–কই, কই, খোকা কই?
প্রকাশের পেছনেই সদানন্দ শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। চৌধুরী মশাই জিজ্ঞেস করলেন–কী হলো? পুলিসের হাত থেকে ছাড়া পেলে?
প্রকাশ মামা বললে–সহজে কি ছাড়ে জামাইবাবু? পুলিসে ছুঁলে তো আঠারো ঘা, সে তো কথাতেই আছে। কিন্তু এ আবার পুলিসের বাবা। কলকাতার পুলিস। হাজার টাকার কমে তো কথাই বলতে চায় না। শেষে হাতে-পায়ে ধরতে তবে কথা রাখলে।
চৌধুরী মশাই জিজ্ঞেস করলেন–তা খুব কষ্ট হয়েছে তো?
প্রকাশ মামা বললে–কষ্ট বলে কষ্ট। হাতে তো টাকা ছিল না বেশি। সব তো পুলিসের পেটে ঢুকিয়েছি। শেষে যে কটা পয়সা ছিল তাতে গাড়ি ভাড়াটা কোনও রকমে দিয়ে তবে আসতে পেরেছি–নইলে কলকাতার রাস্তাতেই আমাদের রাত কাটাতে হতো
তারপর আর দাঁড়ালো না সেখানে। বললে–যাই, আগে দিদিকে খবরটা দিয়ে আসি গে, দিদি হয়ত আবার খুব ভাবছে–
চৌধুরি মশাই বললেন– তোমার দিদির তো আবার শরীরটা খুব খারাপ হয়েছে
প্রকাশ মামা বললে–সে তো আমি যাবার সময়ই দেখে গেছি, খোকার আসার খবর পেলেই দিদির শরীর ভালো হয়ে উঠবে
তারপর ভেতর বাড়ির বারান্দায় গিয়ে ডাকতে লাগলো–দিদি দিদি–
প্রীতি প্রকাশের গলার আওয়াজ পেয়ে আর সময় নষ্ট করে নি। বউমাকে নিয়ে তার শোবার ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিলে।
নয়নতারাকে বলে দিলে–যা বলেছি তা তোমার মনে আছে তো বউমা?
নয়নতারা ঘাড় নাড়লে।
–হ্যাঁ, মনে রেখে দিও, ভুলো না যেন। খোকা যেন জানতে না পারে যে তুমি ঘরে আছ। আমি ওদের বলবো তুমি বাপের বাড়ি চলে গেছ, বুঝলে? আজ খোকাকে বোঝানো চাই যে তুমিও অপমানের শোধ তুলতে পারো, বোঝানো চাই মেয়েমানুষ হলেও তুমি একজন মানুষ, বোঝানো চাই যে তোমার মান-অপমান লজ্জা-সম্ভ্রম বলে একটা জিনিস আছে, আরো বোঝানো চাই খোকার যেমন অধিকার আছে এ-বাড়ির ওপর, তোমারও তেমনি সমান-সমান অধিকার আছে, বুঝলে? যা যা বলছি তাই ঠিক-ঠিক কোর, যেন ভয় পেও না। খোকা যদি ঘর থেকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে তো তুমি যেন ওকে জোর করে ধরে রাখতে ভয় পেও না। আর আমি তো আছি, ও যদি তোমাকে কিছু করে তখন আমি তোমার দিকে আছি, তুমি আমাকে ডেকো। আমাকে চেঁচিয়ে ডাকলেই আমি ছুটে আসবো, বুঝতে পারলে? এখন আমি চললুম।
বলে দরজায় তালা বন্ধ করে প্রীতি তাড়াতাড়ি নিজের ঘরের ভেতর গিয়ে ঢুকলো।
বাইরে থেকে প্রকাশ ডাকতে ডাকতে ভেতরে এল।
বললে–কই গো দিদি, কোথায় গেলে, তোমার খোকাকে তো এনেচি, উঃ, সে কী কাণ্ড, কলকাতায় গিয়ে কম হেনস্তা আমার। আমি না গেলে সদাকে ছাড়িয়ে আনাই যেত না–
তারপর বউমার ঘরের দিকে চেয়ে বললে–বউমা কোথায়?
প্রীতি বললে–বউমার বাবা এসেছিল, বউমাকে নিয়ে কেষ্টনগরে চলে গেছে
–সে কী? এই সময়ে তুমি বউমাকে বাপের বাড়ি যেতে দিলে? এত কষ্ট করে সদাকে হাজত-ঘর থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এলুম আর ঠিক এই সময়েই কিনা বউমা চলে গেল বাপের বাড়ি? এই তো সবে সেদিন বাপের বাড়ি থেকে এল বউমা, আবার এরই মধ্যে বাপের বাড়ি যাওয়া?
দিদি সেকথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলে–কই? খোকা কোথায়? খোকা যে আমার কাছে এল না?
প্রকাশ বললে–আমি ডেকে নিয়ে আসছি–
খোকা এসেছে, এই খবরটাই যেন একটা অসুস্থ মানুষের রোগমুক্তির পক্ষে যথেষ্ট। প্রীতির শরীরটা যেন এক মুহূর্তের মধ্যে হাল্কা হয়ে উঠলো।
প্রকাশ মামা আবার বললে–ওঃ, সদার জন্যে যে কী ঝঞ্ঝাট গেল তোমায় কী বলবো দিদি। কথায় বলে পুলিসে ছুঁলে আঠারো ঘা, তার ওপর আবার কলকাতার পুলিস। সোজা আঙ্গুলে তো সেখানে ঘি ওঠে না। আমিও তাই ব্যাঁকা রাস্তা ধরলুম। আমি বললুম সদাকে ছাড়াতেই হবে। তার জন্যে যত টাকা লাগে তা আমার জামাইবাবু খরচা করতে প্রস্তুত। তা টাকার কথা শুনেই পুলিসের মুখের চেহারা বদলে গেল। আমার হাতে তখন কাঁচা নোটগুলো রয়েছে। সেগুলো দেখে বললে–কত আছে ওতে? আমি বললুম—পাঁচশো–
দিদি বললে–তা পাঁচশোতে রাজি হয়ে গেল?
প্রকাশ মামা বললে–ক্ষেপেছ? তেমন বান্দাই নয় তারা–
–তারপরে?
–তারপরে শেষ পর্যন্ত সাতশো টাকায় রফা হলো। নগদ টাকাটা চুকিয়ে দিতেই হুকুম হয়ে গেল আসামী খালাস। তখন দেখি কাঁদতে কাঁদতে সদা আসছে। না-খেয়ে না-ঘুমিয়ে সদার মুখ একেবার শুকিয়ে আসি হয়ে গেছে! কান্নায় চোখ ফুলে একেবারে টোপাকুল।
দিদি বললে–আহা, তা বাছাকে খেতেও দেয় নি? সারাদিন না খেয়ে কাটিয়েছে?
প্রকাশ মামা বললে–সে তোমার ভাবনা নেই। পুলিস না খেতে দিক, আমি পেট ভরে খাইয়ে দিয়েছি তোমার খোকাকে। কী কী খাইয়েছিলুম শুনবে? বড় বড় রাজভোগ, কাঁচাগোল্লা সন্দেশ, তারপর রাবড়ি। তাতেও পেট ভরে না। শেষকালে তোমার ছেলে বলে ভাত খাবো। তা নিয়ে গেলাম তোমার ছেলেকে হোটেলে। সেখানে গিয়ে পোনা মাছের কালিয়া আর সরু বালাম চালের ভাত খাইয়ে দিলুম। বললুম-খা, যত পারিস পেট ভরে। খেয়ে নে। আমার কাছে তখনও তিনশো টাকা রয়েছে–
কিন্তু অত খাওয়ার কথা শুনতে তখন ভালো লাগছিল না প্রীতির। বললে–খাওয়ার কথা রাখ তুই, খোকা এখনও আসছে না কেন, তাকে ডেকে দে না–
চৌধুরী মশাই তখন সদানন্দকে নিয়ে পড়েছিলেন। সব শুনে বললেন–তা তুমিই বা ওই কালীগঞ্জের পোড়ো বাড়ির মধ্যে গিয়েছিলে কেন? সেখানে তোমার কী আছে? কে থাকে সেখানে?
