–বউমা!
নয়নতারা শাশুড়ীকে তাঁর নিজের ঘরের ভেতরে নিয়ে যেতে যেতে বললে–বলুন মা–
–তোমার যদি রাত্তিরে একলা শুতে ভয় করে তো তুমি আজ আমার কাছে শোবে? তোমার শ্বশুর তো বাড়িতে নেই।
নয়নতারা বললে–না মা, আমার একলা শুতে ভয় করবে না–
–তাহলে তুমি যদি বলো, আমি তোমার ঘরে গিয়েও শুতে পারি—
নয়নতারা শাশুড়ীকে তাঁর ঘরের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বললে–না মা, তার দরকার হবে না, আপনি কিছু ভাববেন না, আমার একলা শোওয়া অভ্যেস হয়ে গেছে। শুধু প্রথম দিনটায় একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম–
শাশুড়ী তখন বিছানায় শুয়ে আর নয়নতারা তার সামনে দাঁড়িয়ে।
নয়নতারা বললে–আমি আলো নিবিয়ে দেব মা?
–না বউমা, তোমাকে কিছু করতে হবে না। গৌরী আছে, খেয়ে উঠে সে-ই সব করে দেবে।
নয়নতারা বললে–তাহলে আমি আসি মা?
–হ্যাঁ এসো। যদি তোমার ঘুম না আসে তো আমাকে ডেকো, বুঝলে? নয়নতারা তার নিজের ঘরের দিকেই চলে আসছিল। শাশুড়ী আবার ডাকলে বউমা,–
নয়নতারা আবার ফিরলো। বললে–আমাকে ডাকছেন মা?
শাশুড়ী বললে–-শোন বউমা, একটা কথা বলতে ভুলে গেছি তোমাকে। খোকাকে তো জেলে ধরে নিয়ে গেছে, কবে ফিরবে তাও জানি না। আর কোনও দিন ফিরবে কিনা তারও ঠিক নেই। প্রকাশ তো গেছে থানায়, টাকাও নিয়ে গেছে, এখনও তো ফিরলো না। তোমার শ্বশুরও বাড়িতে নেই, তুমি আমার এই চাবিটা তোমার কাছে রেখে দাও
–চাবি? আমি চাবি নিয়ে কী করবো মা?
–তুমি এ বাড়ির বউ, আমি মারা গেলে তখন তো তোমাকেই এ সংসারের ভার নিতে হবে বউমা! তুমি ছাড়া আর তো কেউ নেই যার হাতে সব ভার দিয়ে নিশ্চিন্তে যেতে পারি।
নয়নতারা বলে উঠলো–আপনি কীসব বলছেন মা? আপনার কী হয়েছে যে আপনি এই সব কথা এখন বলছেন? আমি চাবি নেব না
বলে একটু দূরে সরে এল। কিন্তু শাশুড়ী ছাড়লে না। নিজের আঁচল থেকে চাবির গোছটা খুলে জোর করে নয়নতারার হাতে পুরে দিলে। বললে–তুমি এটা নিজের কাছে রাখো বউমা, আমি বলছি তোমাকে, আমি তোমার গুরুজন, আমার কথা অমান্য করতে নেই, তুমি রেখে দাও–
নয়নতারা চাবিটা নিলে। নিয়ে বললে–কিন্তু কেন আপনি অত ভাবছেন, মা। আপনার তো কিছুই হয় নি, আপনি মিছিমিছি ভয় পাচ্ছেন–
শাশুড়ী বললে–যদি তেমন কিছু না-হয় তো ভালোই, তখন তোমার কাছ থেকে না হয় আবার আমি চাবি চেয়ে নেব। কিন্তু আমি যা বলছি তোমাকে তা মিথ্যে নয় বউমা। তুমি জানো না, আমার সব সময়ে বুক ধফ-ফড় করে, আমি মাঝে মাঝে টলে পড়ে যাই, কেউ জানে না। যদি তেমন কিছু বিপদ হয় তখন আমার এ-সংসার তুমি ছাড়া আর কে দেখবে বউমা। এ-সংসারের হাতা-বেড়ি-খুন্তিটা পর্যন্ত যে আমার মায়ার জিনিস। যখন যেখানে গেছি কিনে এনেছি। তুমি জানো না, এ আমার বড় সাধের সংসার বউমা, আমার বড় সাধ ছিল ছেলের বিয়ে দিয়ে আমি ঘরে বউ আনবো, এমন বউ আনবো যে লক্ষ্মীপ্রতিমার মত বাড়ি আলো করে রাখবে। নাতিনানীতে বাড়ি একবারে ভরে যাবে। সে-সব একটা সাধও আমার মিটলো না, বোধ হয় এ-সাধ আর জীবনে কখনও মিটবেও না–
হঠাৎ গৌরী এসে ঢুকলো। বললে–কী বউমা, তুমি এখানে?
নয়নতারা বললে–মা আমাকে এই চাবিটা দিলেন
প্রীতি বললে–গৌরী, কাল সকালে ভাঁড়ারের চাবি বউমার কাছ থেকে চেয়ে নিবি, কাজ হয়ে গেলে আবার বউমাকে ফিরিয়ে দিবি
গৌরীও অবাক। বললে–কেন বউদি, তুমি নিজের কাছে চাবি রাখবে না?
নয়নতারা বললে–ওই দেখ না গৌরী পিসী, মা সব কী অলুক্ষণে কথা বলছেন বলছেন উনি আর বাঁচবেন না, আমার হাতে জোর করে চাবির গোছা গছিয়ে দিয়েছেন–
প্রীতি বললে–না রে গৌরী, আমি যা বলেছি ঠিকই বলেছি, আমি আর বেশিদিন বাঁচবো না রে! এখন থেকে বউমাই তোদের সংসার চালাবে বউমার কাছ থেকেই তোরা চাবি চেয়ে নিস–
গৌরী পিসী প্রীতির দিকে চেয়ে ধমক দিয়ে উঠলো। বললে–তুমি থামো তো বউদি, সারাদিন না খেয়ে খেয়ে তোমার এই রকম হয়েছে, তখন কত বললুম খেয়ে নাও খেয়ে নাও, তা তো শুনলে না। এখন বুক ধড়ফড় তো করবেই। আর কথা বলতে হবে না, এখন ঘুমোতে চেষ্টা করো, আমি আলো নিবিয়ে দিচ্ছি–
তারপর নয়নতারার দিকে চেয়ে বললে–তুমিও শুয়ে পড়ো গে যাও বউমা, তুমি কেন এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কষ্ট করবে? আমি তো আছি। আমি আজ এই ঘরের মেঝেতেই বিছানা করে নেব। তুমি তোমার ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো গে–
নয়নতারা বললে–কিন্তু এই চাবি?
গৌরী পিসী বললে–চাবিটা তোমার কাছেই রেখে দাও, একটু সাবধানে রেখো। ওই চাবির মধ্যেই এ বাড়ির সব–কাল বিষ্টুর মা এলে আমি তোমার কাছ থেকে চাবি চেয়ে নেব–যাও–
নয়নতারা চাবিটা নিয়ে তার শাড়ির আঁচলে বেঁধে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। তারপর নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো।
সমস্ত রাতই কেমন যেন আধ-ঘুম আধ-জাগা অবস্থায় কাটলো নয়নতারার। সারাটা বাড়ি নিস্তব্ধ। এই সব নিস্তব্ধতার মধ্যে এতদিন কেবল কেষ্টনগরের কথাই মনে পড়তো তার। কেবল মনে পড়তো বাবার কথা। বাবার কথা আর তার সঙ্গে মার কথা। বিয়ের আগে মা কী বলতো, মা কী করতো।
কিন্তু সেদিন আর তা মনে পড়লো না। শুধু মনে পড়তে লাগলো নবাবগঞ্জের এই বাড়িটার কথা। তার এই শ্বশুরবাড়ি। শ্বশুরের কথা, শাশুড়ীর কথা। যেন একটু মায়া হতে লাগলো শাশুড়ীর জন্যে। সত্যিই তো, তাদের ছেলের অপরাধের জন্যে শ্বশুর-শাশুড়ীর কী দোষ! প্রথম দিন থেকে তারা তো এতটুকু অনাদর করে নি নয়নতারাকে। বরং নয়নতারা কীসে খুশী হয় সেই চেষ্টাই করে এসেছে বরাবর।
