শাশুড়ী বউমার মুখের চেহারা দেখে ভরসা পেলে। বাবার আসার খবর পেয়ে বউমা যেন একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেছে। মুখে হাসি, অথচ উদ্বেগও কম নেই তার।
বললে–চান করবার ব্যবস্থা করতে বলে দিও বউমা।
নয়নতারা বললে–বাবার সঙ্গে তার একজন ছাত্রও এসেছে। বুড়ো মানুষ তো, তাই একলা আসতে ভরসা পান নি।
–ভালোই তো। গৌরীকে আমার কাছে একবার ডেকে দিয়ে তুমি বাবার কাছে গিয়ে বোসো গে। আমি গৌরীকে বলে দিচ্ছি কী কী রাঁধতে হবে।
বাড়িতে কুটুম এসেছে। সুতরাং এ বাড়ির গিন্নীর নিজেরই সব করার কথা। গৌরী আসতেই শাশুড়ী বললে–হ্যাঁ রে, বেয়াই মশাইরা খাবেন, যেন নিন্দে না হয় দেখিস, তোর দাদা বাড়িতে নেই, একা সব পারবি তো, না আমি যাবো?
গৌরীর তখন সময় ছিল না কথা বলবার। বললে–তুমি ও-সব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছো কেন বউদি, তুমি চুপ করে শুয়ে থাকো না, আমি আছি, বিষ্টুর মা আছে, বউমা রয়েছে, কাজের লোকের কী অভাব?
সত্যিই কোনও অসুবিধেই হলো না কারো। নয়নতারা অদ্ভুত মানিয়ে নিলে। একবার রান্নাঘরে যায়, গিয়েই জিজ্ঞেস করে–পিসী, আমি একটু হাত লাগাবো?
গৌরী বলে–না না বউমা, তুমি তোমার বাবার সঙ্গে গিয়ে কথা বলো গে। বেয়াই মশাইদের চান হয়ে গেলেই আমাকে খবর দেবে–
নয়নতারা বললে–চান করা তো হয়ে গেছে।
–তাহলে তুমি বাবার কাছে গিয়ে বোস, আমি এদিকে গুছিয়ে নিয়ে তোমাকে খবর দিচ্ছি–
নয়নতারা বললে–বাবার কাছে বসেই তো এতক্ষণ গল্প করছিলুম, মাঝখানে শুধু একবার দেখতে এলুম তুমি একা সব কি পারবে?
–খুব পারবো, তুমি এখান থেকে যাও তো। এই তো সামান্য দুজনের খাওয়া, এই গৌরী একদিন একশো জনকে এক হাতে রান্না করে খাইয়েছে
নয়নতারা আর দাঁড়ালো না সেখানে। এক দৌড়ে আবার সোজা চলে গেল বাবার কাছে।
কালীকান্ত ভট্টাচার্য আর নিখিলেশ তখন স্নান-টান সেরে বসে আছে আরাম করে। এতদিন পরে নয়নতারার সঙ্গে দেখা। অনেক সাধ করে তিনি এই নবাবগঞ্জের চৌধুরী বংশে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। এখানে আসবার সময় অনেক দুর্ভাবনা নিয়ে এসে হাজির হয়েছিলেন। মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে কী দেখবেন কী শুনবেন তারই ভাবনা ছিল। কিন্তু এসে পৌঁছনোর পর থেকে মেয়ে তাঁর খাতির-যত্ন করতেই ব্যস্ত, একটা কথা বলবার পর্যন্ত সময় পান নি। এবারই প্রথম নয়নতারার শ্বশুরবাড়ির ভেতরটা এত ভালো করে দেখলেন তিনি। বারবাড়ির চেহারাটা সেবারই দেখেছেন। কিন্তু এবার মেয়ে একেবারে বাবাকে ভেতরের বাড়িতে নিয়ে বসিয়েছিল। সেবার মেয়েকে এখানে পৌঁছিয়ে দিয়েই চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু এবার অন্যরকম। তিনি চারিদিকে চেয়ে চেয়ে দেখছিলেন। গ্রামের বাড়ি বটে, কিন্তু তারই মধ্যে কী চমৎকার ব্যবস্থা। উত্তর দিক দিয়ে বাড়ির সদরে ঢুকতে হয়, তারপরে বার বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপ বাঁয়ে রেখে সোজা ভেতরে ঢুকে যাও। বাঁয়ে দক্ষিণে ধান চাল-সরষে-ছোলার মরাই। আর বাঁয়ে সার সার ঘর। বৈঠকখানা থেকে শুরু করে অতিথি অভ্যাগতদের জন্যে থাকার ব্যবস্থা। তার শেষপ্রান্তে দোতলায় ওঠবার সিঁড়ি। দোতলায় যা কিছু একখানা দেড়খানা ঘর আছে সবই কর্তাবাবুর দখলে। সেটা তাঁরই এলাকা। এর পর উঁচু একটা পাঁচিল। তারই মাঝখানে দরজা। সেই দরজা দিয়ে ভেতর-বাড়ির উঠোনে গিয়ে পড়বে।
কালীকান্ত ভট্টাচার্য কুয়োতলায় স্নান করতে করতে সবই দেখছিলেন। পশ্চিম দিকে কত বড় বাগান। বাগানের দক্ষিণে ভেতর বাড়ির পুকুর। ইট-বাঁধানো ঘাটের ওপর সিমেন্টের বেঞ্চি। এই ঘাটে নয়নতারা চান করে নাকি?
নয়নতারা বললে–না বাবা, আমি কুয়োতলায় ঘেরা ঘরে চান করি, শাশুড়ী আমাকে পুকুরে নামতে দেন না, বলেন তুমি সাঁতার জানো না বউমা, তুমি পুকুরে নেমো না—
ভট্টাচার্য মশাই বললেন–তা শাশুড়ী তো তোর খুব ভালো বলতে হবে–
–হ্যাঁ, খুব ভালো বাবা। গয়নাগাঁটি টাকাকড়ি সিন্দুকের চাবি পর্যন্ত আমাকে দিয়ে দিয়েছে, এই দেখ না–
শুধু বাবা নয়, নিখিলেশও দেখলে। নয়নতারা চাবিটা হাতে নিয়ে দেখালে।
ভট্টাচার্যি মশাই বললেন–দেখলে তো নিখিলেশ, আমি তোমায় বলেছিলুম নয়নতারার স্বামীভাগ্য ভালো– হ্যাঁ রে, তা সদানন্দকে ছাড়িয়ে আনবার ব্যবস্থা তোর মামাশ্বশুর করতে পারবে তো?
নয়নতারা বললে–তুমি তাহলে আমার মামাশ্বশুরকে চেনো না বাবা, তিনি খুব পাকা লোক–
–তা পুলিস যদি না ছাড়ে?
নয়নতারা বললে–সেই জন্যেই তো এক হাজার টাকা নিয়ে গেলেন, আমিই তো নিজে সিন্দুক থেকে টাকা বার করে দিলুম–
ভট্টাচার্যি মশাই যেন খুশী হলেন। বললেন–তাহলে টাকা-কড়িও বুঝি তোর হাতে! তুই-ই-টাকাকড়ি রাখিস নাকি?
নয়নতারা বললে–বা রে, সিন্দুকের চাবি থাকবে আমার হাতে আর টাকা নাড়াচাড়া করবে অন্য লোক? তুমি যে কী বলো বাবা তার ঠিক নেই।
–তাহলে তুই-ই দেখছি বলতে গেলে এ বাড়ির আসল গিন্নী!
নয়নতারা হাসলো।
বললে–আমার শাশুড়ীর তো অসুখ কাল থেকে। আমি সংসার না দেখলে আর কে দেখবে? আমার শ্বশুর গেলেন রাণাঘাটে মামলার তদ্বির-তদারক করতে, দোতলায় কর্তাবাবু বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছেন, মামাশ্বশুর গেছেন কলকাতায় পুলিসের থানায় দরবার করতে, এদিকে শাশুড়ীর আবার অসুখ, অথচ খাবার বেলায় এক গাদা লোক–
