–কলকাতায় যাচ্ছেন? এখন?
প্রকাশ মামা বললে–এই দুপুরের ট্রেনে না গেলে আবার ঠিক সময়ে কলকাতায় পৌঁছতে পারবো না, আজ রাত্তিরের আগেই তাকে বার করে নিয়ে আসতে হবে। আসলে সে তো ডাকাতি করে নি। তার কীসের দায় বলুন না যে ডাকাতি করতে যাবে। আমার জামাইবাবুর এত টাকা যে তাই-ই খেয়ে ফুরিয়ে উঠোতে পারবে না সে–
–তাহলে কি জামাই বাবাজী স্বদেশী দলের মধ্যে ছিল-টিল নাকি?
–আরে রামঃ, আমার ভাগ্নে করবে স্বদেশী, তাহলেই হয়েছে। আমি বলেছিলাম আপনাকে আমার ভাগ্নে একেবারে গো-বেচারা ভালোমানুষ! সংসারে ভালোমানুষেরই যত হেনস্তা আজকাল, এ তো আপনি চারদিকে দেখতে পাচ্ছেন
কালীকান্ত ভট্টাচার্য কী যেন ভাবলেন একটু। তারপর বললেন–তাহলে আপনিও চলে যাচ্ছেন, বেয়াই মশাইও বাড়িতে নেই, কর্তাবাবুরও অসুখ, কার সঙ্গে কথা বলবো আমরা?
–কেন? বউমা রয়েছেন। আপনার মেয়ে? এ তো আপনার নিজের মেয়ের শ্বশুরবাড়ি। এবাড়ি কি আপনার পরের বাড়ি? নাই বা রইলেন বেয়াই মশাই, না-ই বা রইলুম আমি, আপনার মেয়ের কাছে এসেছেন, মেয়ের ঘরে গিয়ে বসবেন চলুন। মেয়ের সঙ্গে দেখা করুন। এখানে স্নান-খাওয়া করুন, বিশ্রাম করুন, আমি বউমাকে গিয়ে খবর দিচ্ছি–
বলে প্রকাশ মামা বাড়ির ভেতরে গিয়ে খবরটা দিলে।
–দিদি, বেয়াই মশাই এসেছেন কেষ্টনগর থেকে। নয়নতারাও পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার কানেও গেল কথাটা। কথাটা কানে যেতেই সমস্ত শরীরে যেন একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। বললে–আমার বাবা?
বাবা! বাবা এসেছে!
শাশুড়ী বললে–যাও বউমা, তোমার বাবাকে তোমার ঘরে নিয়ে গিয়ে বসাও। আর গৌরীকে গিয়ে বলে এসো ওঁদের জন্যে খাবার ব্যবস্থা করতে।
প্রকাশ মামা বললে–দুজনের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। সঙ্গে তার এক ছাত্রও এসেছে। বুড়ো মানুষ একলা আসেনই বা কী করে! চানের জল তুলে দিতে বলছি দীনুকে, যেন কোনও ত্রুটি না হয়, আমি রইলুম না, জামাইবাবুও নেই, তুমি তোমার বাবাকে ভালো করে দেখো বউমা–যেন এ বাড়ির বদনাম না হয়, আমি চল্লুম–
আনন্দে নয়নতারার দু’চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। কেউ দেখে ফেলবে বলে তাড়াতাড়ি আঁচল দিয়ে জলটা মুছে নিলে। কিন্তু তার আগেই শাশুড়ী ঠিক দেখে ফেলেছে। বললে–তুমি কাঁদছো নাকি বউমা, কাঁদছো কেন? কী হলো?
–না কাঁদি নি তো মা–বলে তাড়াতাড়ি শাশুড়ীর ঘর ছেড়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। বাবা এসেছে। তার বাবা! বাবা বোধ হয় তাকে ছেড়ে আর থাকতে পারে নি, তাই ছুটে এসেছে। আনন্দের চোটে নয়নতারা যে কী করবে তা বুঝতে পারলে না। ঘরে গিয়ে আয়নায় নিজের মুখটা দেখে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে পরিষ্কার করে নিলে।
বাইরে থেকে বাবার গলা শোনা গেল–নয়ন—
২.৮ এই কলকাতা
কলকাতা শহরের জনতা-বিধ্বস্ত অঞ্চলের একটা কেন্দ্রে তখন আর একটা মানুষের ভাবনা আর একদিকে কক্ষ পরিবর্তন করেছে। কোথায় সেই নবাবগঞ্জ, আর কোথায় এই কলকাতা! কলকাতাতে আগেও এসেছে সদানন্দ। কিন্তু আগে এসেছে বাবার সঙ্গে গড়ের মাঠ দেখতে। চিড়িয়াখানা দেখতে। ট্রাম, বাস, গাড়ি, মানুষ, ভিড় দেখতে। কালীঘাটে পুজো দিতে, মানুষের মহোৎসব প্রাণভরে উপভোগ করতে। তখন এমন জিনিসগুলো দেখেছে যাতে তার চোখ ভরে গেছে, মনও ভরেছে।
কিন্তু এই থানার হাজত-ঘরে বসে আর এক কলকাতা দেখলে সদানন্দ। কিন্তু কতটুকুই বা দেখলে সে! কতটুকুই বা দেখতে পেলে! সেই কালীগঞ্জের পোড়ো বাড়িটা থেকে তাকে হাতকড়া দিয়ে নিয়ে এসেছিল পুলিস। তারপরে রেলবাজার থেকে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়েছিল তাদের। সঙ্গীন খাড়া করা পুলিসের পাহারায় তাদের দু’জনকে শেয়ালদায় একটা গাড়ির ভেতরে পুরে দিয়ে সোজা এখানে নিয়ে এল। এই লালবাজারের পুলিস হেড কোয়ার্টারে। তারপর থেকে ওদের সঙ্গেই কাটছিল।
ওদেরই মধ্যে একজন নিজে থেকেই তার সঙ্গে আলাপ করতে এল। জিজ্ঞেস করলে– আপনি কখনও কলকাতায় আসেন নি বুঝি?
সদানন্দ বললে–কেন? ওকথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?
–আপনাকে দেখে তাই মনে হচ্ছে। গাড়ির ভেতরে আপনি জালের জানালা দিয়ে যে রকম করে চেয়ে দেখছিলেন, তাই জিজ্ঞেস করছি। গ্রামের মানুষ না হলে এমন করে কেউ বাইরের দিকে চেয়ে দেখে না–
সদানন্দ বললে–না, আগে আমি বাবা-মার সঙ্গে অনেকবার কলকাতায় বেড়াতে এসেছি–
–আপনি কী করেন?
–কিছুই করি না।
–কিছুই করেন না? কিছু করবার দরকার হয় না বুঝি? পৈতৃক জমিদারি আছে?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ।
ভদ্রলোক বললে–আপনারাই হচ্ছেন আসল কালপ্রিট। আপনাদের জন্যেই ইণ্ডিয়ার যত অশান্তি। আপনারা ইংরেজদের চেয়েও বেশী শয়তান।
সদানন্দ বললে–ঠিকই বলেছেন।
ভদ্রলোক অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে–ঠিকই বলেছি?
–হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। এতটুকু অন্যায় বলেন নি। আপনাদের সঙ্গে আমি একমত।
ভদ্রলোক আরো অবাক। ভদ্রলোক আর কিছু না বলে অন্য চারজনের কাছে গিয়ে ফিস্ ফিস্ করে কী যেন বলতে লাগলো। তার কথা শুনে সবাই সদানন্দর কাছে এল। আবার নতুন করে নাম-ধাম, পিতৃ-পরিচয়, জন্মস্থানের বিবরণ জানতে চাইলে। খানিকক্ষণের মধ্যেই বেশ ঘনিষ্ঠ আলাপ হয়ে গেল। তাকে তাদের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলবার জন্যে তারা দুঃখপ্রকাশও করলে। একজন বললে–আমাদের জন্যে আপনারও শাস্তি হয়ে যাবে–
