শাস্তি?
শাস্তির কথা শুনে সদানন্দর হাসি পেল। বললে–শাস্তি তো আমি এমনিতেই পাচ্ছি, আবার নতুন করে আমাকে গভর্মেন্ট কী শাস্তি দেবে?
যারা কথা বলছিল, তারা সবাই সদানন্দরই বয়সী। ট্রেনে যতক্ষণ ছিল ততক্ষণ বেশি কথা হয় নি। পুলিসের দল তাদের ঘিরে রেখে দিয়েছিল। সকলের কোমরেই দড়ি বাঁধা। প্লাটফরমে, ট্রেনের কামরায় বাইরের লোকেরা তাদের দিকে হাঁ করে চেয়ে দেখছে। সকলের চোখেই একটা কৌতূহলী দৃষ্টি। যেন মানুষের সমাজে এই ক’জন এক আলাদা জাত। এক ব্যতিক্রম।
একজন বললে–দেখছেন কী রকম করে লোকগুলো চেয়ে দেখছে আমাদের দিকে। আমরা যে ডাকাত!
সদানন্দ ওদের কথাগুলো শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল, এমন ধরনের মানুষ আগে কখনও দেখে নি সে। তাদের নবাবগঞ্জের নিতাই, কেদার, গোপাল, আরো কত ছেলে যারা বারোয়ারিতলায় বসে গল্প করে, রাত্রে যাত্রার রিহার্সাল দেয়, পূজোর সময় পাল খাটিয়ে থিয়েটার করে, এরা তাদের থেকে আলাদা।
–আপনি ওই ভাঙা বাড়িটার মধ্যে কেন গিয়েছিলেন?
সদানন্দ বললে–আমি ওখানে প্রায়ই যাই–ওখানে যেতে ভালো লাগে আমার–
কিন্তু আপনার বাড়ি তো নবাবগঞ্জে, আপনি কালীগঞ্জে যান কেন? বাড়িতে আপনার কে কে আছে?
–সবাই আছে। বাবা-মা-ঠাকুর্দাদা, আমার বউ–
–বউ? আপনি বিয়েও করেছেন নাকি?
সদানন্দ বললে–আমি বিয়ে করি নি, আমার বিয়ে হয়েছে–
অল্প সময়ের মধ্যে এমনি অনেক কথা হয়ে গেল তাদের মধ্যে। সদানন্দ জানতে পারলে যে তারা ডাকাতি করে টাকা যোগাড় করে সেই টাকা দিয়ে বন্দুক পিস্তল কেনে, দেশের শত্রুদের খুন করবার জন্যে।
সদানন্দ ওদের যতই দেখছিল, ততই অবাক হয়ে যাচ্ছিল। ওরা ক’জন বেশির ভাগই নিজেদের মধ্যে থাকতো। ফিস্ ফিস্ করে নিজেদের মধ্যে কী সব আলোচনা করতো। অথচ একসঙ্গে ধরা পড়েও সে যেন জেলখানার মধ্যেই একঘরে। সে যেন জাতিচ্যুত। তাকে যেন ঠিক বিশ্বাস করছে না ওরা। তবু একজনের সঙ্গে তার বেশ ভাব হয়ে গেল। তার নামটা আজও মনে আছে, প্রিয়তোষ। প্রিয়তোষ সরকার। ভারি চমৎকার দেখতে। যেন আগুনের একটা আস্ত টুকরো। প্রিয়তোষ বললে–আপনাকে বোধ হয় ছেড়ে দেবে এরা–
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–কেন?
–পুলিস ইনপেক্টর আমাদের জিজ্ঞেস করছিল আপনার সম্বন্ধে? আমি বলেছি ও আমাদের দলের নয়।
সদানন্দ বললে–কেন ওকথা বলতে গেলেন? আমি চাই আমারও আপনাদের সঙ্গে জেল হোক।
প্রিয়তোষ বললে–শুধু তো আর জেল নয়, হয়ত ফাঁসিও হতে পারে, কিছুই বলা যায় না।
সদানন্দ হাসলো–ভাবছেন ফাঁসির কথা শুনে আমি ভয় পাবো?
–ভয় পাবেন না?
–না। জেল হলেও আমার আপত্তি নেই, ফাঁসি হলেও আপত্তি নেই।
সদানন্দর কথা শুনে প্রিয়তোষ সরকার খানিকক্ষণ তার দিকে হাঁ করে চেয়ে রইল। তারপর চলে গেল নিজের দলের বন্ধুদের কাছে। তারপর সবাই মিলে দল বেঁধে আবার তার কাছে এল। এবার তার দিকে সবাই আরো স্পষ্ট করে চেয়ে দেখলে। তাদের ধারণা হয়েছিল বীরত্বের দিক থেকে তাদের বুঝি জুড়ি নেই। কিন্তু অচেনা আর একজনের সাহস দেখে যেন তার ওপর তাদের শ্রদ্ধা হতে লাগলো। একজন বললে–আগে জানলে আপনাকে আমাদের দলে নিয়ে নিতুম মশাই। আপনার মত হাজার হাজার ছেলে আমাদের দরকার। যারা প্রাণ দিয়ে দেশের শত্রুদের খুন করতে পারবে। কিন্তু বড় দেরিতে আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ভাই–
সদানন্দ বললে–আপনারা বুঝি মানুষ খুন করেন?
প্রিয়তোষ বললে–নইলে কি আর টাকার জন্যে ট্রেন লুঠ করেছি?
সদানন্দ বললে–কিন্তু সব দোষ কি আর তাদের একলার? আমাদের মধ্যেও তো এমন অনেক লোক আছে, যাদের খুন করলে দেশে শান্তি আসে–
–আছে বইকি! তারা হলো মীরজাফর। সেই মীরজাফরদেরও আমরা খুন করি।
সদানন্দ বললে–কিন্তু যদি বিদেশীরা কোনোদিন চলে যায়, মীরজাফররাও চলে যায়, তখন কাদের খুন করবেন?
তারা এ-কথার মানে বুঝতে পারলে না। বললে–আপনি কাদের কথা বলছেন?
সদানন্দ বললে–তারা যে প্রত্যেক বাড়িতে বাড়িতেই রয়েছে। কেউ ঠাকুর্দা হয়ে বাবা হয়ে মা হয়ে মামা হয়ে যে অকথ্য অত্যাচার করছে, তাদের খুন করবার ব্যবস্থা করতে পারবেন আপনারা?
–তার মানে!
সদানন্দ বললে–একদিন-না-একদিন বিদেশীরা তো চলে যাবে, কিন্তু এরা তো আমাদের শহরে-শহরে গ্রামে-গ্রামে বাড়িতে বাড়িতে থাকবে, তখন তাদের অত্যাচার বন্ধ করতে পারবেন আপনারা? সেই সব ঠাকুর্দাদের, বাবাদের, মাদের, মামাদের অত্যাচার? তারা কী রকম অত্যাচার করে তার কি খবর রাখেন আপনারা? তারা কপিল পায়রাপোড়া, মানিক ঘোষ, ফটিক প্রামাণিক আর কালীগঞ্জের বউদের একটার পর একটা খুন করে চলেছে। তাদের শাস্তি কবে হবে? আপনারা তাদের শাস্তি দিতে পারবেন?
হঠাৎ একজন ওয়ার্ডার এসে হাজির হলো। বললে–সদানন্দ চৌধুরী কার নাম?
সদানন্দ বললে–আমার, কেন?
–পুলিস-সুপার আই-বি আপনাকে নিচেয় ডাকছে, চলিয়ে—
সদানন্দ আর দাঁড়ালো না। যেমন অবস্থায় ছিল সেই অবস্থাতেই ওয়ার্ডারটার পেছনে পেছনে চলতে লাগলো।
সদানন্দ চলে যাবার পর প্রিয়তোষ বন্ধুদের দিকে চাইলে। বললে–আমি তোদের বলেছিলুম ছেলেটা পাগল। তখন তোরা কেউ বিশ্বাস করলি না। তখন তোরা বললি, স্পাই–
অন্য সবাইও ঠিক করলে পাগলই বটে! আসলে সারাজীবন সদানন্দকে সবাই পাগল বলেই ধরে নিয়েছিল। এও তার জীবনের এক ট্র্যাজেডি। অথচ এ-পৃথিবীতে কে যে পাগল আর কে-ই বা সেয়ানা সেইটেই বিচার করবার জন্যে একটা মানুষও কি খুঁজে পেয়েছে সে? মাঝখান থেকে বদনাম হলো শুধু তার! সে-ই নাকি পাগল!
