নয়নতারা মুখ তুললো। বললে–তা আমি কী করবো বলুন, আমাকে দেখলেই যে তিনি মুখ ফিরিয়ে চলে যান–
–তা খোকা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তোমাকে অপমান করবে আর তুমি তা বোবার মত সহ্য করবে? তোমার মুখ নেই? তুমি কথা বলতে জনো না? তুমিও তাকে অপমান করতে পারো না?
নয়নতারা বুঝতে পারলে না কথাটা। বললে–আমি পরের বাড়ির মেয়ে হয়ে এ বাড়ির ছেলেকে অপমান করবো?
–কে বললে তুমি পরের বাড়ির মেয়ে? পরের বাড়ির মেয়ে তুমি যখন ছিলে তখন ছিলে, কিন্তু এখন তুমি এবাড়ির বউ, এবাড়িতে আমার ছেলের যতখানি অধিকার, তোমারও যে ঠিক ততখানিই অধিকার বউমা। তুমি ভুলে যেও না বউমা আমার ছেলে যদি তোমাকে অপমান করে তো সে-অপমান আমার গায়েও লাগে! আমার ছেলে তোমাকে অপমান করবে আমি তা সহ্য করবো না। তোমার জায়গায় যদি আমি হতুম বউমা তো আমি কিন্তু তোমার মত মুখ বুঁজে এ অপমান সহ্য করতুম না। আমি এর একটা হেস্ত-নেস্ত করতুমই–
নয়নতারা বললে–কিন্তু আমি হেস্তনেস্ত করবো কী করে?
শাশুড়ী বললে–সেই কথাই তো তোমাকে বলছি বউমা, সেই কথা বলতেই তো তোমায় আমার কাছে ডেকে এনেছি। তুমি জোর করবে। খোকা যদি জোর করে তোমার ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে চায় তো তুমিও জোর করে ঘরে আটকে রাখবে–তাও পারবে না তুমি?
–কিন্তু সেদিন তো আপনি বাইরে থেকে দরজায় শেকল দিয়ে দিয়েছিলেন, তবু তো আমাকে উনি অপমান করলেন, সারারাত আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রইলেন—
শাশুড়ী বললে–তা যদি আবার তা করে তো তুমি খোকার হাত ধরে তোমার দিকে মুখ ফিরিয়ে দেবে। দেখো তখন কী করে! তোমার গায়ে তো আর তা বলে হাত তুলবে না সে! তখন তো আমি আছি–
–আপনি কী বলছেন মা? আমি ওঁর হাত ধরবো? ওঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি কাজ করবো? এর চেয়ে যে আমার মরণও ভালো! মেয়েমানুষ হয়ে এত নিচেয় নামবো?
শাশুড়ী বললে–একে তুমি নিচেয় নামা বলো? তা এতই যদি তোমার উঁচু-নিচু জ্ঞান তো মরতে মেয়েমানুষ হয়ে জন্মেছিলে কেন তুমি? পুরুষ-মানুষ হয়ে জন্মাতে পারলে না? তাহলে আর তোমাকে এই অপমান সইতে হতো না, আর বউ হয়ে পরের বাড়িতেও যেতে হতো না–! আর অপমানের কথা বলছো? এই পড়ে পড়ে মার খাওয়া বুঝি অপমান নয়? এ-অপমানের চেয়ে তো অন্তত সে-অপমানও ভালো! তাতে তোমার কী এমন গায়ে ফোস্কা পড়বে?
নয়নতারা অসহায়ের মত শাশুড়ীর দিকে চাইলে। বললে–তাহলে আমাকে কী করতে বলেন আপনি বলুন? আপনি যা করতে বলবেন আমি তাই-ই করবো, বলুন–
শাশুড়ী নয়নতারার থুতনিতে হাত দিয়ে আদর করলে। যেন বড় খুশী হয়েছে প্রীতি। বললে–এই তো লক্ষ্মী বউ-এর মত কথা। তবে শোন বউমা, প্রকাশ আজ হোক কাল হোক যখন খোকাকে নিয়ে আসবে আমি খোকাকে বলে দেব বউমাকে তার বাবা এসে কেষ্টনগরে নিয়ে গেছেন। আমি তোমার শ্বশুরকে, মামাশ্বশুরকেও সেই কথাই বলবো। তারাও জানবে যে তোমার বাপ এসে কেষ্টনগরে নিয়ে চলে গেছেন, বুঝলে?
নয়নতারা অবাক হয়ে গেল। বললে–কিন্তু আমাকে যে দেখতে পাবে সবাই—
শাশুড়ী বললে–তোমাকে দেখতে যাতে না পায় তারই ব্যবস্থা করবো
–কী ব্যবস্থা করবেন আপনি?
শাশুড়ী বললে–আমি তোমাকে একটা ঘরে লুকিয়ে রাখবো, যাতে তোমাকে কেউ দেখতে না পায়–
নয়নতারা জিজ্ঞেস করলে-কেউ দেখতে পাবে না আমাকে?
শাশুড়ী বললে–তোমাকে দেখতে তো পাবেই না, আর জানতেও পারবে না যে তুমি এবাড়িতে আছে। আর গৌরী, বিষ্ঠুর মা, ওরা আমার হাত ধরা লোক, আমি যদি বলে দিই ওদের গলা টিপে মেরে ফেললেও ওরা কখনও সত্যি কথা বলবে না–
নয়নতারা বললে–কিন্তু বাবা মামাবাবু–ওঁরা তো ভেতর-বাড়িতে আসবেন, ওদের নজরে যদি পড়ে যাই?
শাশুড়ী বললে–আমি তো বলছি সে-ব্যবস্থা আমি করবো, সে তোমাকে ভাবতে হবে না–তোমার ঘরের পাশে যে-ঘরটা আছে আমি তোমাকে সেখানে রেখে দিয়ে বাইরে থেকে তালা-চাবি লাগিয়ে দেব। কিন্তু তুমি বলো আমি যা বলেছি তোমাকে তা তুমি করতে পারবে?
নয়নতারার কেমন যেন ভয় করতে লাগলো। রূপ দেখিয়ে জোর করে স্বামীর ভালবাসা আদায় করতে হবে, নিজেকে অপমান করার এর চেয়ে নীচ পদ্ধতি আর কী থাকতে পারে!
শাশুড়ী বললে–কী ভাবছো বউমা? স্বামীকে বশ করার জন্যে এর চেয়ে কত নিচু কাজ মেয়েমানুষকে করতে হয় তা তুমি জানো না? রামায়ণ-মহাভারতে পড়ো নি? আর আমার সংসারের ভালোর জন্যে, তোমার আমার সকলের ভালোর জন্যে তুমি এইটুকুও করতে পারবে না?
নয়নতারা বললে–আমি চেষ্টা করবো মা, আমি পারতে চেষ্টা করবো ঠিক এই সময় বাইরে চৌধুরী মশাই-এর গলার শব্দ শোনা গেল–গৌরী, গৌরী।
শাশুড়ী তাড়াতাড়ি উঠে পড়লো। বললে–চলো বৌমা, তোমার শ্বশুর এসেছেন, শিগগির এখান থেকে চলো–নইলে তোমাকে ওঁরা দেখে ফেলবেন–
বলে নয়নতারাকে নিয়ে বারান্দা পেরিয়ে কোণের একটা ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে। তারপর বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিলে।
গৌরী ততক্ষণে চৌধুরী মশাই-এর গলা পেয়ে সামনে এসেছে।
চৌধুরী মশাই গৌরীকে দেখেই বললেন–কী রে, কারোর যে সাড়াশব্দ পাচ্ছিনে, বাবাজীর ঘর হাট করে খোলা, কোথায় গেল সব? খোকাকে নাকি পুলিস ধরেছে? আমি দুদিন বাড়িতে নেই এরই মধ্যে এতকাণ্ড ঘটে গেল–
গৌরী বললে–বউদির অসুখ–
–বউদির অসুখ? সে কী? কী অসুখ হলো আবার? কখন অসুখ হলো?
