সদানন্দ বললে–কেউ না–
–কেউ যদি না থাকে তো তোমার সেখানে যাবার দরকার কী ছিল? বাড়িতে তোমার মন টেকে না? বাড়িতে তোমার যদি কোনও কাজ না থাকে তো চণ্ডীমণ্ডপে গিয়ে সেরেস্তার খাতা-পত্তোরগুলো দেখলেও তো পারো। তা দেখলেও তা আমার উপকার হয়। সেটাও কি তোমার দ্বারা হবে না?
সদানন্দ এ-কথার কোন জবাব দেওয়া দরকার মনে করলে না।
–বলি, কথার জবাব দিচ্ছ না যে? আমি যা বলছি তা তোমার কানে যাচ্ছে না, না কথাগুলো গ্রাহ্যের মধ্যেই আনতে চাও না! ভাবছো যা বলছি আমার ভালোর জন্যেই বলছি তোমার ভালোটা দেখছি না। কিন্তু আমার ভালোটা কি তোমারও ভালো নয়? এই যে এত খেটে-খুটে সম্পত্তি রেখে যাচ্ছি; এ কি আমি নিজে ভোগ করবো বলে? আমি মরবার সময় এসব আমার সঙ্গে নিয়ে যাবো বলে? এ সব তো তখন তুমি একলাই ভোগ করবে! সব তো তোমারই রইল। আমরা আর কদ্দিন? আমিও থাকবো না, তোমার মা ও থাকবে না। তখন তুমি আর বউমাই এ-সব ভোগ-দখল করবে। তখন আমরা দেখতেও আসবো না এ-সব তোমরা উড়িয়ে দিলে না বেচে দিয়ে রাস্তার ফকির হয়ে গেলে। কিন্তু যতদিন বেঁচে আছি ততদিন তো আমাকে বাপের কর্তব্য করে যেতে হবে।
সদানন্দ এবারও কোনও কথার জবাব দিলে না।
চৌধুরী মশাই তখন রেগে গেলেন। বললেন–তুমি কি ঠিক করেছ আমার কোনও কথারই জবাব দেবে না? আমার সঙ্গে আর কথাই বলবে না? তা যদি ঠিক করে থাকো তো বলো, এখন থেকে বলে দাও। আমি তাহলে সেই রকম ব্যবস্থাই করবো। তোমার মত বেয়াদব ছেলেকে কী করে ঢিট করতে হয় তাও জানি
নয়নতারাকে খাইয়ে-দাইয়ে ততক্ষণে শাশুড়ী তার শোবার ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। অন্ধকার ঘর। বাইরে থেকে শাশুড়ী আবার দরজায় তালা-চাবি লাগিয়ে দিয়ে চলে গেছে। নয়নতারার বুকটা কাঁপছিল। শ্বশুরের সঙ্গে তার স্বামীর কথাগুলো কানে আসছিল। কান পেতে কথাগুলো সে একমনে শুনতে লাগলো। সবাই জেনে গেছে নয়নতারা কেষ্টনগরে চলে গেছে। এতটুকু টুঁ শব্দ করা চলবে না। তাহলেই জানাজানি হয়ে যাবে যে সে এ বাড়িতেই আছে।
একদিকে ভেতরবাড়িতে শাশুড়ীর সঙ্গে তার মামাশ্বশুরের কথা হচ্ছে। তাও কানে যাচ্ছে। আবার ওধারে তার শ্বশুরের গলা।
এই রকম বন্দী অবস্থায় সে কাল রাতটা কাটিয়েছে, তারপর আজ সমস্ত দিনটাও কাটলো। আরো কতক্ষণ তাকে এমন করে কাটাতে হবে কে জানে! আর একটু পরে খাওয়া-দাওয়া সেরে যখন তার স্বামী এ-ঘরে শুতে আসবে, তখন?
শাশুড়ী তাকে পাখি-পড়া করে শিখিয়ে দিয়েছে। অনেক কথাই শিখিয়ে দিয়েছে তাকে। কথাগুলো মনে পড়বার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে কাঠ হয়ে এল শরীরটা। একটা বিপদ ঘটাবার আগেই যেন সে ভয়ে ভয়ে মুহূর্ত গুনতে লাগলো। বেহুলা তার স্বামীকে যমের হাত থেকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিল। তাকেও কি সেই বেহুলা হতে হবে!
নয়নতারা এক মনে অদৃশ্য ঈশ্বরকে কল্পনা করে নিয়ে প্রার্থনা করতে লাগলো–ভগবান আজকে তুমি আমার মুখ রেখো। শুধু আমার নয়, সকলের মুখ রাখবার ভার তোমার ওপর ভগবান। আমি যেন পারি। আমি যেন আমার স্বামীর মন ফেরাতে পারি। আমাকে তুমি সাহস দিও, শক্তি দিও, সামর্থ্য দিও–আমি যেন হেরে না যাই–
হঠাৎ শাশুড়ীর গলা শোনা গেল–এসেছিস খোকা?
তার স্বামীর গলার কিছু আওয়াজ শোনা গেল না। কিন্তু নয়নতারা বুঝতে পারলে তার স্বামী ভেতর বাড়িতে এসে হাজির হয়েছে।
নয়নতারা কান পেতে রইল সেদিকে। সমস্ত বাড়িটার ক্ষীণতম শব্দও যেন তার কানকে এড়িয়ে যেতে না পারে। তার মামাশ্বশুরের গলা শোনা গেল এবার।
প্রকাশ মামা বললে–মা’র দুঃখু কি ছেলে বুঝতে পারে দিদি, কোনও ছেলেই তা বুঝতে পারে না। আমি নিজেই তো মাকে কত কষ্ট দিইছি। তখন বুঝতুম না, এখন মা নেই, এখন বুঝতে পারছি–
শাশুড়ী সে কথার উত্তর না দিয়ে ছেলেকে আবার জিজ্ঞেস করলে-–কেন আমাদের কথা শুনিস না বল তো বাবা? আমাদের কথা শুনলে তো তোর আজ আর এই এত হেনস্তা ভোগ করতে হতো না। এত ভালো বাড়ি থাকতে তুই কেন গিয়েছিলি বাবা সেই কালীগঞ্জের পোড়ো বাড়ির ভেতরে? ডাকাত যদি না-ও থাকতো তো সাপ-খোপও তো থাকতে পারে? সেখানে ঢোকা কি ভালো? এ না-হয় পুলিসের কাছে টাকাকড়ি দিয়ে খালাস করে আনা গেল, কিন্তু যদি সাপ-খোপে কামড়াতো, তখন? তখন কী হতো?
চৌধুরী মশাইও এবার ভেতরে এলেন। বললেন–ও শুনবে না আমাদের কথা, তুমি ওকে হাজার বলো, কোনও কথাই ওর কানে ঢুকবে না। তুমি যেসব কথা বলছো আমি ওকে সেই সব কথা অনেক বলেছি। ও যে কী ভাবে, কী করে, কী ওর মতলব, আমি কিছুই বুঝি না–
শাশুড়ী বললে–তুমি আবার ভেতরে এলে কেন? ওকে যা বলবার আমিই তো বলছি, তুমি তোমার নিজের কাজ করো না গিয়ে–
চৌধুরী মশাই ধাক্কা খেয়ে আবার বাইরে চলে গেলেন। ডাক্তার আসবার কথা ছিল একটু পরে। তিনি সেই জন্যেই বাইরে অপেক্ষা করে করে যখন ডাক্তার এলোই না তখন বাড়ির ভেতরে এসেছিলেন। স্ত্রীর কথা শুনে আবার বাইরে চলে এলেন। দীনু এসে ডাকলো।
বললে–ছোট মশাই, ডাক্তারবাবু এসেছেন, আসুন—
.
বহুদিন আগে একদিন সদানন্দর যখন অসুখ হয়েছিল তখন এই ডাক্তারই দেখে গিয়েছিল তাকে। এই ননী ডাক্তার। অসুখ সামান্য। কর্তা মশাই তখন সুস্থ মানুষ। জিজ্ঞেস করেছিলেন–ডাক্তার কত টাকা নিলে কৈলাস?
