গাড়িটা তখন বারোয়ারিতলা দিয়ে চলেছে। ভট্টাচার্যি মশাই-এর মনটা বড় ভারি-ভারি লাগছিল। মেয়ের সুখ, মেয়ের ঐশ্বর্য দেখে খুশী যেমন হয়েছিলেন, তেমনি মেয়েকে ছেড়ে আসতে খুব কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। পাশে নিখিলেশ চুপ করে বসে ছিল।
ভট্টাচার্যি মশাই বললেন–কী নিখিলেশ, তুমি চুপ করে আছো যে? কেমন দেখলে? আমি বলেছিলুম না যে নয়নের ভালো ঘরে বিয়ে হয়েছে। কত বড় বাড়ি দেখলে? আর নয়নের রান্না কী চমৎকার সেটাও বলো, সব ওর মায়ের কাছে শেখা, বুঝলে? ওইরকম ছোলার ডালের মুড়িঘণ্ট নয়নের মাও রাঁধতো—
নিখিলেশ স্বীকার করলে। বললে–হ্যাঁ, রান্নাটা খুব ভালো হয়েছিল মাস্টার মশাই—
রাস্তার পাশে বেহারি পালের বেনে-মশলার দোকান। গরুরগাড়িটার ভেতর অচেনা মুখ দেখে একটু কৌতূহল হলো বেহারি পালের। গাড়িটা যে কর্তাবাবুর তা রজব আলিকে দেখে বুঝতে পারলে। কিন্তু গাড়ির ভেতরে ওরা কারা?
সেখানে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞেস করলে বেহারি পাল–মশাইরা কোত্থেকে আসছে?
ভট্টাচার্যি মশাই-এর সেদিকে নজর পড়লো। কিন্তু উত্তর দিলে রজব আলিই। সে বললে–আমাদের বেয়াই মশাই, মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন–
বেহারি পাল হাত জোড় করে কপালে ঠেকালে। বললে–আপনারা ব্রাহ্মণ? প্রণাম হই।
ভট্টাচার্যি মশাইও নিয়মানুযায়ী প্রণাম করলেন। বললেন–আপনি?
–আমার নাম বেহারি পাল। আমার এই বেনে-মশলার দোকান। তা মেয়ের আপনি বিয়ে দিয়েছেন বটে, কিন্তু কুটুম ভালো হয় নি–
হঠাৎ কথাটার আকস্মিকতায় ভট্টাচার্যি মশাই যেন স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। কোথাকার কে বেহারি পাল, তার এ মন্তব্য করবার কতটুকু অধিকার তাও তিনি বুঝতে পারলেন না। হঠাৎ এ মন্তব্য করার উদ্দেশ্য কী তাও তাঁর বোধগম্য হলো না। কথাটা শুনে তিনি কিছুক্ষণের জন্যে যেন হতবাক হয়ে চেয়ে রইলেন ভদ্রলোকের দিকে।
কিন্তু রজব আলি তখন গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। বেহারি পালের বেনে-মশলার দোকান ছাড়িয়ে যখন অনেক দূর চলে এসেছে তখন যেন ভট্টাচার্যি মশাই-এর মুখে প্রথম কথা বেরোল।
বললেন–নিখিলেশ, ভদ্রলোকের কথাটা শুনলে? ও ভদ্রলোক ও কথাটা বললে কেন বলো দিকিনি?
নিখিলেশ বললে–পাড়াগাঁয়ের লোক তো, ওরা ওমনি পরশ্রীকাতর হয় মাস্টার মশাই–ওকথা নিয়ে আপনি মাথা ঘামাবেন না–
কথাটা ভট্টাচার্যি মশাই এর খুব মনঃপুত হলো। বললেন–তুমি ঠিক বলেছ নিখিলেশ, ঠিক বলেছ তুমি, এ পরশ্রীকাতরতার কথা। পল্লীগ্রামে কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না। অথচ তুমি তো নিজের চোখেই সব দেখলে। নিজের কানেই সব শুনলে, কুটুম কি খারাপ করেছি নিখিলেশ? তুমিই বলো? মেয়ে আমার ভালো ঘরে পড়ে নি? ডাকাত বলে ভুল করে যদি জামাইকে ধরে নিয়ে যায় তো জামাই কী করবে? আমার জামাই-এর তো কোনও দোষ নেই–
নিখিলেশ বললে– কে কী বললে তা নিয়ে আপনি অত ভাবছেন কেন মাস্টার মশাই? লোকে কি কারো ঐশ্বর্য সহ্য করতে পারে? আপনার মেয়ে ভালো ঘরে পড়েছে এতেই ওদের ঈর্ষা হয়েছে। ওদের রাগ কেন চৌধুরীদের বাড়িতে অত সুন্দরী বউ হয়েছে। আসল কথাটা হলো তাই–
ভট্টাচার্য মশাইও নিখিলেশের কথায় সায় দিলেন। বললেন–তুমি বিচক্ষণ ছেলে নিখিলেশ, তুমি ঠিক বলেছ, সব ওদের ঈর্ষা, আমি আর ও নিয়ে মাথা ঘামাবো না। এই আমি চুপ করে রইলুম–
বলে তিনি চুপ করে রইলেন।
আর গ্রামের ধুলোর রাস্তার ওপর দিয়ে রজব আলি গাড়িটা চালিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো।
.
সদানন্দর পেছন থেকে হঠাৎ কে যেন বলে উঠলো–আরে সদা, তুই এখানে? আর আমি তোকে গরু-খোঁজা করে বেড়াচ্ছি–
সদানন্দ পেছন ফিরে দেখলে–প্রকাশ মামা।
প্রকাশ মামা বলতে লাগলো–কখন ছাড়া পেলি তুই?
সদানন্দ বললে–এই একটু আগে–
–একটু আগে অথচ আমি সারা থানাটা হন্যে হয়ে বেড়াচ্ছি তোর জন্যে। বড় দারোগাটা ভারি বজ্জাত, জানলি! মোটে কথা বলতে চায় না। শেষকালে হাজার টাকা যখন হাতে তুলে দিলুম তখন হুকুম দিয়ে দিলে তোকে ছাড়বার। আমাকে বড় দারোগা বললে–-ছেড়ে দিয়েছে। তা ছেড়ে দিলে তো আমি দেখতেই পেতুম–। আমি তখন থেকে একবার ঘর একবার বার করছি। আর এদিকে তুই এখানে দাঁড়িয়ে ভ্যারেণ্ডা ভাজছিস!
সদানন্দ বললে–তুমি ঘুষ দিলে?
প্রকাশ মামা বললে–ঘুষ, দেব না? ঘুষ না দিলে তুই এখন এখানে দাঁড়িয়ে গায়ে হাওয়া লাগাতে পারতিস? এতক্ষণ হাজাতখানার ঘরে তোকে পচে মরতে হতো না? তা আয়, আমার সঙ্গে আয়, যা ঠাণ্ডা পড়েছে। শরীরটাকে একটু গরম না করতে পারলে আর চলছে না। আয়–
সদানন্দ তবু জিজ্ঞেস করলে–কোথায়?
প্রকাশ মামা এবার সদানন্দর একটা হাত ধরে টান দিলে। বললে–তুই আয় না, এত রাত্তিরে তো আর নবাবগঞ্জের ট্রেন নেই, একটা রাত কলকাতাতেই তো কাটাতে হবে। আয়, তোকে এক জায়গায় নিয়ে যাই–
বলে প্রকাশ মামা সদানন্দকে টানতে টানতে যে কোনদিকে নিয়ে চললো তা সে বুঝতে পারলে না। সত্যিই প্রকাশ রায় যেন নবাবগঞ্জের চৌধুরী বাড়িতে শনি হয়েই ঢুকেছিল। নইলে কোথাকার কোন্ নবাবগঞ্জের চৌধুরী বাড়ির বংশধরকে সে সেদিন কালীঘাটের মানদা মাসির বস্তি বাড়িতেই বা নিয়ে গেল কেন?
তা মানদা মাসির প্রসঙ্গ পরে বলবো। তার আগে নবাবগঞ্জের কথা আগে কিছু বলতে হবে। কারণ এ-গল্পের শেষ যেখানেই হোক, নবাবগঞ্জেই এ-গল্পের শুরু।
