়নতারা এতক্ষণ তার নিজের ঘরের মধ্যে নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়ে ছিল। এবার যেন সে তার অন্তরাত্মার আর্তনাদ শুনতে পেলে। তার অন্তরাত্মা তখন আর্তনাদ করে তাকে বলছে–খোকা তোমাকে অপমান করলে তুমিও তাকে অপমান করতে পারো না? তোমার গায়ে জোর নেই?
নয়নতারার মনে হলো সে যেন এখনি দম বন্ধ হয়ে অজ্ঞান হয়ে যাবে। তুমি যখন পরের বাড়ির মেয়ে ছিলে তখন ছিলে, এখন তুমি এ বাড়ির বউ। এ সংসারের ওপর খোকারও যতখানি অধিকার, তোমারও অধিকার ঠিক ততখানি। কোনও অংশে এতটুকু কম নয়। তাহলে তোমার কিসের ভয়? খোকা যদি তোমার গায়ে হাত তোলে তুমিও তার গায়ে হাত তুলবে! আমি তো পাশের ঘরেই আছি, তুমি আমাকে ডাকবে। ডাকলেই আমি ছুটে যাবো। তুমি ভয় পেও না বউমা, মেয়েমানুষ হয়ে জন্মেছ বলে কি সব কিছু তোমাকে মুখ বুজে সহ্য করতে হবে?
হঠাৎ দরজাটার তালা খোলার শব্দ হলো।
শাশুড়ীর গলা শোনা গেল বাইরে। শাশুড়ী বললে–তুই শুয়ে পড়গে যা, আলো নিতে হবে না, গৌরী তোর বিছানা ঝেড়েঝুড়ে পরিষ্কার করে রেখে দিয়েছে–
নয়নতারা দেখলে মানুষটা ঘরে ঢুকে দরজায় খিল লাগিয়ে দিলে। তারপর আর কোনও দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সোজা এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিলে। বোধ হয় খুবই ক্লান্ত ছিল। শুধু শুয়ে পড়তেই যা দেরি, তারপরেই লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস পড়তে লাগলো তার।
এত কাছে, এত ঘনিষ্ঠভাবে মানুষটার সঙ্গে কখনও থাকে নি নয়নতারা। অথচ যতটা পেরেছে বিছানার একেবারে শেষপ্রান্তে নিজেকে লুকিয়ে রেখে দিয়েছে সে। মানুষটা জানেও না যে যাকে সে সব চেয়ে এড়িয়ে চলতে চায় সে তারই সঙ্গে এক ঘরের এক ছাদের তলায় আর একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে আছে।
এমনি করে নিঃশ্বাস বন্ধ করে নিজের হৃৎপিণ্ডের ওঠা-পড়ার শব্দ কতক্ষণ শোনা যায়? তবু শুনতে হবে, তবু এক ঘরে এক বিছানায় প্রতি রাত্রে শুতে হবে। এই-ই হচ্ছে বিধান। তাতে তোমার শয্যাসঙ্গী তোমাকে ঘৃণাই করুক আর তাচ্ছিল্যই করুক।
হঠাৎ অজান্তে নয়নতারার হাতের চুড়ির শব্দ হতেই মানুষটা চমকে বিছানায় উঠে বসেছে।
–কে?
–তারপর বোধ হয় অস্পষ্ট অন্ধকারে একটা কিছু অনুমান করেই মানুষটা আর বিছানায় বসে থাকতে পারলে না। উঠেই সোজা দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে খিল খুলে বাইরে যাবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু নয়নতারা তার আগেই গিয়ে তার হাত চেপে ধরেছে।
বললে–কোথায় যাচ্ছো?
নয়নতারার এই অপ্রত্যাশিত ব্যবহার সদানন্দ বোধ হয় কল্পনাও করতে পারে নি। তাই প্রথমটায় একটু হতভম্ব হয়ে গেল। তারপর কী জবাব দেবে বুঝতে না পেরে চুপ করে রইল।
নয়নতারা বললে–আমি তোমার কী করেছি যে তুমি ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছো?
সদানন্দ নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করতে করতে বললে–আমাকে ছেড়ে দাও, আমার হাত ছাড়ো, আমি বাইরে যাবো–
নয়নতারা তবু সদানন্দর হাত ছাড়লো না। শরীরে যত জোর ছিল তাই দিয়ে সদানন্দর হাতটা চেপে ধরে বললে–না, তোমাকে ছেড়ে দেব না, আগে বলো তোমার কাছে আমি কী দোষ করেছি যে তুমি আমার ঘরে থাকবে না? আমাকে তোমার এত ঘেন্না কেন?
সদানন্দ এমন অবস্থার জন্যে তৈরি ছিল না। বিয়ের পর এতদিন কেটে গেছে, কিন্তু এই মোকাবিলার ঝামেলায় যে তার স্ত্রীই এক দিন তার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াবে, তার ব্যবহারের কৈফিয়ৎ চাইবে জবাব চাইবে তার জানা ছিল না। জানা থাকলে তার দিকের জবাবদিহিটাও সে আগে থেকে তৈরি করে রাখতো। আর তা ছাড়া সে যদি জানতে পারতো নয়নতারা এই ঘরের ভেতরেই নিঃশব্দে শুয়ে আছে তাহলে কি সে-ই এ ঘরে শুতে আসতো!
মুখে প্রকাশ করবার মত কোনও তৈরি জবাব না থাকাতে সে আবার বললে–আমার হাত ছাড়ো-হাত ছাড়ো বলছি
নয়নতারা বললে–হাত ছাড়লে কি তুমি আমার কথার জবাব দেবে?
সদানন্দ নয়নতারার তরফ থেকে এতখানি দৃঢ়তা আশা করে নি। বললে–তোমার কাছে জবাবদিহি করতে হবে এমন কোনও অন্যায় আমি করি নি। তুমি আমার হাত ছাড়ো বলছি
নয়নতারা তবু হাত ছাড়লে ন। তেমনি ভাবে সদানন্দর হাতটা ধরে রেখেই বললে– ন্যায় অন্যায়ের কথা কেন তুললে? আমি তো ন্যায়-অন্যায়ের কথা তুলি নি। আমি শুধু তোমার এই রকম ব্যবহারের কারণ জানতে চেয়েছি।
সদানন্দ বললে–আমি তোমার সঙ্গে কী এমন খারাপ ব্যবহার করেছি? আমি তো তোমাকে কোনও রকম কষ্ট দিই নি, এ বাড়িতে তোমার আদর-যত্নের কোনও ত্রুটি হয়েছে, তাও তো নয়।
নয়নতারা বললে–কিন্তু আমি তো সে কথাও বলি নি তোমাকে। আমি কি তোমাকে কখনও বলেছি শ্বশুরবাড়িতে এসে আমার আদর-যত্ন হচ্ছে না? কিন্তু তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে, এটা তো সত্যি? এটা তো অস্বীকার করতে পারবে না? আগুন সাক্ষী রেখে বিয়ে করেছ। তারপরেও কি আমার ওপর তোমার কোন কর্তব্য নেই?
