সেই নবাবগঞ্জের চৌধুরী বাড়িটার ভেতরে যে তখন ভাঙন ধরতে শুরু হয়েছে, বাইরে থেকে কিন্তু তা এতটুকু বোঝবারই উপায় ছিল না। বাইরে তখনও বিধু কয়ালের ছেলে শশী কয়াল দাঁড়িপাল্লায় ধান-চাল মেপে মেপে গোলায় তোলে। পরমেশ মৌলিক প্রতিদিন চণ্ডীমণ্ডপে এসে কাঠের বাক্সখানা সামনে নিয়ে বসে। তারপর খেরো খাতাখানা খুলে হিসেবের কুটিল অঙ্কগুলো কষতে কষতে জলের মত তরল-সরল করে আয় ব্যয়ের সমতা সাধন করে। কিন্তু আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলেই তার মাথায় টনক নড়ে ওঠে।
কিন্তু পরমেশ মৌলিকের মাথার ওপর আছে কৈলাস গোমস্তা। কৈলাস গোমস্তা আরো পাকা লোক। সে সেই খাতাগুলো দেখে আর দেখার পর মঞ্জুর করে দেয়। কোথাও বা খরচ জোড়ে, তারপর তা থেকে সেগুলো পাকা খাতায় তোলে।
যতদিন কর্তাবাবু সুস্থ ছিলেন ততদিন তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন।
বলতেন–এটা এখানে কী লিখেছ কৈলাস? এই দুটো পয়সা কীসের খরচা?
কৈলাস বলতো–আজ্ঞে দু’পয়সার বিড়ি–
–বিড়ি?
বিড়ি শুনে চমকে যেতেন কর্তাবাবু। বলতেন–বিড়ি খেয়েছে কে? এবাড়িতে বিড়ি কে খায়?
কৈলাস বলতো-আজ্ঞে ওই যে কাঞ্চন স্যাকরা এসেছিল, সে বিড়ি খেতে চাইলে কিনা, তাই– কর্তাবাবু রেগে যেতেন। বলতেন–কাঞ্চন স্যাকরা বিড়ি খেলে?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
–তা সে বিড়ি খাক আর গাঁজাই খাক, তার জন্যে আমি পয়সা দেব কেন? তার নেশার খরচ যোগাবার জন্যে আমার কীসের গরজ?
কৈলাস গোমস্তা কিন্তু-কিন্তু করতো। বলতো–আজ্ঞে, সে যে বিড়ি খেতে চাইলে…
কর্তাবাবু বলতেন–না, ওসব চলবে না আমার কাছে, বিড়ি খেতে হয় তো সে নিজের পয়সায় খাক। তুমি এক কাজ করো, ওর’ নামে তো একশো টাকা আগাম বায়না লেখা আছে, ওই জায়গায় ওটা কেটে লিখে রাখো একশো টাকা দু’পয়সা আগাম। আর এবার থেকে যদি আর কখনও বিড়ি খেতে চায় তো তবিল থেকে আর পয়সা দেবে না। বারোয়ারিতলায় পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকান আছে, তুমি তাকে দোকান দেখিয়ে দেবে–
কৈলাস মাথা পেতে অপরাধ স্বীকার করে নিত। বলতো–আজ্ঞে, তাই দেব।
এককালে কর্তাবাবু কালীগঞ্জের হর্ষনাথ চক্রবর্তীর গোমস্তাগিরি করেছেন, সুতরাং গোমস্তারা কী রকম করে হিসেবের কারচুপি করে তা তিনি জানতেন। এখন তারই গোমস্তা আবার তেমনি করে হিসেবের কারচুপি করবে তা তিনি বরদাস্ত করতে পারবেন না।
দু’টো তো মাত্র পয়সা। কিন্তু সেই দুটো পয়সার অপব্যয়ও তিনি সহ্য করতে পারতেন না। এখন এই যে তিনি চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়ে আছেন, তিনি জানতেও পারছেন না তার কৈলাস গোমস্তা কত দু’পয়সা হিসেবে কারচুপি করছে।
তবু বাইরে থেকে সবাই ঠিক আছে। ননী ডাক্তার নিয়ম করে আসছে, ওষুধও পড়ছে নিয়মমত। দীনুও সেবা করে যাচ্ছে দিনরাত। আর সে সেবাও ঠিক তেমনি সেবা। নিজের পরিবারও এমন করে কোনও স্বামীকে সেবা করতে পারে না।
অথচ দীনুর কি একটা কাজ! বেয়াই বাড়ি থেকে লোক এল তত্ত্ব নিয়ে, তাদের চান করবার জন্যে তাকেই কুয়ো থেকে জল তুলে দিতে হবে। বিশ্বাস করবার মত নির্ভর করবার মত লোক ওই এক দীনুই। দীনু যে কখন ঘুম থেকে ওঠে, কখন খায় কখন ঘুমোয় তা কেউ দেখতে পায় না। ডাকলেই দীনু এসে হাজির হবে। বলবে–আমাকে ডাকছিলেন আজ্ঞে?
এরই মধ্যে চৌধুরী মশাই সেদিন রানাঘাটের কোর্ট থেকে দৌড়তে দৌড়তে ফিরলেন। তার যেন আর তর সইছিল না। চণ্ডীমণ্ডপে পরমেশ মৌলিক আপনমনে কাজ করছিল। ছোট মশাইকে দেখেই দাঁড়িয়ে উঠলো।
–কী পরমেশ, খবর সব ভালো তো? প্রাণকেষ্ট সা’ মশাই-এর আড়ত থেকে পাটের টাকা দিয়ে গেছে?
পরমেশ মৌলিক বললে–আজ্ঞে, কই, না তো!
–আর ভুবন বসাক? ভুবন বসাক আর এসেছিল?
–আজ্ঞে না।
চৌধুরী মশাই রেগে গেলেন। বললেন–দেখলে, আমি নেই, আর সবাই সাপের পাঁচ পা দেখেছে–
পরমেশ মৌলিক হঠাৎ কথার মাঝখানে বলে উঠলো–আজ্ঞে দারোগাবাবু এসেছিল, পরশু
–দারোগাবাবু? রেল-বাজারের দারোগাবাবু? কেন? আবার পাওনা-গণ্ডা চায় নাকি?
–আজ্ঞে না, তা নয়, বলতে এসেছিলেন খোকাবাবু ধরা পড়েছেন।
–খোকাবাবু? আমাদের সদা? ধরা পড়েছে? তার মানে?
–আজ্ঞে ধরা পড়েছে মানে পুলিসে অ্যারেস্ট করেছে।
–সে কী? কী জন্যে অ্যারেস্ট করেছে সদাকে? কী করেছিল সে?
এত বড় একটা ঘটনা শুনে চৌধুরী মশাই যেন প্রথমে একটু নাড়া খেলেন। দুটো দিন মাত্র বাড়িতে গরহাজির, এর মধ্যে এমন দুর্ঘটনা ঘটে গেল! হঠাৎ নজর পড়লো বৈঠকখানার দিকে। কী হলো? ঘরের দরজা হাট করে খোলা কেন?
আর দাঁড়ালেন না সেখানে। সোজা বৈঠকখানা ঘরের মধ্যে গিয়ে দেখেন সেখানে কেউ নেই। চারদিকে যেখানকার জিনিস সেখানেই রয়েছে, শুধু বাবাজীই নেই কোথাও। তাঁর খড়ম, ত্রিশূল, গেরুয়া কাপড়খানা পর্যন্ত উধাও হয়ে গেছে।
তারপর কী যেন সন্দেহ হলো। ভেতর বাড়ির দরজা পেরিয়ে ডাকলেন–গৌরী, গৌরী–সব গেলি কোথায়?
.
প্রীতি ঘরের ভেতর নিজের বিছানায় শুয়ে ছিল। নয়নতারা পাশে বসে পাখার হাওয়া করছিল শাশুড়ীকে। অত ঠাণ্ডার মধ্যেও শাশুড়ী ঘামছিল শুয়ে শুয়ে। বড় ভয় করছিল নয়নতারার। এই কদিন আগে তার মা হঠাৎ চলে গেছে। অথছ তার বিয়ের দিনও কেউ কল্পনা করতে পারে নি তার মা এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে। এই ক’টা দিন ধরে তার জীবনে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বাবার কথাও মনে পড়তে লাগলো। বাবা এতক্ষণ বোধ হয় ট্রেনে উঠে বসেছে।
