সন্ধ্যেবেলার দিকে একবার চুপি চুপি শাশুড়ী দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো।
বললে–বউমা, তোমার ভয় পাচ্ছে না তো?
নয়নতারা বললে–না মা–
শাশুড়ী বললে–ভয় পেও না, আমি বাইরেই আছি। খোকা তো এখনও এল না, প্রকাশেরও তো দেখা নেই–
নয়নতারা জিজ্ঞেস করলে–আপনি কেমন আছেন?
–আমার কথা ছেড়ে দাও বউমা। আমি নিজের কথা আর ভাবছি না। তোমার শ্বশুর রাণাঘাট থেকে এসে জিজ্ঞেস করছিলেন তোমার কথা। আমি বলেছি তুমি বেয়াই মশাই এর সঙ্গে কেষ্টনগরে চলে গেছে–
তারপর একটু থেমে বললে–আমি এখন আসি বউমা, নইলে কেউ আবার টের পেয়ে যাবে। তোমাকে আজকে আগে-আগে খাইয়ে দেব। তখন তুমি নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পোড়, বাইরে থেকে আমি তোমার দরজায় তালা লাগিয়ে দেব, তাহলে আর কেউ টের পাবে না। আবার ভোর না হতে দরজা খুলে দেব
এই রকম ব্যবস্থাই হলো। কিন্তু বিকেল হলো, সন্ধ্যে হলো, তবু খোকাও এলো না, প্রকাশও এলো না।
চৌধুরী মশাই জিজ্ঞেস করলেন–কই, প্রকাশ তো এখনও এলো না–আমি নিজে একবার যাবো কলকাতায়?
প্রীতি বললে–তুমি গিয়ে আর কী-ই বা করবে। ও-সব কাজ প্রকাশই করবে ভালো। আর তুমি চলে গেলে এদিকটা আবার কে সামলাবে? বাড়িতে এই কর্তাবাবুর অসুখ, এখন এখানে একজন পুরুষ-মানুষ না থাকলে চলে?
তা বটে। চৌধুরী মশাই বুঝলেন। কিন্তু তিনি যুক্তি বুঝলে কী হবে, মন তো যুক্তি বুঝতে চায় না। তার মনের সমস্ত খেই যেন হারিয়ে গেছে একদিনের মধ্যেই। একদিনের মধ্যেই যেন তার সমস্ত দৈনন্দিন কাজগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে। দৈনন্দিন কাজের মধ্যেও তো একটা শৃঙ্খলা থাকে। সেই শৃঙ্খলাটা নষ্ট হলেই মন বড় বিপন্ন হয়। অথচ যে-মানুষটা বড় বেশি করে সংসার-ধর্ম করতে চেয়েছিলেন তার আর কোন দিকেই হুঁশ নেই। তিনি অচল-অটল হয়ে পড়ে আছেন। জানতেও পারছেন না যে তার এত সাধের সংসারের ভিতেই আজ ফাটল ধরেছে। কৈলাশ গোমস্তা আর দীনুই কেবল তাকে সামলাচ্ছে। আগে রাণাঘাট থেকে ছেলে ফিরে এলে মামলার ধারাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করতেন। মামলা করে করে কর্তাবাবু মামলার ঘুণ হয়ে গিয়েছিলেন শেষের দিকে। উকিলকেও কর্তাবাবু মামলার খেই ধরিয়ে দিতেন। সেই তিনিই আজ জানতে চাইছেন না কোর্টে কতদূর কী হলো। জানতেও চাইছেন না তাঁর অত আদরের নাতি কোথায় গেল। তিনি সুস্থ থাকলে কি আর এই অবস্থায় বউমাকে বাপের বাড়ি যেতে দিতেন!
পরের দিন রাত থাকতে নয়নতারাকে জাগিয়ে দিয়েছে শাশুড়ী।
–কী বউমা, রাত্তিরে তোমার ভয় করে নি তো?
নয়নতারা বললে–-না মা—
শাশুড়ী বললে–এখনও ভোর হয় নি, তোমার শ্বশুর এখনও ঘুমোচ্ছেন, তাড়াতাড়ি তুমি তৈরী হয়ে নাও, তারপরে আবার তোমাকে উত্তরের ঘরে রেখে দিয়ে আমি দরজায় তালা দিয়ে দেব—
নয়নতারা হঠাৎ বললে—মা—
শাশুড়ী বললে–কী বউমা?
–আজকেও যদি ওঁরা ফিরে না আসেন?
শাশুড়ী বললে–যদি না আসে তো তোমার কপাল! কাল সারা রাত তো কেবল ভগবানকে ডেকেছি। তুমিও ভগবানকে ডাকো বউমা। নিশ্চয়ই তিনি মুখ তুলে চাইবেন। একমনে ডাকলে কি আর ভগবান মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারেন? বেহুলার গল্প জানো তো? সেই বেহুলা কেমন করে তার মরা স্বামীকে বাঁচিয়েছিল সে গল্প তুমি নিশ্চয়ই শুনেছ! তা তুমিও পারবে বউমা। ভগবান সহায় থাকলে কোনও কাজই মানুষের অসাধ্য নয়। তুমি সব সময়ে একমনে তাঁকে ডাকো, নিশ্চয়ই ফিরে আসবে খোকা–
সত্যিই নয়নতারা তখন ভগবানে বিশ্বাস করতো। তারপরে আঘাত পেতে পেতে কখন যে একদিন তার সব বিশ্বাসের সলিল-সমাধি হয়ে গিয়েছিল তা তার চিরকাল মনে থাকবে। কিন্তু কেন তার বিশ্বাস ভেঙ্গে গেল? কেন আস্থা হারালো সে? আস্থা হারালো কি শুধু ভগবানের ওপর আস্থা হারালো নিজের জীবনের ওপর, নিজের শ্বশুর, শাশুড়ী সকলের ওপর। যে-বিশ্বাস হারিয়ে একদিন সদানন্দ শেষ পর্যন্ত অমন আসামী হয়ে গেল, নয়নতারাও তো সেই আস্থা হারিয়েই একদিন আত্মঘাতী হতে গিয়েছিল।
কিন্তু সে কথা এখন থাক।
পরের দিন সন্ধ্যে কেটে রাত হয়েছে।
শাশুড়ী আবার ঘরের তালা খুলে ভেতরে ঢুকলো। বললে–খেয়ে নাও বউমা, খাবার এনেছি–
খেতে বসে নয়নতারার চোখ দিয়ে টস্ টস্ করে জল পড়তে লাগলো।
শাশুড়ী বললে– কেঁদো না বউমা, কাঁদতে নেই। কাঁদবার কথা তো আমার, কিন্তু আমি তো কাঁদছি না। আমি যদি কাঁদতুম তো কবে আমার এই সংসার করা ঘুচে যেত বউমা, তা জানো? কাঁদবার দিন অনেক পাবে বউমা। এত তাড়াতাড়ি চোখের সব জল ফুরিয়ে দিও না। শেষকালে যখন একটার পর একটা শোক-তাপ পাবে তখন কাঁদবার মত চোখে অত জল কোথায় পাবে বলো তো? তুমি তো সবে সংসারে ঢুকলে, এরই মধ্যে যদি এত কান্না পায় তাহলে শেষ জীবনে কী করবে?
নয়নতারা শাশুড়ীর কথায় চোখের জল মুছে একটু শক্ত হবার চেষ্টা করলে। কোনও রকমে খাওয়াটা সারলে। যেন নিয়ম রক্ষে করলে।
শাশুড়ী বললে–এরকম উপোস করে থাকলে তো তোমার চলবে না বউমা। না খেলে তখন আরো দুর্বল হয়ে পড়বে, তখন তোমার অপমানের শোধ নেবে কী করে?
হঠাৎ বাইরে থেকে প্রকাশের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল–দিদি, দিদি-সদাকে নিয়ে এসেছি—দিদি–
চৌধুরী মশাই তখন দোতলায় কর্তাবাবুর কাছে ছিলেন। তাঁর কানেও আওয়াজটা পৌঁছোল। আওয়াজটা পেয়েই তিনি সিঁড়ি দিয়ে দৌড়তে দৌড়তে নেমে এলেন।
