বলে প্রকাশ মামা কুয়োতলার দিকে চলে গেল। তারপর নয়নতারা আবার শাশুড়ীর ঘরে এল।
বললে—মা–
–কী বউমা?
–কেমন আছেন এখন?
সেকথার উত্তর না দিয়ে প্রীতি বললে–জানো বউমা, খোকার খোঁজ পাওয়া গেছে। এই এখখুনি প্রকাশ এসে বলে গেল। আসলে তাকে মিছিমিছি সন্দেহ করে ধরে নিয়ে গেছে। ডাকাতরা কালীগঞ্জের জমিদারের পোড়ো বাড়িতে লুকিয়ে ছিল তো, তা খোকাও সেখানে গিয়েছিল। পুলিস ভেবেছে ও-ও বুঝি তাদের দলের লোক, তাই ওকেও ধরে নিয়ে গেছে–
নয়নতারা বললে–আমি সব শুনেছি মা, কিন্তু উনিই বা কালীগঞ্জের সে পোড়ো বাড়িতে গিয়েছিলেন কেন? ডাকাতরা না হয় লুকিয়ে থাকবার জন্যে গিয়েছিল, কিন্তু উনি সেখানে কী করতে গিয়েছিলেন?
প্রীতি বললে–তুমি তো সব জানো না বউমা, সে অনেক কথা, সেই ব্যাপারের পর থেকেই তো খোকা ওই রকম হয়ে গেল। ও তো বিয়ে করতেই চায় নি ওই জন্যে–
–কিন্তু সেই কালীগঞ্জের বউ? সে কে?
প্রীতি বললে–আস্তে আস্তে তুমি সবই জানতে পারবে বউমা, পাগল আর কাকে বলে! জমিদারি রাখতে গেলে কত কী কাণ্ড করতে হয় তা তো তুমি জানো না বউমা। আমার বাবাও ভাগলপুরের জমিদার, আমি ছোটবেলা থেকে ও-সব দেখে এসেছি, আমার ও-সব শুনে কিছু মনে লাগে না। কারোরই মনে লাগে না। কিন্তু খোকা হয়েছে সৃষ্টিছাড়া ছেলে আমার–
প্রকাশ মামার ততক্ষণে খাওয়া-দাওয়া সারা হয়ে গিয়েছে। জামাকাপড় বদলে নিয়ে বললে–কই দিদি, কোথায়? টাকা বার করেছ?
প্রীতি বললে–বউমা তোমার চাবিটা দিয়ে ওই সিন্দুকের তালাটা খোল তো, খুলে শ’পাঁচেক টাকা ওর মধ্যে থেকে বের করে দাও–
নয়নতারা মামাশ্বশুরকে দেখে মাথায় ঘোমটা টেনে দিয়েছিল। বললে–আমি দেব?
–দাও না, দিতে দোষ কী? একদিন তো এ-সব একলা তোমাকে করতে হবে। তখন তো আমি থাকবো না।
প্রকাশ মামা বললো, দিদি ঠিক বলেছে, এখন থেকে সব প্র্যাকটিস করে নাও বউমা, একদিন এই সমস্তই তো তোমাকে ম্যানেজ করতে হবে–
নয়নতারা কিছু না বলে চাবি দিয়ে সিন্দুকটা খুললে। তারপর সিন্দুকের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিলে। হাতে যেন কত কী ঠেকলো। নয়নতারার মনে হলো যেন অনেক টাকা, অনেক সোনা, অনেক রূপো, অনেক হীরে, অনেক জহরৎ-এর স্পর্শে তার সমস্ত শরীর থর থর করে কেঁপে উঠলো। বিয়ের আগে যে রোমাঞ্চের স্বপ্ন সে দেখেছিল, তা সে পায় নি। কিন্তু তার বদলে আর এক জগতের আর এক ধরনের রোমাঞ্চের আস্বাদ পেয়ে তার বিস্ময়ের যেন শেষ রইল না। এত টাকা এদের, এত ঐশ্বর্য! কেষ্টনগরে তার মার হাতবাক্স খুলে সে দেখেছে, অনেক সময় কাজে-অকাজে তার ভেতর থেকে টাকা পয়সাও সে বার করে দিয়েছে। কিন্তু সে আর এ! এ যে অগাধ, এ যে অপরিসীম, এ যে অনন্ত! এত টাকা এবাড়ির কোথা থেকে এলো? সে নিজেই একদিন এই সমস্ত কিছুর মালিক হবে নাকি? এ টাকা কেমন করে উপার্জন করলে এরা? এও কি সেই কালীগঞ্জের জমিদারকে ঠকিয়ে পাওয়া, সেই কপিল পায়রাপোড়া, মানিক ঘোষ আর ফটিক প্রামাণিককে শোষণ করার সঞ্চয়? যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তার স্বামী আজ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে? এসে পর্যন্ত যাদের নাম সে কানাঘুষায় শুনতে আরম্ভ করেছে? এ সমস্তই কি তাদের নাকি?
–কই বউমা, পেলে না?
তাড়াতাড়িতে নয়নতারা একটা ছোট কৌটো বার করলে। আগাগোড়া রূপোর কাজ করা। ডালাটা খুলতেই দেখলে অনেক মোহর তার ভেতরে।
–ওটা না, ওটা না, বাঁদিকে হাত বাড়িয়ে দেখ একটা কাঠের বাক্স আছে, সেইটে বার করো। তার ভেতরে কাগজের নোট আছে–
এবার রূপোর বাক্সটা রেখে দিয়ে বাঁ দিকে হাত ঢোকালে নয়নতারা। বাঁ দিকে বাক্স একটা নয়, অনেকগুলো ছিল। তারই মধ্যে একটা বাক্স বেছে নিয়ে ডালাটা খুললে। তাতেও অনেক টাকা থাক-থাক্ সাজানো।
শাশুড়ী বললো ওই বাক্সটা, ওর থেকে টাকা গুনে বার করে দাও–
এক-এক করে নয়নতারা টাকাগুলো গুনতে লাগলো। দশটাকা, পাঁচটাকা একটাকার নোট সব। অত তাড়াতাড়ি গোনা কি সোজা! কত প্রজার কত রক্ত শুষে তবে এগুলো কাগজের নোটে রূপান্তরিত হয়েছে। এই টাকা দিয়ে নয়নতারা একদিন আরো জমি কিনবে, সে-জমিতে যারা ফসল ফলাবে তাদের খাটিয়ে নয়নতারা আরো টাকা করবে। সে টাকা সবই এনে সে জমা করবে এই সিন্দুকে। সেদিন নয়নতারার শ্বশুরও থাকবে না, শাশুড়ীও থাকবে না। তখন এই টাকা দিয়ে সে তার শাশুড়ীর মত হীরে-পান্না বসানো সীতাহার গড়াবে, ছেলের বিয়ে দিয়ে নতুন বউ আনবে। তখন নয়নতারা নিজেও শাশুড়ীর মত অসুখে পড়বে, আর নতুন বউ তখন আবার এই সিন্দুকের চাবি নিয়ে আঁচলে বাঁধবে। এমনি করে এক-একজনের বাড়িতে টাকার পাহাড় জমবে, আর কপিল পায়রাপোড়া, মানিক ঘোষ আর ফটিক প্রামাণিকেরা বারোয়ারিতলায় অশ্বথ গাছের ডালে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে আত্মহত্যা করবে।
–কই বউমা, কত হলো? পাঁচশো টাকা গুনতে তোমার এত দেরি হচ্ছে কেন?
প্রকাশ মামা চেঁচিয়ে উঠলো–মোটে পাঁচশো টাকা? পাঁচশো টাকাতে কী হবে শুনি? পাঁচশো টাকা তো শুধু পান খাওয়াতেই খরচ হয়ে যাবে, তার ওপর আমার যাতায়াত খাওয়া থাকার হোটেল খরচ আছে। এ কি তুমি রেলবাজারের পুলিস-দারোগা পেয়েছ যে পাঁচশো টাকায় হবে? কলকাতার পুলিস। তারা পাঁচশো টাকায় কথাই বলবে না—
শাশুড়ী বললে–আচ্ছা বউমা, তাহলে হাজার টাকাই দিয়ে দাও পুরোপুরি। কিন্তু তোকে পুরো টাকার হিসেব দিতে হবে তা বলে রাখছি–
