প্রকাশ মামা বললে–হিসেব? হিসেব কি তোমাকে আমি কখনও দিই নি যে হিসেব দেবার কথা বলছো তুমি আজ? তুমি আমাকে যত টাকা দিয়েছ তার সব হিসেব তো আমি তোমাকে পাই টু-পাই দিয়েছি। দিই নি? তুমিই বলো, দিই নি?
–আচ্ছা, পুরোপুরি হাজার টাকাই দিয়ে দাও, শেষকালে তোর জন্যে দেখছি তোর জামাইবাবুর কাছে আমাকে ধরা পড়ে যেতে হবে একদিন
নয়নতারা হাজার টাকার নোটের গোছাটা মামাশ্বশুরের হাতে দিতেই প্রকাশ মামা সেটা পকেটে পুরে ফেললে।
দিদি বললেও কি রে, টাকা গুনে নে, গুনে নিলি নে?
প্রকাশ মামা তখন টাকা পেয়ে যেতে পারলে বাঁচে। বললে–টাকা গুনে কী হবে? বউমা তো নিজে গুনেছে, বউমা কি আর আমাকে ঠকাবে বলতে চাও!
বলে বাইরে চলে গেল এক দৌড়ে। টাকা পকেটস্থ হয়ে গেছে যখন তখন আর কে তাকে দেখে। এখান থেকে সোজা রেলবাজারে যেতে হবে। সেখান থেকে প্রথম কাজ পোস্টাপিসে যাওয়া। পোস্টাপিসে গিয়ে ভাগলপুরে বউএর নামে টাকা মানি-অর্ডার করতে হবে। সেখানে ছেলে মেয়ে বউকে অনেকদিন কিছু পাঠাতে পারা যায় নি। তারা উপোস করে আছে এতদিন। এইবার এর থেকে অন্তত শ তিনেক সেখানে না পাঠালে ঠিক হবে না। তার পরে রাণাঘাটের সদরে রাধার বাড়িতেও অনেকদিন ঢুঁ মারে নি। সে তো টাকার জন্যে হন্যে হয়ে বেড়াচ্ছে। তারপরে অনেকদিন ফুর্তির-প্রাণ-গড়ের মাঠ করা হয় নি। একটু আধটু ফুর্তি না করলে মন-মেজাজই বা ঠিক থাকবে কেন? জীবনে একটু ফুর্তির ছিটে ফোঁটা না মিললো তো বেঁচে থেকে ফয়দাটা কী? কলকাতায় গিয়েই একটা আড্ডায় বসে মা কালীমার্কা বোতল গলায় ঢালাই হবে প্রথম কাজ। তারপর, তারপর কলকাতা শহর। হাতে টাকা থাকলে তুমি যত ইচ্ছে ফুর্তি করো না, কেউ তোমায় বারণ করছে না।
টাকাগুলো দু’পাশের ট্যাকে জম্পেশ করে খুঁজে নিয়ে প্রকাশ মামা আকাশের দিকে চাইলে। একটা শঙ্খচিল দেখতে চেষ্টা করলে। শঙ্খচিল দেখলে যাত্রা শুভ হয়। তাহলে এই রকম পুলিস কেস হাতে আসে। এই রকম দু-চারটে পুলিস-কেস মাঝে-মধ্যে এলে তবু কিছু টাকার মুখ দেখা যায়। কিন্তু দিন কাল যা পড়েছে টাকা দুনিয়া থেকে যেন উবে যাচ্ছে!
না, আকাশের ত্রিসীমানায় একটা শঙ্খচিলের টিকিও দেখা গেল না। যে কটা উড়ছে সব গোদা-চিল। কী আর করা যাবে! একটা জলভরা কলসী দেখলেও কাজ হতো। তাও নেই।
কিন্তু আর দেরি করা যায় না। চণ্ডীমণ্ডপের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে হঠাৎ নজর পড়লো বৈঠকখানার দিকে। বৈঠকখানার দরজাটা হাট করে খোলা। এখন দরজা খোলা কেন? বাবাজী তো কখনও দরজা খুলে রাখে না।
একটু উঁকি দিয়ে দেখতেই খটকা লাগলো। বাবাজী কোথায় গেল?
প্রকাশ মামার সন্দেহ আরো বাড়লো। বাবাজী নেই নাকি! তাড়াতাড়ি বৈঠকখানার ভেতরে গিয়ে ঢুকলো। কোথায় বাবাজী?
ওদিকে কলকাতায় যাবার ট্রেনের টাইম হয়ে যাচ্ছে। তবু জানতে ইচ্ছে হলো ব্যাপারটা কী! বাবাজীর ত্রিশূল রয়েছে, বাবাজীর খড়ম-জোড়াও রয়েছে। কিন্তু সেই ঝোলাটা নেই, বাবাজীর সেই ঝোলা। যার ভেতরে বাবাজীর গাঁজার কলকে-টলকে সব থাকতো।
কী রকম হলো! বংশী ঢালী সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। প্রকাশ মামা তাকেই ডাকলে–বংশী, বাবাজী কোথায় গেল রে?
বংশী বললে–আরে শালাবাবু, আমি তো বাবাজীকে সকাল থেকেই দেখি নি—
–তাহলে কি মাঠে গেছে? কিন্তু এই অসময়ে তো বাবাজী মাঠে যায় না।
শুধু বংশী ঢালী নয়। কেউ জানে না বাবাজী কোথায় গেল। ওপরে গিয়ে দীনুকে গিয়েও জিজ্ঞেস করলে। সে-ও কিছু জানে না। কৈলাস গোমস্তা মশাইও দেখে নি। এমন কি চণ্ডীমণ্ডপে বসে থাকে পরমেশ মৌলিক সেরেস্তাদার। সেও কিছু জানে না। সবাই-ই বললে–সকালবেলাও কেউ দেখে নি বাবাজীকে।
তারপর দিদিকে জিজ্ঞেস করতে প্রকাশ মামা ভেতরে যাচ্ছিল।–দিদি–দিদি—
কিন্তু তার আগেই একটা সাইকেল-রিকশায় চড়ে কারা যেন বারবাড়ির উঠোনে এসে হাজির হলো। ভালো করে চেয়ে দেখতেই অবাক হয়ে গেল প্রকাশ।
–আরে, বেয়াই মশাই যে! আসুন-আসুন—
কালীকান্ত ভট্টাচার্য আর নিখিলেশ দু’জনেই নামলো রিকশা থেকে। রিকশাওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে কালীকান্ত ভট্টাচার্য বললেন–হঠাৎ একটা দুঃসংবাদ পেয়ে চলে এলুম বেয়াই মশাই। এটি আমার ছাত্র, নিখিলেশ–
নিখিলেশ প্রকাশ মামাকে নমস্কার করলে। প্রকাশ মামা বললে–আপনি তো নিখিলেশবাবু, আমার ভাগ্নের বিয়ের সময় তো আপনাকে দেখেছি–
কালীকান্ত ভট্টাচার্য মশাই বললেন–বৃদ্ধ বয়সে এত দূরে আসবো, তাই দেখা-শোনা করবার জন্যে একে সঙ্গে করে নিয়ে এলুম। তা বেয়াই মশাই কোথায়?
প্রকাশ মামা বললে–সেই তো মুশকিল হয়েছে, তিনি গতকাল রাণাঘাটের সদরে গেছেন, মুনসি কোর্টে একটা মামলা আছে, তার তদবিরে গেছেন। জরুরী ব্যাপার। অথচ কর্তাবাবুর ভীষণ অসুখ, নড়তেও পারছেন না, কথা বলতেও পারছেন না কদিন থেকে। এদিকে আমার ভাগ্নেকে আবার পুলিসে ধরে নিয়ে গেছে
–ব্যাপারটা কী বলুন তো বেয়াই মশাই, আমি তো সেই খবর পেয়েই দৌড়ে এলাম।
প্রকাশ মামা জিজ্ঞেস করলে আপনি কী করে খবর পেলেন এর মধ্যে?
–ওই যে আমার বিপিন এসেছিল শীতের তত্ত্ব নিয়ে, ফেরবার সময় রেলবাজারের স্টেশনে দেখে ডাকাতদের মধ্যে জামাইবাবাজীও রয়েছে–
প্রকাশ মামা বললে–সেই ব্যাপারেই তো আমি এখন কলকাতায় যাচ্ছি–
