–না, সেকথা নয়। বউমা বাপের বাড়ি চলে গেছে শুনে কিছু বললে নাকি?
প্রীতি বললে–না।
–জিজ্ঞেস করলে না কেন বাপের বাড়ি গেল! কে তাকে নিয়ে গেল!
–না।
চৌধুরী মশাই প্রসঙ্গ বদলে বললেন–আমি আজ একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে নেব, আজ থেকে আমি কর্তাবাবুর ঘরে শোব–
প্রীতি বললে–কেন? গোমস্তা মশাই তো থাকে সেখানে?
চৌধুরী মশাই বললেন, আজ থেকে তাকে থাকতে বারণ করেছি আমি। বলেছি, এবার থেকে নিজের বাড়িতে গিয়ে শুতে–
–তা তুমি যে শোবে, বিছানা?
–দীনুকে বিছানা করতে বলে দিয়েছি, গৌরীকে বলো আমার খাবার দিয়ে দিতে। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ি গে যাই, আমার কিছু ভালো লাগছে না। কর্তাবাবুর অসুখও সারবে না, আর আমারও ঝামেলা শেষ হবে না। ননী ডাক্তার এখনি বলে গেল কর্তাবাবু নাকি এই রকম করেই বরাবর বেঁচে থাকবে–
প্রীতি বললে–তা মানুষ যদি বেঁচে থাকে তো তুমি কী করবে? তা বলে তো আর কাউকে গলা টিপে মেরে ফেলা যায় না। যতদিন কপালের ভোগান্তি আছে ততদিন সহ্য করতেই হবে–
চৌধুরী মশাই বললেন–কী বলছো তুমি? সহ্যও করবো আবার ওষুধও খাইয়ে যাবো? ওষুধ কিনতে বুঝি টাকা লাগে না? বলো তো এ ক’দিনে কতগুলো টাকা মবলক জলে চলে গেল! ওই টাকায় পাঁচশো বিঘে জমি হয়ে যেত আমার। বুঝতুম যে ওতে অসুখ ভাল হয়ে যাবে তা হলেও না-হয় মনে কিছু লাগতো না, কিন্তু এ যে ন-দেবায় ন-ধর্মায়…..
এমন সময় রান্নাবাড়ির দাওয়ায় গৌরী ভাত দিয়ে গেল। চৌধুরী মশাই গিয়ে খেতে বসলেন। কিন্তু খেতে-খেতেও কর্তাবাবুর কথাগুলো তাঁর মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করতে লাগলো–যদি সম্পত্তি রাখতে চাও তো মায়া-দয়া করলে চলবে না। মায়া-দয়া করলে সব গোল্লায় যাবে–
সত্যিই আর মায়া-দয়া নয়। মায়া-দয়া করলে সব গোল্লায় যাবে। কিছু থাকবে না। তাড়াতাড়ি কোনও রকমে নাকে-মুখে খাবারটা খুঁজে একেবারে দোতলায় কর্তাবাবুর ঘরে গিয়ে হাজির হলেন আবার। কৈলাস গোমস্তা তখন তার বাড়ি চলে গেছে। আজ থেকে তার আরাম। আর দুর্গন্ধের মধ্যে তাকে রাত কাটাতে হবে না।
দীনু দাঁড়িয়ে ছিল। চৌধুরী মশাই বললেন–তুই আর মিছিমিছি দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা, নিচেয় গিয়ে গৌরীর কাছে খাবার চেয়ে খেয়ে নিগে যা–
দীনু চলে যেতেই চৌধুরী মশাই কর্তাবাবুর কাছে সরে এলেন। সত্যিই কর্তাবাবু তখন একটা অচল মাংসপিণ্ড বই আর কিছু নয়। একটু চেতনাও নেই মানুষটার। এত যে বিছানার দুর্গন্ধ তাতেও মানুষটার কোনও বিকার নেই। পঞ্চেন্দ্রিয় লোপ পেয়ে গেছে তবু মানুষটা বেঁচে আছে কেমন করে কে জানে! অথচ এই মানুষটারই এককালে কত বুদ্ধি-বিবেচনা ছিল। শুধু বুদ্ধি-বিবেচনা নয়। কূট বুদ্ধি-বিবেচনা। সেই কূট বুদ্ধিতে কোর্টের হাকিম, পেশকার-উকিল-মুহুরি মোকতার সবাই হিমসিম খেয়ে যেত। এই মানুষটাই একদিন বলেছিল—যদি সম্পত্তি রাখতে চাও তো মায়া-দয়া করলে চলবে না। মায়া-দয়া করলে সব গোল্লায় যাবে! কিন্তু আজ আমিও যদি সম্পত্তি রাখবার জন্যে মায়াদয়া না করি। আমি আজ মায়া-দয়া করলে তো এই সব সম্পত্তিও গোল্লায় যাবে। তা হলে?
চৌধুরী মশাই নিজের দু’হাতের দুটো বুড়ো আঙ্গুল পরীক্ষা করে দেখলেন। ওষুধ লাগবে না, বিষ লাগবে না, ছোরা লাঠি কিছুই লাগবে না, শুধু এই দুটো বুড়ো আঙুল দিয়েই সব শেষ করে দেওয়া যায়।
–কে? কে তুমি?
চৌধুরী মশাই চমকে উঠেছে। কর্তাবাবুর কি তবে জ্ঞান আছে যে সব টের পাচ্ছেন তিনি?
–তুমি কে? কথা বলছো না কেন? কথার জবাব দাও। তোমাকে তো আমি খুন করে ফেলেছি, তবে আবার কী করে তুমি এখানে এসেছ? তুমি আমাকে অভিশাপ দিয়েছিলে মনে আছে? তুমি বলেছিলে আমি নির্বংশ হবো, বলেছিলে তুমি বামুনের মেয়ে, তোমার অভিশাপ ফলবেই! মনে আছে?
বলতে বলতেই কর্তাবাবু ঘর ফাটিয়ে হেসে উঠলেন।
–কিন্তু ফলেছে কী? আমার নাতি কি তোমার কথা শুনেছে? সুন্দরী বউ পেয়ে সে সব ভুলে গেছে কালীগঞ্জের বউ, সব ভুলে গেছে। সে এখন রোজ বউ-এর সঙ্গে এক ঘরে শোয়। তা জানো? আমি আমার বংশধরের মুখ দেখবো বলে কাঞ্চন স্যাকরাকে সোনার হারের বায়না দিয়ে রেখেছি। তুমি যাও এখন, যাও–আমি তোমার মুখ দেখতে চাই না, তুমি যাও, যাও–চলে যাও বলছি।
হঠাৎ হারিকেন নিয়ে দীনু ঢুকতেই আবার সব চুপ।
চৌধুরী মশাই বললেন–খাওয়া হলো তোর?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
–তাইলে তুই শুয়ে পড় বারান্দায়, আমি এখানেই শোব।
দীনু বারান্দায় গিয়ে বিছানা পাতলে। চৌধুরী মশাই তখনও একদৃষ্টে চেয়ে দেখছেন কর্তাবাবুর মুখের দিকে। কই, কিছু তো নেই! এ তো ঠিক আগেকার মত নিথর নিশ্চল শিলীভূত মাংসপিণ্ড! এর তো কথা বলবার কোনও ক্ষমতা নেই। তবে এতক্ষণ কে কথা বলছিল! না, আর মায়া-দয়া করলে চৌধুরী বংশ গোল্লায় যাবে–মায়া-দয়া আর তিনি করবেন না।
বাইরে তখন দীনুর নাক-ডাকা শুরু হয়ে গেছে। চৌধুরী মশাই আর দেরি করলেন না। টিপি টিপি পায়ে আবার এগিয়ে গেলেন কর্তাবাবুর দিকে।
আবার কর্তাবাবু চিৎকার করে উঠলেন–কে? কে তুমি? তোমাকে তো আমি খুন করে ফেলেছি, তবে আবার কী করে তুমি এখানে এলে? কে তোমাকে এখানে নিয়ে এল? কৈলাস, কৈলাস–
দীনুর হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেছে। ধড়ফড় করে উঠে ভেতরে এসেছে। বললে–ছোট মশাই, আমাকে ডাকছেন?
