বলতে বলতে চৌধুরী মশাই নিজের ঘরে ঢুকে পড়লেন। প্রীতি ততক্ষণে আবার নিজের ঘরের বিছানায় এসে চাদর ঢাকা দিয়ে শুয়ে পড়েছে।
চৌধুরী মশাই বললেন–কী হলো, তোমার নাকি অসুখ?
প্রীতি বললে–হ্যাঁ, শরীর খারাপ—
চৌধুরী মশাই বললেন–তোমার আবার এই সময়ে শরীরটা খারাপ হলো? সময়টা আমার খুবই খারাপ চলছে দেখছি। ওদিকে খোকাকে নাকি পুলিসে ধরে নিয়ে গেছে? ব্যাপারটা কী? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। বাবাজীই বা কোথায় গেলেন?
প্রীতি বললে–সেই সব ভেবেই তো আমার শরীর খারাপ হয়েছে। তুমি আগে হাত মুখ ধুয়ে এসো আমি বলছি
কিন্তু খোকাকে পুলিসে ধরলো কেন? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। প্রকাশই বা কোথায় গেল?
প্রীতি বললে–-সে গেছে কলকাতায়।
–কলকাতায় কেন?
–খোকাকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনতে। পুলিস তাকে ধরে কলকাতায় নিয়ে গেছে। তুমি এত দূর থেকে এলে, হাত মুখ ধুয়ে ঠাণ্ডা হয়ে এসো, আমি সব বলছি–
চৌধুরী মশাই বললেন–তার আগে আমি একবার ওপরে গিয়ে বাবাকে দেখে আসি–
বলে বাইরে চলে গেলেন। চৌধুরী মশাই চলে যেতেই গৌরী ঘরে ঢুকলো। প্রীতি বললে–গৌরী, এদিকে আয়, একটা কথা শোন, কাউকে বলিস নি যেন। বউমাকে আমি উত্তরের কোণের ঘরে লুকিয়ে তালাবন্ধ করে রেখেছি, বুঝলি? কেউ যেন না জানতে পারে! ছোট মশাই কি কেউ যদি জিজ্ঞেস করে বলবি বউমার বাবা এসে বউমাকে কেষ্টনগরে নিয়ে গেছে, বুঝলি? বিষ্টুর মা’কেও তাই বলে দিবি–
গৌরী বললে–কেন বউদি, কী হয়েছে?
প্রীতি বললে–তোর অত সাত-সতেরোয় দরকার কী? আমি যা বলছি তাই করবি, বুঝলি?
.
ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই সদানন্দ চারদিকে চেয়ে দেখলে। এ কোথায় এসেছে সে! কোথায় রাত কাটিয়েছে! কাদের বাড়ি!
এক মুহূর্তে আগের দিনের ঘটনাটা সব মনে পড়ে গেল। অত দেরিতে তখন আর নবাবগঞ্জে ট্রেন ছিল না, তাই পুলিসের হাজত-ঘর থেকে প্রকাশ মামা এখানে এনে তুলেছিল তাকে। প্রকাশ মামা বলেছিল–তোর কিছু ভাবনা নেই, কলকাতা শহরে রাত কাটাবার জায়গার অভাব নেই। ভাত ছড়ালে আবার কাকের অভাব? আমার ট্যাঁকে টাকা রয়েছে, ভাবনাটা কীসের?
বলে এখানে নিয়ে এসেছিল তাকে। মনে আছে চারদিকের আবহাওয়া দেখে সদানন্দর কেমন সন্দেহ হয়েছিল। জিজ্ঞেস করেছিল–এ কোথায় নিয়ে এলে তুমি আমাকে?
প্রকাশ মামা বলেছিল–এ জায়গার নাম কালীঘাট–
তারপরে তাকে এক টিনের চালের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে উঠিয়েছিল। ছোট-ছোট মাপের সব টিনের চালের বাড়ি চারদিকে। মাঝখান দিয়ে সরু সরু গলি-রাস্তা। চারদিকে গিশ-গিশ করছে লোকজন। জনা কয়েক মেয়েমানুষও ঘুরে বেড়াচ্ছে আশে-পাশে। মাথা নিচু করে ঘরের ভেতরে ঢুকতে হয়। ঘরের ভেতরে সাজানো-গোছানো একটা ডবল-খাট, মুখ দেখবার বড় আরশি।
প্রকাশ মামা বললে–দাঁড়া, আগে খাবার ব্যবস্থা করে আসি–
বলে প্রকাশ মামা তাকে রেখে কোথায় বেরিয়ে গেল। তারপর কোথা থেকে একটা লোককে ধরে নিয়ে এল। তার হাতে দু’থালা ভাত তরকারি।
প্রকাশ মামা বললে–আয়, বসে পড়, আগে পেট ঠাণ্ডা করি।
বলে নিজেই মাটিতে খেতে বসে পড়ল। সদানন্দও পাশে বসলো। কিছু তো খেতে হবে। কিন্তু ভাত মুখে দিতেই যেন সমস্ত ক্ষিদে চলে গেল এক মিনিটে। যেমন ঝাল আর তেমনি ঠাণ্ডা! বহুদিন পরে এই কালীঘাটের টিনের বস্তিতে রাত কাটানোর স্মৃতিটা বহুবার সদানন্দর মনে পড়েছে। জীবনের উত্তরকালে যাকে একদিন আসামী হয়ে জীবন কাটাতে হবে তার পক্ষে এই শিক্ষানবিশিটা বোধ হয় দরকার ছিল। দরকার ছিল এই কৃচ্ছ্রসাধনের। ধনীর সন্তান হয়েও তার যে সে ধনের ওপর একদিন কোনও অধিকার থাকবে না এটাই বোধ হয় ছিল তার সৃষ্টিকর্তার বিধান। তাই কোনও অপরাধ না করেও যেমন কালীগঞ্জের বউকে খুন হতে হলো, কোনও পাপ না করেও কপিল পায়রাপোড়াকে যেমন বারোয়ারিতলার বটগাছে গলায় দড়ি দিতে হলো, তেমনি কোন অন্যায় না করেও তাকে একদিনের জন্যেই হাজত-ঘরে কাটাতে হলো। জন্মালেই যেমন মানুষকে মরতে হয় তেমনি মরবার জন্যেই মরবার আগে মানুষকে অনেকবার মরতে হয়। বার বার মরে মরে মরবার শিক্ষানবিশি করতে হয় মানুষকে। এও সেই শিক্ষানবিশির মতন। এ শিক্ষানবিশি না করলে ভালো করে মরতে পারবো কেন? ভালো করে বাঁচবার জন্যে যেমন শিক্ষানবিশি দরকার, মরবার জন্যেও তেমনি। তোমার পৈতৃক অনেক টাকা আছে স্বীকার করি, কিন্তু সেই টাকা, সেই ঐশ্বর্য তোমাকে মৃত্যুর হাত থেকে কি রক্ষা করতে পারবে? তার চেয়ে আগে থেকেই তৈরী হয়ে নাও। যেন মরবার সময় মুখে হাসি ফোটাতে পারো।
আজ যে সদানন্দ রসিক পালের কাছারিবাড়িতে পরান্নভোজী, সেদিনের সেই ছোটবেলার সদানন্দও ঠিক তাই-ই ছিল। তখনও ছিল সে পরান্নভোজী। বাড়ি তার বাড়ী নয়, বাবা তার বাবা নয়, মা–ও তার মা নয়, স্ত্রীও তার স্ত্রী নয়। অথচ সবাই-ই তার আপন। সবাই-ই তার আপনার জন।
প্রকাশ মামা হঠাৎ বলে উঠলো–কী রে, খাচ্ছিস না যে, আর একটা মাছ নিবি?
প্রকাশ মামা যখন খেতো তখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভুলে বসে থাকতো। এক-একজন মানুষ থাকে সংসারে যারা বোধ হয় পৃথিবীতে খাবার জন্যই বাঁচে। আবার এমন লোকও থাকে যারা বাঁচার জন্যই খায়। কিন্তু প্রকাশ মামা খেতো শুধু খাবার জন্যেই। নিজে খাবে শুধু তাই-ই নয়, পরকেও খাওয়াবে। বউ-ছেলে-মেয়েকে খাওয়াবে, রাণাঘাটের বাজারের রাধাকে খাওয়াবে। যাকে সামনে পাবে তার সঙ্গে মিলে-মিশে খাবে। যদি সদানন্দর মা না থাকতো তাহলে বোধ হয় প্রকাশ মামা না খেতে পেয়েই মরতো।
