কৈলাস সামন্তই বরাবর সব হিসেব রাখতো। খাতা দেখে বললে–আজ্ঞে ওষুধ আর ভিজিট মিলিয়ে সতেরো টাকা—
সতেরো টাকা? যেন সাপের মুখের সামনে পা বাড়িয়েছেন এমনি করে কর্তা মশাই আঁতকে উঠেছিলেন টাকার অঙ্কটা শুনে। অকারণ বাজে খরচ যেমন দেখতে পারতেন না কর্তা মশাই তেমনি ডাক্তার-খরচটাও কর্তা মশাই বাজে খরচ বলে মনে করতেন।
কিন্তু আজ আর তিনি বুঝতেও পারছেন না তাঁর অত সাধের টাকা-পয়সা কেমন করে তাঁর নিজের অসুখের সূত্রে জলের মত খরচ হয়ে যাচ্ছে। একদিন দুটো পয়সা লোকসানের অভিযোগে তিনি কপিল পায়রাপোড়ার অপমৃত্যু ঘটিয়েছেন। একদিন মানিক ঘোষ দুপুরবেলা ক্ষেত থেকে এসে ভাত খেতে বসেছিল, সেই অবস্থায় ওই বংশী ঢালীর দল গিয়ে তার ভাতের থালা পা দিয়ে উল্টে দিয়েছিল। দিয়ে টিনের চাল খুলে নিয়ে তাকে সপরিবারে রাস্তায় বার করে দিয়েছিল। তার অপরাধ? অপরাধ সে সময়মত তার হাওলাত নেওয়া টাকার সুদ দিতে পারে নি। অনেক টাকা বাকি পড়ে গিয়েছিল। তারপর ফটিক প্রামাণিক। তার কথাও সবাই জানে। ফটিক প্রামাণিকের দুটো গাইগরু কর্তা মশাই-এর ধানক্ষেতে গিয়ে মুখ দেওয়ার অপরাধে তার খড়ের চালে হঠাৎ একদিন আগুন লেগে গেল। সেই আগুনে ফটিক প্রামাণিকের বউ তো পুড়ে মারা গেলই, ফটিক নিজেও সেই শোকে একদিল পাগল হয়ে গেল।
অথচ সেই লোকসানের গুণোগার দেবার জনেই বোধ হয় তার ছেলের শালা রাণাঘাটের রাধাকে গঙ্গাস্নান করাতে কালীঘাটে নিয়ে যায়। ননী ডাক্তারের পেছনে হাজার হাজার টাকা জলের মত খরচ হয়ে যায়। আর নাতি, যে নাতি তাঁর বংশে বাতি জ্বালাবে বলে কাঞ্চন স্যাকরাকে কুড়ি ভরির সোনার হার গড়াবার বায়না দেন তার ভাবী ছেলের অন্নপ্রাশনের উপহার হিসেবে, সে তার নতুন বউএর দিকে ফিরেও চেয়ে দেখে না। তবু আজ এসব কিছুই তাঁর নজরে পড়ে না। তিনি যেন তখন শিলীভূত মাংস-পিণ্ড। তাঁকে ধরে পাশ ফিরিয়ে দিতে হয়, তাঁর ঠোঁট ফাঁক করে ওষুধ খাইয়ে দিতে হয়।
চৌধুরী মশাই ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করতেন–আর কতদিন এমন করে বাঁচাবেন ডাক্তারবাবু?
ননী ডাক্তার বলতো–তা কি বলা যায়? কত মানুষ এমনি করে বছরের পর বছর বেঁচে থাকে।
–কিন্তু যদি মারাই যাবেন তাহলে আর চিকিৎসা করে লাভ কী?
ননী ডাক্তার বলতো–তা বলে নিজের বাবাকে কেউ মেরে ফেলতে পারে?
চৌধুরী মশাই বলতেন–কিন্তু ওঁর দিকে তো আর চেয়ে দেখতে পারি না। একটা কিছু ব্যবস্থা করতে পারেন না?
–কী ব্যবস্থা করবো?
কী যে ব্যবস্থা ননী ডাক্তার করবে আর কী ব্যবস্থার প্রস্তাব চৌধুরী মশাই করতে চান তা দুজনের কেউই খুলে বলতেন না। কিন্তু বুঝতে পারতেন দুজনেই। একমাত্র রোগীকে হত্যা করা ছাড়া এর যে আর কোনও প্রতিকার নেই তা বোধ হয় দুজনেই জানতেন। জানতেন বলেই সে-কথাটা আর কেউই মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে অপরাধের ভাগী হতে চাইতেন না।
কিন্তু রাণাঘাটের সদরে বসেই মনে মনে সংকল্প করে নিয়েছিলেন চৌধুরী মশাই। সংকল্প করে নিয়েছিলেন–আর নয়। প্রতিদিন এতগুলো টাকা খরচ! খরচের অঙ্কটা হিসেব করতেই চৌধুরী মশাই-এর আতঙ্ক হতো। এতগুলো টাকা! এই টাকা খরচেরও কি শেষ নেই? আরোগ্যের কোনও আশাই যখন নেই তাহলে কেন এই খরচান্ত হওয়া? এর প্রতিকার তো তাঁর নিজের হাতেই আছে! তবে?
এই ‘তবে’র উত্তর খোঁজবার জন্যেই তিনি কদিন ধরে ছটফট করছিলেন। যদি খরচান্ত হওয়া নিরর্থক হয় তাহলে তো কর্তাবাবুকে বাঁচিয়ে রাখাও নিরর্থক! অথচ এই নিরর্থক জিনিসটাকে এতদিন ধরে শুধু কর্তব্য আর মানবতাবোধের দোহাই দিয়ে তিনি বরদাস্ত করে চলেছেন। কিন্তু কতদিন, আর কতদিন এমন করে বরদাস্ত করা সম্ভব হবে?
ডাক্তারবাবু নিয়ম করে সেদিনও রোগীকে পরীক্ষা করলে। যেমন করে রোগীর বুকে স্টেথিসকোপ বসিয়ে বুকের সুস্থতা পরীক্ষা করা নিয়ম, তেমনি করেই পরীক্ষা করলে। দু’একটা নিয়মমাফিক প্রশ্নও করলো। যেমন রোজই করে।
আর তারপর হাত বাড়িয়ে টাকা ক’টা নিয়ে চলেই যাচ্ছিল। রাত বাড়ছে। বাড়িতে তার আরও অনেক রোগী। বাড়ির বাইরেও অনেক রোগী তার অপেক্ষায় বসে মুহূর্ত গুনছে।
চৌধুরী মশাই ডাক্তারবাবুর সঙ্গে সঙ্গে নিচে নেমে এলেন।
পেছন থেকে ডাকলেন–ডাক্তারবাবু?
ডাক্তার পেছন ফিরলো।
চৌধুরী মশাই জিজ্ঞেস করলেন–কর্তাবাবুকে আজ কেমন দেখলেন?
ননী ডাক্তার বললে–কী রকম আর দেখবো? সেই একই রকম।
চৌধুরী মশাই বললেন–তা রোজ যদি একই রকম দেখেন তাহলে আপনার রোগী দেখতে আসারই বা কী দরকার আর ওষুধ খাওয়ানোরই বা কী দরকার? ওষুধ কিনতেও তো টাকা লাগে!
ননী ডাক্তার বললে–তা লাগে। টাকা লাগলে যদি আপনার বাজে-খরচ বলে মনে হয় তো তাহলে আর ওষুধ খাওয়াবেন না
–হ্যাঁ, আমিও তাই ভাবছি। ভাবছি ওষুধ তো আর ওঁর কাজে লাগছে না।
ননী ডাক্তার বললে–না, কাজে আর লাগবেও না।
–তাহলে ওষুধ না দিয়ে কী করবো?
–যদি যন্ত্রণা বাড়ে তো একটু করে আফিম খেতে দিন। টাকাও কম খরচ হবে আর যন্ত্রণাও কমবে।
বলে আর দাঁড়াল না ডাক্তার। উঠোন পেরিয়ে সদর দিয়ে সাইকেলে উঠে বসলো। তারপর ঘন্টা বাজিয়ে রাস্তার ওপারে অদৃশ্য হয়ে গেল।
চৌধুরী মশাই সেই অন্ধকার বারান্দার ওপরেই কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। আফিম? কিন্তু আফিমই বা কিনতে যাবেন কেন? আফিম কিনতেও তো পয়সা লাগে! আর আজ রাত্রের মধ্যে আফিমই বা আসছে কোথা থেকে? কাল দিনমানের আগে তো আর রেলবাজারের আবগারি দোকান খুলছে না। আর আফিম কিনতে গেলেও তো তার একটা প্রমাণ থেকে যাবে। প্রমাণ থেকে যাবে যে চৌধুরী মশাই-এর লোক কর্তাবাবুর মারা যাবার আগের দিন রেলবাজারের আবগারি দোকান থেকে আফিম কিনে নিয়ে গিয়েছিল। এত ঝঞ্ঝাটে দরকার কী? তার বদলে সোজা পথ তো অনেক খোলা রয়েছে।
