অন্ধকারে শুয়ে-শুয়েই এক সময়ে মনে হলো যেন ভোর হচ্ছে। দূর থেকে মুরগীর ডাক কানে এলো। সত্যিই বোধ হয় সকাল হয়ে এলো।
নয়নতারা আস্তে আস্তে উঠলো। উঠে ঘরের বাইরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। পাশের শাশুড়ীর ঘরের দরজা তখনও বন্ধ। কেউ কোথাও নেই। সকালবেলা ক’টার সময় থেকে বাড়ির কাজ শুরু হয় তাও সে জানে না, অথচ তার কাছেই ভাঁড়ারের চাবি।
নয়নতারা আবার তার নিজের ঘরের দিকে চলে আসছিল হঠাৎ পেছন থেকে ডাক এল–উঠে পড়েছ বউমা?
নয়নতারা পেছন ফিরে দেখল, গৌরী পিসী।
গৌরী পিসী বললে–দাও চাবিটা দাও, দিদি এখনো ওঠে নি, ঘুমোচ্ছে—
নয়নতারা জিজ্ঞেস করলে–মা কেমন আছে এখন?
গৌরী পিসী বললে–সারা রাতের পর এখন একটু ঘুমোচ্ছে-তুমি তৈরী হয়ে নাও, বিষ্টুর মা এখুনি এসে উনুনে আঁচ দেবে। এখন থেকে ভাঁড়ার বের না করলে আবার ওদিকে দেরি হয়ে যাবে–
বলে চাবি নিয়ে তার নিজের কাজে চলে গেল। নয়নতারা গা ধুয়ে কাপড় কেচে স্নান করে যখন রান্নাঘরে এসে দাঁড়ালো, তখন দেখলে বিষ্টুর মা আর গৌরী পিসী ততক্ষণে অনেক কাজ সেরে ফেলেছে।
নয়নতারা বললে–আমাকে কিছু কাজ দাও পিসী, একলা তুমি সব পারবে না, আমি তৈরি হয়ে এসেছি—
গৌরী পিসী বললে–তুমি তোমার ঘরে যাও বউমা, আমি তোমার ঘরে জলখাবার দিয়ে আসছি–
নয়নতারা বললে– কেন, আমার এখন ক্ষিধে পায় নি, তোমার যদি কিছু কাজ থাকে বলো–আমার তো কোনও কাজ নেই, চুপ করে ঘরে বসে থাকতে আমার ভালো লাগছে না—
গৌরী পিসী বললে–বসে থাকতে ভালো লাগছে না বলে তুমি এই ধোঁয়ার মধ্যে বসে থাকবে? তা যদি ভালো লাগে তো এই পিঁড়িটা নিয়ে বোস।
গৌরী পিসী আর বিষ্টুর মা দুজনে দু’হাতে কাজ করছে। নয়নতারা বসে বসে দেখতে লাগলো সব। জলখাবার গেল চণ্ডীমণ্ডপে। যাবে দোতলায় কৈলাস গোমস্তার কাছে। কর্তাবাবুর অসুখ তাই তার কাছে যাওয়ার কথা ওঠে না। তারপর দীনু আছে, বংশী ঢালীরা আছে। জলখাবারের পাটের পর ভাত ডাল তরকারি। বিষ্টুর মা রাঁধছে আর তরকারি কুটছে গৌরী পিসী। সারা বাড়ির লোক খাবে। অথচ রান্না করার লোক কম। প্রতিদিন এমনি করেই চলে এসেছে, এমনি করেই হয়ত আবহমান কাল ধরে চলবে। নয়নতারাও এদেরই একজন হয়ে গেছে এখন। তার জীবনও একদিন এই সংসারের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে যাবে।
হঠাৎ হইচই আওয়াজ করতে করতে প্রকাশ মামা এসে বাড়ির মধ্যে ঢুকলো। বললে–কই, দিদি কোথায়? দিদি—দিদি–
নয়নতারা মামাশ্বশুরের গলার শব্দ পেয়েই নিজের শোবার ঘরের মধ্যে আশ্রয় নিয়ে নিলে। কিন্তু তার আগেই প্রকাশ মামা একেবারে রান্নাঘরে এসে হাজির।
গৌরী পিসী বললে–বউদির শরীর খারাপ, শুয়ে আছে।
–শরীর খারাপ? এই সময়ে কিনা শরীর খারাপ করে বসলো দিদি? বলতে বলতে দিদির ঘরে গিয়ে হাজির। চেঁচামেচিতে প্রীতির ঘুম ভেঙে গিয়েছিল।
বললে–কী হলো? খোকার খবর পেলি কিছু?
প্রকাশ মামা বললে–খোকার খবর না নিয়ে কি এসেছি? কিন্তু তুমি কেন এই কাজের সময় শরীর খারাপ করে বসলে বলো দিকিনি? এই সময়েই কিনা শরীর খারাপ করতে হয়? আসলে খাওয়াটা তোমার কম হচ্ছে, আমি বুঝতে পারছি–
–আমার শরীরের কথা থাক, খোকার খবর কিছু পেলি কিনা তাই বল্।
প্রকাশ বললে–আমাকে শিগগীর শিগগীর খাবার দিতে বলো। আমি আবার এখনি কলকাতায় যাবো। এই কলকাতা থেকে আমি আসছি এখন–
–খোকা কি কলকাতায় নাকি?
প্রকাশ বললে–হ্যাঁ, শুনলুম কলকাতার জেলখানায় তাকে পুলিস আটকে রেখেছে। রেলবাজারের থানায় থাকলে এতক্ষণ তো তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসতুম। কিন্তু তাকে যে কলকাতার পুলিস ধরে নিয়ে গেছে। শুনে কাল সন্ধ্যেবেলাই আমি কলকাতায় চলে গেলুম। সেখানে গিয়ে আসল ব্যাপারটা সব শুনলাম।
বলে আদ্যোপান্ত যা-যা ঘটেছিল সব বলে গেল প্রকাশ মামা।
–খোকার সঙ্গে দেখা হলো তাহলে?
প্রকাশ মামা বললে–কী করে দেখা হবে? তুমি টাকা দিয়েছ?
–কেন? তুই যে চারশো তিরিশ টাকা না কত যেন নিয়ে গেলি আমার কাছ থেকে পুলিসকে দেবার জন্যে?
–সে টাকা তো কিছু গেল রেলবাজারের পুলিসকে দিতে। তারপর আছে আমার রেলের যাতায়াতের ভাড়া, খাই-খরচ। বাকী কটা টাকা রইলো। কিন্তু কলকাতার পুলিসকে কি ওই কটা টাকায় খুশী করা যায়? আরো শ’পাঁচেক লাগবে, তার কমে তারা কথাই বলবে না–তুমি টাকাটা যোগাড় করো, আমি ততক্ষণে খেয়ে নিই, তারপর ট্রেন ধরে আবার এখুনি কলকাতায় ছুটতে হবে–
প্রীতি বললে–তা খোকাকে পুলিস ছাড়বে তো?
প্রকাশ বললে–তুমি বলছো কী দিদি? টাকা ছড়ালে কলকাতায় বাঘের দুধ পাওয়া যায়, আর খোকাকে ছাড়িয়ে আনতে পারবো না? আর তা ছাড়া খোকা তো আর সত্যি সত্যি ডাকাতি করে নি। ডাকাত ভেবে তাকে ভুল করে ধরে নিয়ে গেছে। এখানেই ছেড়ে দিত, শুধু টাকার যা তোয়াক্কা! টাকা টা দিলেই সুড়সুড় করে তারা ছেড়ে দেবে। নাও, চাবি দিয়ে তোমার সিন্দুক খোল, কটা টাকা আছে বার করো
প্রীতি বললে–চাবি আমার কাছে নেই, বউমাকে দিয়েছি–
–কেন, চাবি বউমার কাছে কেন?
–তা এখন থেকে তো বউমাই সব দেখবে। বউমাই তো একদিন এই সংসারের গিন্নী হবে, এখন থেকে আমি তার হাতেই সব ছেড়ে দিয়েছি–
প্রকাশ মামা বললে–ঠিক আছে, ততক্ষণ বউমার কাছ থেকে চাবি চেয়ে নিয়ে তুমি টাকাটা বার করে রাখো, আমি ততক্ষণ চান-খাওয়া করে নি–
