হঠাৎ শাশুড়ী বললে–বউমা—
নয়নতারা শাশুড়ীর মুখের কাছে মুখ এনে বললে–কিছু বলবেন মা?
শাশুড়ী বললে–তুমি আর কেন কষ্ট করছে বউমা, তুমি এবার যাও, নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ো গে, গৌরী খেয়ে এখুনি আসছে, তুমি যাও, তোমার কষ্ট হচ্ছে–
নয়নতারা বললে–আমার আর কীসের কষ্ট? আমার তো কিছু কষ্ট হচ্ছে না–
কথাটা শুনে শাশুড়ীর যেন ভালো লাগলো। বললো–আমার বড় সাধ ছিল বউমা যে ছেলের বিয়ে দিয়ে আমি বউ-এর হাতে সেবা নেব, কিন্তু তা আমার কপালে নেই।
নয়নতারা বললে–ও কথা কেন বলছেন মা? আপনার সেবা করতে তো আমার ভালো লাগছে
শাশুড়ী বললে–আমার একটা কাজ করতে পারবে বউমা?
নয়নতারা বললে–বলুন? কী করতে হবে বলুন? জল খাবেন?
শাশুড়ী বললে–না, জল খাবো না। খোকা যখন বাড়িতে আসবে তখন একটা কাজ করতে হবে বউমা তোমাকে। পারবে?
নয়নতারা ভয় পেয়ে গেল। বললে–আপনি বললে নিশ্চয় পারবো। বলুন কী করতে হবে?
শাশুড়ী বললে–-দেখ বউমা, আমার তো কোনও অভাব নেই দেখছো তুমি? মেয়েমানুষ যা চায় আমি সে-সবই পেয়েছি। আমার এই জমজমাট সংসার, আমার স্বামী, আমার সন্তান, আমার গয়নাগাঁটি বাড়ি জমি-জমা টাকাকড়ি কিছুরই অভাব রাখেন নি ভগবান। কিন্তু একটি জিনিস আমি পাই নি বউমা। তোমার শ্বশুরেরও সেই একটাই অভাব। তুমি আমাকে তা দেবে বউমা? দিতে পারবে?
নয়নতারা অবাক হয়ে গেল শাশুড়ীর কথা শুনে। বললে–আমি?
–হ্যাঁ বউমা, তুমিই কেবল আমাকে তা দিতে পারো, আর কেউ দিতে পারে না। আমার বুড়ো অথর্ব শ্বশুর কবে থেকে আশা করে আছেন তার জন্যে। কিন্তু আর বোধ হয় তাঁর সে-আশা পূর্ণ হলো না?
নয়নতারা বললে–বলুন মা, আমাকে কী করতে হবে বলুন–
–কিন্তু তুমি যদি না পারো, তাহলে কী হবে? আমার শ্বশুর অসুখে পড়বার আগে আমাদের এখানকার কাঞ্চন স্যাকরাকে দিয়ে একটা কুড়ি ভরির সোনার হার পর্যন্ত গড়াবার বায়না দিয়েছেন।
তবু নয়নতারা যেন ঠিক জিনিসটা কী তা বুঝতে পারলে না। কিম্বা হয়ত শুধু খানিকটা আন্দাজ করতে পারলে।
শাশুড়ী বললে–কিন্তু খোকার কাণ্ড দেখে আমি বড় ভয় পেয়ে গেছি বউমা, আমার সে সাধ বোধ হয় এ-জীবনে আর মিটবে না—
নয়নতারা এ কথার উত্তরে কিছুই বললে না। যেমন পাখা করছিল তেমনিই পাখা করতে লাগলো। কিন্তু তখন আর সে-পাখার হাওয়া লাগছে না শাশুড়ীর গায়ে।
–কই বউমা, তুমি কোনও কথা বলছো না যে!
নয়নতারা মুখ নিচু করে বললে–আমি কী বলবো বলুন?
শাশুড়ী বললে–তুমি চুপ করে থাকলে আমি কার ভরসায় বেঁচে থাকি বলো বউমা? আর আমার কে আছে? তুমি ছাড়া এ-সাধ আমার কে মেটাবে বলো? দেখছো তো, তোমার মুখে হাসি ফোঁটাবার জন্যে তোমার শ্বশুর এক বাবাজীকে ধরে কত তুক-তাক, পূজো-যাগ যজ্ঞ হোম করবার ব্যবস্থা করলেন। সেও একটা বুজরুক। বুজরুকের পাল্লায় পড়ে মাঝ থেকে এক গাদা টাকাই নষ্ট হয়ে গেল মিছিমিছি, কোনও ফলই হলো না। উল্টে খোকা কোথায় পুলিসের হাতে কিনা ধরা পড়লো। এখন কী হবে ভগবানই জানেন। কোথায় রইল খোকা আর কোথায় রইলে তুমি
নয়নতারা বললে–আপনি কেন ও নিয়ে ভাবছেন মিছিমিছি মা, তাকে ছাড়াবার ব্যবস্থা করতে তো উনি গেছেন!
শাশুড়ী বললে–তুমি প্রকাশের কথা বলছো? তাহলেই হয়েছে। এতদিন এ বাড়িতে আছো আর তুমি প্রকাশকে চিনলে না? ওর কথায় কি বিশ্বাস আছে বউমা?
–কিন্তু উনি যে এক হাজার টাকা নিয়ে গেলেন। আমি নিজের হাতে যে ওঁকে সিন্দুক খুলে টাকা বের করে দিলুম, উনি যে বললেন পুলিসকে নাকি ঘুষ দিতে হবে–আমি তো বাবাকে তাই-ই বললুম, বাবাও যে তাই শুনে নিশ্চিন্ত হয়ে চলে গেলেন–
শাশুড়ী বললে–তা খোকা যদি ছাড়া পায় তো ভালই, তারপরে আমার আর তোমার ভাগ্য! কিন্তু আমি যে কথা তোমাকে বললুম তার তো কোনও জবাব তুমি দিলে না বউমা?
–কোন্ কথার জবাব মা?
শাশুড়ী বললে–ওই যে বললুম, আমার বড় সাধ আমি নাতির মুখ দেখবো, একটা কোল আলোকরা নাতি। তুমি আমাকে নাতি দিতে পারবে বউমা? আমি তাকে কোলে নিয়ে আদর করবো, আমি তাকে চুমু খাবো, আমি তাকে নিয়ে খেলা করবো–দেবে বউমা, দেবে?
কথার মাঝখানেই নয়নতারার পাখাটা হাত থেকে খসে পড়লো। শাশুড়ীর বুকের ওপর মুখ গুঁজে কান্নায় ভেঙে পড়লো সে।
–কী বউমা তুমি কাঁদছো? তুমি পারবে না? আমার একটা মাত্র সাধ তা-ও তুমি মেটাতে পারবে না বউমা?
নয়নতারা শাশুড়ীর বুকে মুখ রেখেই বলতে লাগলো–আপনি আমাকে কেন বউ করে আনলেন মা? এই-ই যদি আপনার মনে ছিল তাহলে অন্য কোনও মেয়েকে ঘরে আনলেন না কেন? সে হয়ত আপনার সব সাধ মেটাতে পারতো…..
শাশুড়ী দু’হাত দিয়ে নয়নতারার মাথায় হাত বুলোত বুলোতে বলতে লাগলো–না বউমা, তুমি আমার বড় লক্ষ্মী বউ, তুমি পারবে, একটু চেষ্টা কোর, তুমিই পারবে বউমা–
নয়নতারা বললে–কিন্তু আমি কী করে পারবো মা? আমার কি অত ক্ষমতা আছে?
শাশুড়ী বলে উঠলো–কেন পারবে না বউমা? তোমার এই রূপ দেখেই তো তোমাকে আমি বউ করে ঘরে এনেছি। তোমাকে ভগবান এত রূপ দিয়েছে আর তুমি কিনা বলছো তুমি পারবো না? আর কিছু না হোক তোমার রূপ দিয়েও তো আমার ছেলেকে ধরে রাখতে পারো! আর তা যদি না পারো তো আমি কী নিয়ে থাকবো? আমার খোকাই যদি বিবাগী হয়ে যায় তো কাকে নিয়ে আমি সংসার করবো তাই বলো?
