কিন্তু সে-কথা এখন থাক।
ওদিকে একটা বিরাট টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে তখন তাকে একটার পর একটা জেরা করে চলেছিল সাদা চামড়ার আই-বি অফিসার। কোথায় বাড়ি, তার বাবার নাম কী, পোড়ো বাড়ির মধ্যে সে কেন সেদিন গিয়েছিল। অনেক অনেক প্রশ্ন। কখনও ভয় দেখিয়ে কখনও মিষ্টি কথা বলে তার কাছে কথা আদায় করতে চেয়েছিল সাহেব। কিন্তু তার একটাই কেবল কথা যে তাকে জেলে পুরলেও তার আপত্তি নেই, ফাঁসি দিলেও না।
শেষকালে সাহেবের যখন সব সন্দেহের নিরসন হলো, আর রিপোর্টেও যখন কিছু পাওয়া গেল না, তখন হুকুম হলো–যাও, গেট আউট–গেট আউট অব দিস্ প্লেস্–
সদানন্দ প্রথমে বুঝতে পারে নি। বললে–কোথায় যাবো?
আর কয়েকজন বাঙালী ইনপেক্টর দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে। তারা বললে–বাইরে চলে যান, আপনি ফ্রি–
–ফ্রি?
থানার বাইরেও যে সে ফ্রি নয়, সেটাও যে সদানন্দের কাছে একটা জেলখানা তা বাইরের লোক যারা, তারা জানবে কী করে? সদানন্দর চোখ দিয়ে তখন যেন কান্না বেরিয়ে আসতে চাইল।
–হাঁ করে দেখছেন কী? চলে যান—
সদানন্দ বললে–ওদের সঙ্গে একবার দেখা করে আসতে পারি? ওই ওদের মধ্যে প্রিয়তোষ সরকারের সঙ্গে?
একজন বাঙালী অফিসার ধমক দিয়ে উঠলো–যা বলছি শুনছেন না কেন? আবার ইয়ার্কি হচ্ছে?
সদানন্দ আর দাঁড়াল না। ঘর থেকে বেরিয়ে বিরাট কমপাউণ্ড, কমপাউণ্ডের মধ্যে অনেক লাল পাগড়ি, অনেক সাদা পোশাক-পরা পুলিস, গাড়ি-ভ্যানের ভিড়। সবাই জানলে সদানন্দ চৌধুরী নামে যে-ছেলেটিকে কাল ধরে আনা হয়েছে, তাকে হাজত-ঘর থেকে ছেড়ে দেওয়া হলো। কিন্তু একটা কথা কেউই জানতে পারলে না যে সে সত্যিই ছাড়া পেলে না। শুধু একটা ছোট হাজত-ঘর থেকে সে আর একটা বড় হাজত-ঘরে গিয়ে ঢুকলো। এ-হাজত-ঘরে ছাদ নেই, আকাশ, আর দেওয়াল নেই, শুধু আছে বন্দী মানুষদের ভিড়। এইটুকুই যা তফাৎ। এখানে সবাই তারই মত মানুষ। তারা ভাবছে তারা স্বাধীন, কিন্তু না, আসলে বন্দী তারাও।
ছাড়া পেয়ে সদানন্দ রাস্তায় এসে দাঁড়ালো। চারদিকে অসংখ্য ব্যস্ততা যেন মানুষের রূপ ধরে রাস্তায় ছুটে চলেছে। এ সেই নবাবগঞ্জের মত নয়। সেখানে সবাই ব্যস্ত হতে চায়, কিন্তু পারে না। কিন্তু সেখানে সমস্ত দিনখানা পড়ে আছে তোমার জন্যে। কত কাজ করার করো না। আর কাজ যদি না থাকে তো বারোয়ারি-তলায় কেদারের দোকানের মাচায় বসে পরচর্চা করো। সেখানে ঢালাও ক্ষেত-খামার। ইচ্ছে হলো তো নদীর ধারের নিরিবিলির মধ্যে নিজের নিঃসঙ্গতা দূর করে। কিন্তু এখানে উলটো–সকলের মুখের দিকে চেয়ে সদানন্দর মনে হলো এখানে যেন কেউ কারো নয়। সবাই নিঃসঙ্গ। তবু সবাইকে জড়িয়ে নিয়েই একসঙ্গে মরতে চাইছে।
–শুনুন—
সদানন্দ পাশ ফিরে দেখলে। একজন লোক তার দিকে চেয়ে হাত পেতে আছে।
–একটা পয়সা দেবেন?
সদানন্দ বুঝলো, লোকটা ভিখিরি। অথচ গায়ে জামা, পরনে ধুতি, পায়ে জুতোও রয়েছে। বাইরে থেকে ভিখিরি বলে বোঝাই যায় না। সদানন্দ পকেটে হাত দিলে। পয়সা তার কাছে আছে কিনা তাও জানা ছিল না। পুলিসে ধরবার পর তার জামা কাপড় সব কিছু তল্লাসী করেছিল তারা। হঠাৎ খেয়াল হলো পকেটে তো তার কিছু নেই। অথচ নবাবগঞ্জে ফিরে যেতে গেলে তো ট্রেন-ভাড়া লাগবে। তখন তো টাকার দরকার। কী করে ফিরবে সে তাহলে।
সদানন্দ বললে–আমার কাছে একটা পয়সাও নেই, আমি কিছুই দিতে পারবো না–
কথাটা লোকটা বিশ্বাস করলে কিনা কে জানে। হয়তো কল্পনাও করতে পারে নি যে, সদানন্দ সদ্য সদ্য পুলিস-হাজত থেকে বেরিয়েছে। আর কল্পনা করতে পারবেই বা কী করে? তার জামা কাপড়ে চেহারায় তো লেখা নেই সে আসামী!
লোকটা চলে গেল যেদিকে যাচ্ছিল। তারপরে হয়ত আর একটা লোকের কাছে গিয়ে আবার নতুন করে হাত পাতবে সে। লোকটার কাছে সবাই বড়লোক। সবাই তার চেয়ে অর্থবান! সুতরাং চাইতে তার কিছু লজ্জা নেই। কিন্তু সদানন্দ এই শহরে কার কাছে হাত পাতবে? তার বাড়ি ফেরার ট্রেন ভাড়ার টাকা সে কার কাছে ভিক্ষে করবে?
সমস্ত কলকাতা শহরটা ততক্ষণে আরও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কারো অভাব-দুঃখ দারিদ্র্যের দিকে দেখবার সময় আর তখন নেই কলকাতার। সদানন্দ সেই নিষ্ঠুর নির্মম কলকাতার দিকে চেয়ে সেখানেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। বুঝতে পারলে না এখানে সে কোন্ কাজে লাগবে! এ পৃথিবীতে তার কীসের প্রয়োজন!
.
নয়নতারার কিন্তু বাহাদুরি আছে বলতে হবে। শাশুড়ীও অবাক হয়ে গেছে বউমার কাজ কর্ম দেখে। বাবা এসেছে, সুতরাং নয়নতারাও যেন অন্য মানুষ হয়ে উঠলো একেবারে। একবার রান্নাঘরে যাচ্ছে। আর একবার যাচ্ছে বাবার কাছে। শাশুড়ী একবার ডাকলে–বউমা–
শাশুড়ী সেই সকাল থেকেই আর ঘর ছেড়ে বেরোয় নি। সেই আগের দিন রাত্রে যে শুয়েছে, তার পরে আর ওঠে নি। মাঝখানে শুধু উঠে বসেছিল একবার। বউমাকে সিন্দুকের চাবি খুলে প্রকাশকে টাকাটা বার করে দিতে বলেছিল।
শাশুড়ী বললে–এমন সময় তোমার বাবা এলেন, আমি উঠেও বসতে পারছি না। তুমি একলা দেখাশোনা করতে পারবে তো? বাড়িতে পুরুষমানুষ কেউ নেই যে খাতির-যত্ন করবে। তোমার ওপরেই ভার দিলুম বউমা, দেখো যেন তোমার শ্বশুরবাড়ির বদনাম না হয়–
নয়নতারা বলেছিল–সে আপনাকে ভাবতে হবে না মা, আমি তো আছি, আমি সব দেখবো–
