সদানন্দ আর সহ্য করতে পারলে না। সকলকে ঠেলে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালো। বললে–পুলিশ আপনাদের ডাকতে হবে না, তার আগে আমিই পুলিস ডাকবো।
ততক্ষণে গিরিধারী এসে গিয়েছিল। তাকে আর কিছু বলতে হলো না। সে এসেই সদানন্দর গলা টিপে ধরেছে–চুপ কর শালা মাতাল–
কিন্তু তার কথাটা শেষ হবার আগেই সদানন্দ তাকে এক ধাক্কা দিয়েছে আর সঙ্গে সঙ্গে সে উঠোনের ওপর গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে। আর বাড়ির মেয়েরা সবাই মিলে পাড়া কাঁপিয়ে মড়াকান্না জুড়ে দিল। আশেপাশের যত বাড়িতে যত মেয়ে ছিল সবাই এসে হাজির–কী হয়েছে লা? কী হয়েছে তোদের বাড়িতে?
সদানন্দ তখন চিৎকার করে বলে উঠলো–আমার সামনে যে আসবে তারই ওই দশা করবো–ছাড়ো–পথ ছাড়ো–
গিরিধারীকে ধরাশায়ী দেখে সবাই-ই ভয় পেয়ে গিয়েছিল তখন। কিন্তু মাসির ভয় করা চলে না। সে এ-সব ঝামেলা আগে অনেক সামলেছে। সে আর কোনও উপায় না পেয়ে আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো–ওগো, তোমরা সবাই এসে দেখে যাও গো, লোকটা মেয়েমোনুষের টাকা না দিয়ে পালাচ্ছে–
সদানন্দ যদিও বা চলে যেত কিন্তু চলে যেতে গিয়েও তখন থমকে দাঁড়ালো। বললে–হ্যাঁ, আসুক সবাই, আমি এই এখানে দাঁড়িয়ে রইলুম–
বললে–আরো লোকজনের অপেক্ষায় সেই উঠোনের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আবার বললে–কই, কোথায় সব? কেউ আসছে না কেন?
মাসি আবার চেঁচালে–কই গো, তোমরা কে কোথায় আছো এসো, আসামী পালাচ্ছে–
এবার দু’চারজন গুণ্ডা গোছের লোক কোত্থেকে এসে হাজির হলো। বললে–কী হয়েছে মাসি? কোন্ শালা পালাচ্ছে? কোথায় সে?
মাসিকে আর দেখাতে হলো না। সদানন্দ নিজেই বলে উঠলো–এই যে আমি!
একজন সঙ্গে সঙ্গে সদানন্দর গলা ধরবার জন্যে এগিয়ে এসেছে। পেছনের তিনজনও সঙ্গে রয়েছে।
সদানন্দ বললে–খবরদার, সামনে এগোবে না, যা বলবার ওখান থেকে বলো–
–তবে রে!
সে এক হই-হই কাণ্ড বেধে গেল সেই রাত্রে। একদিকে মেয়েমানুষের কান্না, আর একদিকে পুরুষমানুষের পাড়া কাঁপানো কথা কাটাকাটি। আর একটু হলেই হয়ত খুনোখুনি কাণ্ড ঘটে যেত। কিন্তু ঠিক সেই সময়ে কোথা থেকে প্রকাশ মামা এসে হাজির। অন্ধকারে প্রকাশ মামাকে ভালো করে চিনতে পারে নি। একটা গেঞ্জি গায়ে, পরনে লুঙ্গি। মাথার চুল উসকো-খুসকো। পা দুটোও ঠিকমত মাটিতে পড়ছে না। কথাগুলোও স্পষ্ট নয়। সেই অবস্থাতেই টলতে টলতে এসে হাজির। গণ্ডগোলের আন্দাজ পেয়ে বাইরের উঠোনে এসেছিল। সেখান থেকে সদানন্দকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে কাছে এসেছে। এসেই সদানন্দর দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে দু’হাতে ঘুষি বাগিয়ে চিৎকার করে উঠলো–দেখি কোন শালা মারে আমার ভাগ্নেকে, আয় শালারা, লড়ে যাবি আয়–
বলে শুন্যের মধ্যে ঘুষি ঘোরাতে লাগল।
সদানন্দও প্রকাশ মামাকে দেখে অবাক। এতক্ষণ যারা আস্ফালন করছিল তারাও তখন চুপ। মাসি এতক্ষণে এগিয়ে এল। বললে–এই কি তোমার ভাগ্নে নাকি বাবা! তা সে কথা তো তোমার ভাগ্নে বলে নি এতক্ষণ!
প্রকাশ মামা বললে–কে আমার ভাগ্নের গায়ে হাত তুলেছে শুনি, কোন্ শালা হাত তুলেছে আমি তার নাম জানতে চাই–
সদানন্দ বলে উঠলো–প্রকাশ মামা, আমি আর এখানে থাকবো না—
প্রকাশ মামা চেঁচিয়ে উঠলো সদানন্দের কথা শুনে তার মানে? থাকবি না মানে? আমি টাকা দিই নি? আলবৎ থাকবো। আমাদের হক আছে থাকবার। আমি ঘর-ভাড়ার টাকা দিইচি চলে যাবার জন্যে? আমি আমার ঘর-ভাড়া দিইচি, তোর ঘর ভাড়া দিইচি, আমি কি মুফোৎ আছি নাকি এখানে?
তারপর মাসির দিকে চেয়ে বললে–কী হলো মাসি, তুমি চুপ করে আছো যে? তোমার মুখে কথা নেই কেন? আমি তোমাকে টাকা দিয়েছি কিনা বলো! বুকে হাত দিয়ে বলো তুমি! আমি তোমায় ঘর ভাড়ার টাকা, মালের টাকা আগাম মিটিয়ে দিই নি?
ততক্ষণে সমস্ত আবহাওয়াটা যেন একেবারে উল্টে গেছে। ঘটনাটা বেশি দূর গড়ালো না দেখে সবাই যেন বিমর্ষ হয়ে যে-যার কাজে চলে গেল। গুণ্ডাগুলোও কখন অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। কিন্তু প্রকাশ মামার তখনও রাগ থামে নি। তার ভাগ্নের অপমান যেন তার গায়েও লেগেছে। বললে–আমিও আর থাকবো না এখানে। আমিও চলে যাবো, চল সদানন্দ, এ বাড়িতে আর জীবনে আসবো না, এই বলে রাখলুম–চল-ভাত ছড়ালে কাকের অভাব? বাজারে কি মেয়েমানুষের আকাল পড়েছে?
বলে সেখানে দাঁড়িয়েই চেঁচিয়ে ডাকতে লাগলো রাধা, তুইও চলে আয়, এখুনি চলে যাবো এখান থেকে, এ কলকাতা শহর, টাকা ফেললে এখানে ফুর্তি মারবার জায়গার অভাব?
রাধা! ওদিকের কোন্ ঘর থেকে একটা মেয়েমানুষ ঘোমটা দিয়ে এসে হাজির হলো প্রকাশ মামার সামনে। সদানন্দ ভালো করে নজর করে দেখলে চিনতে পারলে রাধাকে। সেই রাণাঘাটের সদরের বাজারে থাকতো। প্রকাশ মামা তাকে নিয়ে গিয়েছিল রাধার বাড়িতে। সে এখানে এল কী করে?
মাসি বললে–তুমি রাগ করছো কেন বাবা? আমি কি জানতুম ও তোমার ভাগ্নে!
প্রকাশ মামা বললে–চিনতে না পারলেই তুমি অপমান করবে তাকে? জানো, ও কত বড়লোকর ছেলে? তোমার মত হাজারটা মাসিকে ও পুষতে পারে তা জানো?
মাসি বললে–তা চিনতে না পারলে কী করবো বাবা? ওকে বাতাসীর ঘরেই বা তুমি রেখে দিয়েছিলে কেন? জানো তো ও বড়বাবুর বাঁধা মেয়েমানুষ। বড়বাবু নিজে ওকে এখানে এনে রেখে গেছে–
