খাওয়া সেরে উঠে প্রকাশ মামা তাকে শুতে বলে কোথায় যেন চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল–তুই এই খাটে শুয়ে ঘুমো রে, আমি পাশের ঘরে আছি
তিন রাত ঘুমোয় নি সদানন্দ। তার ওপর সেই বিয়ের দিন থেকেই উদ্বেগ চলেছে মনের ভেতরে। ক্লান্তিতে চোখ দুটো জুড়ে আসছিল। হঠাৎ কোথায় যেন হারমনিয়ামের সঙ্গে গানের সুর ভেসে এল। এ কোথায় নিয়ে এল তাকে প্রকাশ মামা! এ কার বাড়ি! প্রকাশ মামার সঙ্গে এদের সম্পর্কই বা কী!
হঠাৎ কে যেন ঘরে ঢুকলো। তখন বেশ তন্দ্রা এসেছে সদানন্দর চোখে। তবু পায়ের আওয়াজ কানে এসেছে।
সদানন্দ ঝাপসা অন্ধকার চেয়ে দেখলে একজন মেয়েমানুষ। মেয়েটা সোজা খাটের ওপর শুতে গিয়ে একেবারে সদানন্দর গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। পড়েই চিৎকার ওমা, আমার খাটে কে শুয়ে গো, এখানে কে?
যেন কেউটে সাপের ওপর পা পড়েছে এমনি ভাবে আঁতকে উঠে মেয়েটা দাঁড়াবার চেষ্টা করতে গিয়ে আবার তার গায়ের ওপর ধপাস করে পড়লো। তারপর চিৎকার করে উঠলো–ও মাসি, দেখ তো গো, কে এখানে আমার খাটে শুয়ে রয়েছে–
মেয়েটার চিৎকার শুনে বাইরে থেকে কার গলা কানে এল–কী হলো রে বাতাসী, কী হলো? কে ধরেছে রে তোকে? কে? কোন্ হারামজাদা?
বলতে বলতে হাতে লম্ফ নিয়ে মাসি ঘরে ঢুকলো। কিন্তু ততক্ষণে বাতাসী নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। লম্ফর আলোয় ঘরটা তখন আলো হয়ে গিয়েছে। মাসি ভালো করে চেয়ে দেখল সদানন্দর দিকে। বাতাসীও চেয়ে দেখলে। একেবারে অচেনা লোক।
মাসি সদানন্দকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেও চিনতে পারলে না। বাতাসীও চিনতে পারলে না। অচেনা লোক, বলা নেই কওয়া নেই কোত্থেকে তার ঘরে এসে ঘাপটি মেরে শুয়ে রয়েছে।
মাসি জিজ্ঞেস করলে-তুমি কে গা? কে তোমাকে এ ঘরে এনে বসালে? বেরোও ঘর থেকে, বেরোও
সদানন্দ ততক্ষণে উঠে বসেছে। দুজনের চেহারা দেখে কেমন সন্দেহ হলো। বললে–আমাকে এক ভদ্রলোক নিয়ে এসেছে এখানে। এখানে শুতে বলে বাইরে গেছে–
–ভদ্দরলোক? ভদ্দরলোক আমাদের এখানে আসে নাকি যে ভদ্দরলোকের কথা বলছো? আর কোথা থেকে কে একজন তোমাকে এখানে এনে শুইয়ে দিলে আর তুমিও শুয়ে পড়লে? এ কি ঘুমোবার জায়গা? এখানে কি কেউ ঘুমোতে আসে?
চেঁচামেচি শুনে আরো দু’চারজন মেয়ে এসে হাজির হলো। তারাও সদানন্দকে দেখে অবাক। বললে–এ কে গা মাসি? কার লোক?
মাসি বললে–কে জানে বাছা, ঘর খালি পেয়ে নাকি ঘুমোচ্ছে এখেনে–এখুনি যদি বড়বাবু এসে পড়ে–
কথাটা শুনে সবাই খিল্ খিল করে হেসে উঠলো। ঘুমোবার কথা শুনে সবারই হাসি পেল। এত বড় কলকাতা শহরে ঘুমোবার আর জায়গা পেলে না, ঘুমোতে এলো কিনা এখানে?
সদানন্দর তখন প্রায় অসহ্য হয়ে উঠছিল। চারপাশের এই আবহাওয়া দেখে বুঝতে পারলে প্রকাশ মামা তাকে কোথায় এনেছে। বললে–আমি যার সঙ্গে এসেছিলুম সে কোথায়?
মাসি জিজ্ঞেস করলে–কার সঙ্গে এসেছিলে তুমি? কার কথা বলছো?
সদানন্দ বললে–আমার মামা।
মাসি বললে–মামা? তা তোমার মামা কোন্ ঘরে আছে আমি জানবো কী করে বাছা? বাড়িতে কি একটা লোক? কত ঘরে কত লোক আছে তার হিসেব রাখা কি সোজা? তা তুমি বাছা বাতাসীর ঘরে থাকবে। থাকবে তো বলো! পাঁচ টাকা লাগবে। রাজি থাকো তো থেকে যাও, আমার কোনও আপত্তি নেই–
সদানন্দ সেকথার উত্তর না দিয়ে বললে–আমার কাছে টাকা নেই। আর টাকা থাকলেও আমি থাকতুম না। আমি একবার আমার মামার সঙ্গে কথা বলতে চাই–
মাসি বললে–তোমার মামা কার ঘরে আছে তা আমি কী জানি!
সদানন্দ বললে–কিন্তু আমার মামা যে বলে গেল পাশের ঘরে থাকবে–
মাসি বললে–তোমার মামাও যেমন তুমিও তেমনি। তা খালি পকেটে তোমরা কেন আসো বাছা এখানে?
সদানন্দ বললে–তাহলে আমাকে এখান থেকে চলে যেতে দিন আমি চলে যাই–
মাসি বললে–চলে যাবে মানে? চলে ওমনি গেলেই হলো? ঘর-ভাড়া কে দেবে শুনি? বাতাসীর ঘর-ভাড়া বাতাসী নিজের গাঁট থেকে দেবে নাকি? আমি তোমার কাছ থেকে আগে ঘর-ভাড়া আদায় করবো তবে ছাড়বো। নইলে এখুনি পুলিস ডাকবো–
তারপর পাশের একটা মেয়ের দিকে চেয়ে বললে–যা তো লা পুঁটি, গিরিধারীকে একবার ডেকে নিয়ে আয় তো–যা তো–
সদানন্দ এবার সোজা দরজার দিকে এগিয়ে এল। বললে–পুলিসের ভয় দেখাবেন না আমাকে, আমি পুলিসকে ভয় করি না। টাকা আমার কাছে নেই, আমাকে যেতে দিন–
বাতাসী তখন ভয় পেয়ে গিয়েছে। হাউ-মাউ করে চিৎকার করে উঠলো–ও মাসি, তোমাকে মারবে, তুমি সরে যাও
–ইঃ, মারবে! অমনি মারলেই হলো! টাকা না দিয়ে চলে গেলে আমি পাড়ার লোক ডেকে জড়ো করবো না! তুই অত ভয় পাচ্ছিস কেন লা? বড়বাবুকে খবর দিলে এখখুনি কোমরে দড়ি বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যাবে না–
ততক্ষণে চেঁচামেচিতে আরো লোক জড়ো হয়ে গেছে সেখানে। রাত তখন কত হয়েছে কে জানে। সবাই কিল-বিল করতে করতে এসে হাজির হলো সেখানে। সকলের একই প্রশ্ন কী হয়েছে মাসি? কী করেছে লোকটা?
মাসি বললে–দ্যাখ না মেয়ে, বাতাসীর ঘরে বসলো, এতক্ষণ বসে বসে মদ গিললো, এখন চুপি চুপি পালিয়ে যাচ্ছে, বলে কিনা ট্যাকা নেই। ট্যাকা নেই তো ফুর্তি মারতে এখানে এসেছিলে কেন শুনি? শখ-টখ করে এখন ট্যাকা নেই বললে–তোমাকে ছাড়বো কেন? এ কি ঘরের বিয়ে করা বউ পেয়েছ তুমি?
