খেতে বসে মেয়ের গল্প শুনছিলেন ভট্টাচার্যি মশাই। বললেন–এটা খেতে তো খুব ভালো হয়েছে রে। এটা কে রেঁধেছে? এই মাছের মুড়ো দিয়ে ছোলার ডাল?
–কে আবার রাঁধবে? আমিই রেঁধেছি—
নিখিলেশও পাশে বসে খাচ্ছিল। সেও বললে–হ্যাঁ, সব রান্নাগুলোই ভালো হয়েছে–
নয়নতারা উৎসাহ পেয়ে গেল। বললে–তা হলে মুড়ি-ঘণ্টটা আর একটু নিয়ে আসি, যাই
ভট্টাচার্যি মশাই বাধা দিলেন। বললেন–ওরে না না, এত সব খেতে হবে, একটা তো মাত্র পেট, ধরবে কী করে অত? তা আমি ভাবছি তুই এত শিখলি কবে? তোর মা’ও মুড়িঘণ্ট খুব ভালো রাঁধতো। তোর মা’র কাছেই এসব রাঁধতে শিখেছিলি, না-রে? বিপিনও এখানে খেয়ে গিয়ে রান্নার খুব প্রশংসা করছিল–
নয়নতারা বললে–তা মা ছাড়া আর কার কাছে রান্না শিখবো, এখানে তো সবে এসেছি–
ভট্টাচার্যি মশাই বললেন–তা এখেনে এসে তোকে রান্না-বান্না করতে হয় নাকি?
–কী যে বলো তুমি বাবা তার ঠিক নেই। এখানে রান্নার লোকের কী অভাব?
বিষ্টুর মা আছে, গৌরীপিসী আছে, কিন্তু আমার শাশুড়ীর ইচ্ছে যে আমি রাঁধি। আমার রান্না আমার শ্বশুর-শাশুড়ীর খুব খেতে ভালো লাগে–
–আর সদানন্দ? সে কী বলে? তোর রান্না পছন্দ হয় তার?
নয়নতারা হাসলো। বললে–আসলে তাঁর জন্যেই তো আমাকে রান্নাঘরে যেতে হয়। তাঁর আবার আমার রান্না না হলে যে মুখে রোচে না–
বাবা খুব খুশী হলেন মেয়ের কথাটা শুনে। নয়নতারা বললে–আর একটু দই দিই তোমাকে বাবা–
ভট্টাচার্য মশাই ততক্ষণে উঠে পড়েছেন। বললেন–এর বেশি খেলে আমার অসুখ করবে মা, আমার কি আর খাবার বয়েস আছে? এই নিখিলেশকে বরং দে, এদের কম বয়েস, এরা খেতে পারবে।
নিখিলেশও উঠে পড়লো। বললে–আমিও আর খেতে পারবো না–
খাওয়া-দাওয়ার পর ভট্টাচার্যি মশাই বললেন–তুই আমার সঙ্গে যাবি মা কেষ্টনগরে? তুই বেয়ানকে একবার জিজ্ঞেস করে আয় না। বলবি বাবা নিয়ে যাবার কথা বলছেন–
প্রীতি নিজের ঘরে শুয়েছিল তখনও। বউমাকে দেখে বললে–তোমার বাবার খাওয়া হলো? কোনও কষ্ট হলো না তো? আমি তো দেখতেই পেলুম না কী কী রান্না হলো, কী রকম পরিবেশন করলে তুমি–
–না মা, খাওয়ার কোনও অসুবিধে হয় নি। বাবা বলছিলেন আমাকে কেষ্টনগরে নিয়ে যাবেন। আমি যাবো?
শাশুড়ী বললে–তা যাও না বউমা, দুদিনের জন্যে ঘুরে এসো না, তুমি তো বলছিলেই কেষ্টনগরে যাবে। বাবা যখন এসে গেছে তখন যাও না। এ বাড়িতে এ অবস্থায় থাকলে তোমার কষ্ট হবে, তার চেয়ে বরং তুমি কিছুদিনের জন্যে ঘুরে এসো–
নয়নতারা বললে–কিন্তু মা, আপনার শরীরের এই অবস্থা…।
শাশুড়ী বললে–তা হোক বউমা, আমার যদি এখন বরাবরই শরীর খারাপ হয় তা বলে তুমি একবার বাপের বাড়ি যাবে না? আমার জন্যে তুমি কেন মিছিমিছি কষ্ট করতে যাবে বউমা? তুমি এখানে কোন্ সুখে পড়ে থাকবে? তার চেয়ে তোমার বাবা এসেছেন, এমন সুযোগ আর হবে না, তুমি বরং চলেই যাও
নয়নতারা একটু ভেবে বললে–আমি যাবো? এখন বাবা বাড়িতে নেই, তিনি ফিরে এসে যদি কিছু বলেন?
শাশুড়ী বললে–সে তোমায় ভাবতে হবে না বউমা, তিনি কিছু বলবেন না, যদি কিছু বলেন তো আমি তাঁকে সব বুঝিয়ে বলবো। আর কার জন্যে তুমি এখানে থাকবে বউমা? এখানে কে আছে তোমার? আমার ছেলে কি তোমার মুখ-দর্শন করে? যার স্বামী অমন সে কোন্ সুখে স্বামীর ঘর কররে?
এর জবাব কি দেবে নয়নতারা! বললে–তা হলে আমি বাবাকে সেই কথা বলি গে?
–হ্যাঁ, বউমা, আমি বলছি তুমি যাও। জানো বউমা, তুমি এখানে মুখ ভার করে থাকলে আমার আরো কষ্ট হয়। আসলে তোমার কথা ভেবে ভেবেই আমার এই অসুখ, নইলে অসুখের তো আর অন্য কোনও কারণ নেই–
–আচ্ছা মা, আমি বাবাকে তাহলে তাই বলি গিয়ে–
বলে নয়নতারা আবার বাবার কাছে গেল। বললে–না বাবা, শাশুড়ী মত দিলেন না। বললেন–কর্তা এখন বাড়ি নেই, উনিও নেই, এ সময়ে আমার চলে যাওয়া ঠিক হবে না। আর আমিও ভেবে দেখলুম এ সময়ে গেলে এদের সংসারে খুব অসুবিধে হবে। সিন্দুকের চাবি-টাবি সব তো আমার কাছে, শাশুড়ীর শরীরও ভালো নয়। আমার তো তোমার সঙ্গে খুব যেতে ইচ্ছে করছিল, তোমার সঙ্গে গেলে কিছু দিন তবু তোমার দেখাশোনা করতে পারতুম, কিন্তু এই অবস্থায় কী করি বলো তো?
ভট্টাচার্যি মশাই বললেন– না, বেয়ান তো ঠিক কথাই বলেছে। আমার কথা তোকে ভাবতে হবে না মা। আমার কোনো অসুবিধে হয় না সেখানে। তুমি এখানে সুখে আছো ভাবলেই আমার সুখ। তোমার এত সুখ এত ঐশ্বর্য, এসব তোমার মা কিছু দেখে যেতে পারলেন না, সেইটেই আমার দুঃখ রয়ে গেল। তাহলে আমি আসি মা, তোমার শাশুড়ী শ্বশুরকে বলে দিও, আমি আর থাকতে পারলুম না, আমার কালকে কলেজ আছে–আমি তাহলে আসি-সদানন্দ এল কি না খবরটা যেন কোনও ভাবে পাই–
নয়নতারা বাবার পায়ে হাত দিয়ে মাথায় ঠেকালে। বাবা মেয়ের মাথায় হাত ছুঁইয়ে আশীর্বাদ করলেন, বেঁচে থাকো মা, স্বামীর সংসারে লক্ষ্মী হয়ে বিরাজ করো, এই প্রার্থনা করি–
বলে বিদায় নিয়ে বাইরে এলেন। নিখিলেশও সঙ্গে সঙ্গে আসছিল। দীনু আগের থেকেই সব বন্দোবস্ত করে রেখেছিল। রজব আলি স্টেশনে পৌঁছে দেবে।
নয়নতারা বার বাড়ির সীমানায় এসে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখতে লাগলো। গাড়িতে উঠলেন বাবা। নিখিলেশও উঠলো। তারপর গাড়িটা ছেড়ে দিলে। সদর দিয়ে বেরিয়ে গাড়িটা একেবারে রাস্তায় গিয়ে পড়লো। তারপর আর দেখা গেল না। নয়নতারার চোখ দুটো ছল-ছল করে উঠলো। তারপর জানালাটার পাল্লা দুটো বন্ধ করে দিলে।
