চৌধুরী মশাই নিজের করণীয় কর্তব্য ঠিক করে ফেললেন। একেবারে নিশ্চিন্ত। তারপর আবার সোজা একেবারে ওপরে উঠে গেলেন। কর্তাবাবুর তখনও সেই একই অবস্থা। নিশ্চল নিথর হয়ে শুয়ে আছেন।
কৈলাস গোমস্তা তখন কর্তাবাবুকে ওষুধ খাওয়াবার ব্যবস্থা করছিল। চৌধুরী মশাই জিজ্ঞেস করলেন–ওষুধ তৈরি করছ কার জন্যে?
কৈলাস বললে–আজ্ঞে ডাক্তারবাবু যে বলে গেলেন!
চৌধুরী মশাই বললেন–না, ডাক্তারবাবু আমাকে অন্য কথা বলে গেলেন। আর ওষুধ খাওয়াতে হবে না আজ থেকে
–খাওয়াতে হবে না?
–না—
ঘরময় ওষুধের শিশি-বোতল জমে একদিন পাহাড় হয়ে উঠেছিল। সেগুলোর দিকে চেয়ে দেখলেন চৌধুরী মশাই। যতগুলো শিশি-বোতল তার একশো গুণ টাকা করচ হয়েছে। সব ভস্মে ঘি ঢালা হয়েছে এতদিন। কিন্তু এতদিন যা হয়েছে তা হয়েছে, এবার থেকে আর তা নয়! এবার থামা। কর্তাবাবু সজ্ঞানে থাকলে তিনিও এত টাকা নষ্ট হতে দিতে আপত্তি করতেন। কর্তাবাবুর কাছেও তার জীবনের চেয়ে টাকার দাম বেশি ছিল। তিনি জানতে পারলে এ অনাচার হতে দিতেন না কখনও। এত বেহিসেব তিনিও কখনও সহ্য করতেন না।
বললেন–ওই শিশি-বোতলগুলো কাল এ-ঘর থেকে সব সরিয়ে চণ্ডীমণ্ডপের পাশে বংশী ঢালীর ঘরের পাশে জমা করে রাখবে। তারপর রেলবাজারে গিয়ে পুরোন শিশি বোতলের দোকানে বিক্রি করার ব্যবস্থা করবে, বুঝলে?
কৈলাস গোমস্তা মাথা নাড়লে বটে, কিন্তু একটা অজ্ঞাত আতঙ্ক তার মনটায় জুড়ে বসলো। তবে কি কর্তাবাবুর এবার চলে যাবার সময় এসেছে। তাহলে তার চাকরি! তার চাকরিটাও কি চলে যাবে কর্তাবাবুর সঙ্গে সঙ্গে!
বললে–ডাক্তারবাবু কী বলে গেলেন ছোট মশাই? কর্তাবাবু কি আর বাঁচবেন না?
চৌধুরী মশাই রেগে গেলেন। বললেন–আমি যা বলছি আগে তাই করো। কর্তাবাবু বাঁচবেন কি বাঁচবেন না, তা নিয়ে তুমি কেন অত মাথা ঘামাচ্ছো–?
তারপর একটু থেমে বললেন–আর একটা কথা। রাত্তিরে তুমি তো এখানেই শোও?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনিই তো আমাকে এতদিন এখানেই শুতে বলেছিলেন।
–হ্যাঁ, আমি বলেছিলুম বটে, কিন্তু এখন থেকে তোমার আর এখানে শোবার দরকার নেই, আজ থেকে তুমি তোমার নিজের বাড়িতেই গিয়ে শুয়ো–
–আজ্ঞে তাই-ই শোবো।
চৌধুরী মশাই দীনুর দিকে চাইলেন–আর তুই?
দীনু বললে–আজ্ঞে আমি তো বরাবর ওই বাইরের বারান্দাতেই শুই–
–তা তাই-ই শুবি। আমি আজ থেকে কর্তাবাবুর ঘরের ভেতরে শোব।
বলে আবার সিঁড়ি দিয়ে নিচেয় নেমে এলেন। মাথাটার মধ্যে সমস্ত ঝঞ্ঝাটগুলো যেন কিল্ বিল্ করতে লাগলো। এমনিতে ধীর স্থির মানুষ চৌধুরী মশাই। সহজে নুয়ে পড়েন না। কিন্তু সেদিন যেন কেমন আতঙ্ক হতে লাগলো বুকের মধ্যে। এতদিন ধরে তিনি অনেক সহ্য করেছেন। এখন সহ্যের সীমা উৎরে গেছে। এখন একটা হেস্তনেস্ত করবার সময় এসে গেছে।
সুযোগ জীবনে একবারই আসে। ঠিক সেই সুযোগের সময়েই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কর্তাবাবু বহুদিন আগে এক চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বংশী ঢালীকে ডেকে কালীগঞ্জের বউ খতম্ করার হুকুম দিয়েছিলেন। তারপরই তিনি দেখে গেছেন তাঁর নাতির বেয়াড়াপনা বন্ধ। নাতির এত যে কথা সেসব ফুলশয্যার রাত্রেই ঠাণ্ডা। সুন্দরী বউএর মুখ দেখেই জোয়ান ছেলের মাথা ঘুরে গেছে। তারপরে সেই কালীগঞ্জের বউকে দশ হাজার টাকা দেবার কথা আর সে মুখে আনে নি। ছেলেকে ডেকে কর্তাবাবু বলেছিলেন কী হলো? আমি যা বলেছিলুম তা ঠিক-ঠিক ফলেছে তো?
চৌধুরী মশাই সব জেনেও মিথ্যে কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন–হ্যাঁ ফলেছে–
আর দশ হাজার টাকা দেবার নামগন্ধ করে?
চৌধুরী মশাই বলেছিলেন–না।
কর্তাবাবু বলেছিলেন–আর নাম-গন্ধ করবেও না। দেখে নিও। আর কখনও বেয়াড়াপনা করবে না। তোমরাই তো তখন ভয় পেয়েছিলে সবাই। বলেছিলে কালীগঞ্জের বউকে টাকাটা দিয়ে দেওয়াই ভালো! তা এখন দেখলে তো, তোমরা যেটা বলেছিলে সেটা ভালো ছিল, না আমি যেটা বলেছিলুম সেইটেই ভালো! সেই-ই ফুলশয্যার রাত্তিরে খোকা বউ-এর সঙ্গে শুলো তো? বলো, শুলো কি না?
চৌধুরী মশাই বলেছিলেন–হ্যাঁ, শুলো, আপনি যা বলেছিলেন তাই-ই হলো।
–তা হলে তোমাদের কথা শুনলে মাঝখান থেকে আমার শুধু-শুধু দশটি হাজার টাকা জলে চলে যেত!
–তা যেত।
–তোমরা ছেলেমানুষ তাই এখনও কিছু বোঝ না। জমি-জমা রাখতে গেলে এসব বুদ্ধি খরচ করতে হয়। এই যা কিছু করেছি দেখছো সমস্ত এমনি করেই করেছি, বুঝলে? যদি সম্পত্তি রাখতে চাও তো মায়া-দয়া করলে চলবে না, মায়া-দয়া করলে সব গোল্লায় যাবে
কর্তাবাবুর ‘মায়া-দয়া’ কথাটাই বিশেষ করে মনে পড়লো চৌধুরী মশাই-এর। মায়া-দয়া করলে নাকি জমি-জমা-টাকাকড়ি সমস্ত চলে যাবে, কিছুই থাকবে না। না, আর মায়া দয়া কিছুই করবেন না তিনি। কারোর ওপরেই মায়া-দয়া নয়। এমন কি কর্তাবাবুর ওপরেও মায়া-দয়া নয় আর। আজ রাত্রেই মায়া-দয়ার গলা টিপে মারবেন তিনি।
সোজা নিচেয় এসে আবার ভেতর বাড়িতে ঢুকলেন। রান্না বাড়ির বারান্দায় গৃহিণী একলা বসে ছিল।
কাছে এসে চৌধুরী মশাই জিজ্ঞেস করলেন–কী হলো? তোমার শরীর খারাপ, তুমি ঠাণ্ডার মধ্যে এখানে বসে কেন? খোকা কই?
–খোকা পুকুরঘাটে গেছে, হাত-পা ধুতে। তাকে খেতে দেব।
চৌধুরী মশাই জিজ্ঞেস করলেন–খোকা কী বললে?
প্রীতি বললে–কী আবার বলবে! খুব কষ্ট হয়েছে, এই সব কথাই বললে–
