প্রকাশ মামা বললে–ও-ঘরে কেউ থাকে তা আমি জানবো কী করে? আগে যখন এসেছি তখন তো ও-ঘরটা বরাবর খালি পড়েই থাকতো। আমি কি আজকে প্রথম আসছি তোমার বাড়িতে? আমি সব সইতে পারি কিন্তু অপমান আমার ধাতে সয় না–আমার ভাগ্নেকে তুমি অপমান করেছ, আমি তা সইবো না। চল রাধা, আমার কাপড়টা দে, আমি এখানে আর থাকছি না–
মাসি আর থাকতে পারলে না তখন। প্রকাশ মামার হাত দুটো খপ করে ধরে ফেললে। বললে–আমার ঘাট হয়েছে বাবা, তুমি কিছু মনে কোর না। তুমি থাকো–
প্রকাশ মামা বললে–না, আমি কিছুতেই থাকবো না–আমার রাগ তুমি জানো না, রাগ হলে আমি কারোর নই–
রাধা বললে–হ্যাঁ গো, মাসি এত করে বলছে থাকো না–আমি যে তোমাকে বলেছিলুম কালীঘাটের মন্দিরে মায়ের পূজো দেব, কালীঘাটের গঙ্গায় চান করবো–
–তুই থাম মাগী! আগে তোর গঙ্গাচ্চান না আগে আমার ভাগ্নে? দেখছিস আমার ভাগ্নেকে অপমান করেছে মাসি, আর এখন কিনা তোর গঙ্গাচ্চানটাই বড়ো হলো? তোরা বাজারের মেয়েমানুষ, তোদের আবার গঙ্গাচ্চান কী হবে রে? তোদের পাপ কোনওকালে ঘুচবে ভেবেছিস?
কিন্তু মাসি ছাড়লে না। প্রকাশ মামার হাত দুটো ধরে বলতে লাগলো–তুমি রাগ কোর না বাবা, আমি বুড়োমানুষ, কী বলতে কী বলে ফেলেছি, তুমি চলো। তোমার ভাগ্নেকেও আমি যেতে দেব না, আমি বাতাসীকে বলে দিচ্ছি তোমার ভাগ্নেকে তার ঘরে বসাবে। আগে তো ঘরখানা খালি পড়েই থাকতো, এই কমাস হলো বড়বাবু বাতাসীকে এনে ওখানে তুলেছে
প্রকাশ মামা সদানন্দর দিকে চাইলে। বললে–কী রে? থাকবি তুই? এরা এত করে বলচে।
সদানন্দ বললে–না, আমি আর থাকবো না এখানে–
মাসি বললে–কিন্তু এত রাত্তিরে কোথায় যাবে বাবা? গাড়ি-ঘোড়া বাস-ট্রাম তো বন্ধ সব! রাত্তিরটা অন্তত আমার এখানে কাটাও, তোমার মামা আমার পুরোন খদ্দের, খদ্দের হলো গিয়ে লক্ষ্মী, তোমরা চলে গেলে আমার কি ভালো হবে বাবা বলতে চাও? আমার অকল্যেণ হয় তাই কি চাও বাবা তোমরা?
প্রকাশ মামাও বললে–ওরে, যাকগে, যা হয়ে গেছে হয়ে গেছে–তুই থেকে যা, একটা রাত্তিরের তো মামলা, কাল ভোরবেলা উঠেই ট্রেন ধরে নবাবগঞ্জে চলে যাবো–
কিন্তু কথার মধ্যেই বাধা পড়লো। বাইরের দরজায় যেন কারা এসে হাজির হলো। মাসি ভেতর থেকেই বলে উঠলো–কে গো? কে ওখানে?
কিন্তু তার আগেই গিরিধারী দৌড়ে এসেছে–মাসি, বড়বাবু এসেছে–
বড়বাবু কথাটা শুনেই মাসি যেন কেমন চঞ্চল হয়ে উঠলো। বললে–ওমা, বড়বাবু? নিয়ে আয়, নিয়ে আয়, ভেতরে ডেকে নিয়ে আয়–
সঙ্গে সঙ্গে এক ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকলো। বেশ লম্বা-চওড়া দশাসই চেহারা। পায়ের জুতো মশ মশ আওয়াজ করছে। কোট-প্যান্ট পরা ভব্যসভ্য মানুষ। মুখে সিগারেট। গায়ে ভুরভুর করছে মদের সুগন্ধ।
মাসি সামনে গিয়ে যেন একেবারে জুজু হয়ে দাঁড়ালো। বললে–আসুন বড়বাবু, কী ভাগ্যি আমার, আপনার চরনের ধুলো পড়লো আমার বাড়িতে–আজ কার মুখ দেখে উঠেছিলুম–
বড়বাবু কোনও দিকে না চেয়ে জিজ্ঞেস করলে–বাতাসী আছে?
মাসি বললে–আছে বইকি বড়বাবু, বাতাসী আপনার জিনিস, যাবে আবার কোথায়? আসুন, আসুন–
তারপর চেঁচিয়ে ডাকলে–ওলো ও বাতাসী, কোথায় গেলি রে? কে এসেছে দ্যাখসে, তোর বাবু এসেছে–
বড়বাবু সদানন্দ প্রকাশ মামা রাধা সকলকে পাশ কাটিয়ে সোজা বাতাসীর ঘরের দিকে চলতে লাগলো। সামনে দিয়ে যাবার সময় সদানন্দ হঠাৎ ভদ্রলোকের মুখটা দেখেই চমকে উঠেছে। এ সেই পুলিস ইনসপেক্টরটা না? এই লোকটাই তো তাকে থানার হাজতে বার বার জেরা করেছিল। এই লোকটাই তো তাকে জেরা করতে গিয়ে কখনও শাসিয়েছিল, কখনও ভয় দেখিয়েছিল, কখনও লোভ দেখিয়েছিল, আবার কখনও মিষ্টি কথা বলেছিল। আসলে কি এরাও সব এই রকম। এইসব লোক দিয়েই কি এরা চোর-ডাকাত-গুণ্ডা ধরবে? এরাই রাজত্ব চালাবে? রেলবাজার কিম্বা নবাবগঞ্জের সঙ্গে তাহলে কলকাতা শহরের কোনও তফাৎ নেই!
প্রকাশ মামার গলা শোনা গেল হঠাৎ–কী রে, কী দেখছিস? দেখলি তো কত বড় বড় লোক সব এখেনে আসে? দেখতে টিনের চালের বাড়ি হলে কী হবে, এখেনে যারা আসে তারা সবাই আমাদের মত ভদ্রলোকের ছেলে, জানিস? তোকে আমি বাজে জায়গায় নিয়ে এসেছি ভাবিস নি-একেবারে খানদানি বাড়ি–
কিন্তু সদানন্দর কানে এসব কথা ঢুকলো না। তার মাথায় তখন অন্য কথা ঘুরছে। আগে প্রকাশ মামার ওপর তার ঘেন্না হচ্ছিল। কিন্তু প্রকাশ মামা তাকে এখানে না নিয়ে এলে তো সে এই শহরের আর একটা দিক দেখতেও পেত না। জানতেও পারতো না যে দিনের বেলা যাদের দেখে মানুষ শ্রদ্ধা করে, ভয় পায়, সমাজের গণ্যমান্য বলে মাথা উঁচু করে বেড়ায়, রাত্রের অন্ধকারে তাদের আর এক চেহারা, আর এক রূপ! আর এক প্রবৃত্তি।
.
উত্তরের কোণের ঘরের ভেতরে নয়নতারা তখন চুপ করে বসেছিল। ঘরটা এমনি একটা বাড়তি ঘর। কেউ থাকেও না কখনও। থাকবার দরকারও হয় না। এককালে কর্তাবাবু যখন এবাড়ি করেছিলেন তখন ভেবেছিলেন ছেলে-মেয়ে-নাতনিতে তাঁর ঘর ভরে যাবে। কিন্তু তাঁর নিজের সন্তান বলতে হলো ওই একটা মাত্র। তা এক ছেলেই কি কম! সেই এক ছেলের ছেলে-মেয়ে হলেও তো বাড়ি ভরে যাবার কথা। কিন্তু তাও হলো না। হলো মাত্র একটি নাতি। ওই সদানন্দ যখন হলো তখন মস্ত ঘটা করে অন্নপ্রাশনের ব্যবস্থা করেছিলেন। তারপর আরো ক’বছর কাটলো। বছরের পর বছর গড়িয়ে গেল। কিন্তু আর কোনও সন্তান হলো না ছেলের। কর্তাবাবুর ঘরবাড়িও আগেকার মতই ফাঁকা পড়ে রইলো।
