নিখিলেশ বললে–আপনি কিছু ভাববেন না, আমি তো যাচ্ছি, গিয়েই সব দেখতে পাবো– বলতে বলতে দুজনেই স্টেশনের প্ল্যাটফরমে গিয়ে উঠলো।
.
একদিন বিয়ের আগে নয়নতারা এই দিনগুলোর কথাই কল্পনা করতো। তখন সবে এখানে বিয়ের সম্বন্ধ হচ্ছিল। বাবা-মার কথাবার্তার টুকরো কথাগুলো মাঝে মাঝে কানে আসতো। নবাবগঞ্জের জমিদার, অনেক ধন-সম্পত্তি তাঁদের। তাঁদের একমাত্র ছেলে। স্বাস্থ্যবান সুন্দর সুপুরুষ। বাবা নিজে গিয়ে দেখে এসে মাকে সব বর্ণনা দিচ্ছিল। শুনতে শুনতে নয়নতারার চোখের সামনে যেন নবাবগঞ্জে তার ভাবী শ্বশুরবাড়ীর চেহারাটা ভেসে উঠছিল। কল্পনায় সে চেহারা দেখে নিজের মনেই একটা নিজস্ব জগৎ সৃষ্টি করে নিয়েছিল সে। বড় বড় ঘর, মস্ত বড় দু’মহলা বাড়ি, আর রাজপুত্রের মত একজন পুরুষ তার স্বামী।
মা জিজ্ঞেস করেছিল–সংসারে কে কে আছে?
বাবা বলেছিল–ওই তো, বাবা আর মা, আর এক বুড়ো ঠাকুরদাদা। খুব সচ্ছল সংসার। চৌধুরী মশাই-এর মত মানুষ হয় না। বললেন–আমার ওই একটিই সন্তান, ওর জন্যেই এই সংসার করা–
মা জিজ্ঞেস করেছিল-পাত্রের বোন-টোন কেউ নেই বুঝি?
–না।
মা শুনে খুব খুশী হয়েছিল–ভালোই হয়েছে, নয়নকে আর ননদ কাঁটা সহ্য করতে হবে না–
তারপর মা একটু পরে জিজ্ঞেস করেছিল–তা পাত্রকে দেখতে কেমন? আমার নয়নের সঙ্গে মানাবে তো?
বাবা বলেছিল–দেখতে নয়নতারার চাইতেও ভালো, যেমন স্বাস্থ্য তেমনি রূপ। যখন বিয়ে করতে আসবে লোকে বলবে–হ্যাঁ, পণ্ডিতমশাই জামাই-এর মত জামাই করেছে বটে–
এ-সব কথা শুনে নয়নতারা সেদিন মনের মধ্যে কল্পনার একটা প্রাসাদ গড়ে তুলেছিল। এরকম কল্পনার প্রাসাদ অনেকেই বিয়ের আগে গড়ে তোলে। শুধু বিয়ে কেন, মানুষ তার সব ব্যাপারেই একটা অলৌকিক আশা করতে ভালবাসে। মনে মনে আশার একটা সৌধও গড়ে তোলে। কিন্তু নয়নতারার মত এমন করে বুঝি কারো আশা ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে নষ্টও হয়ে যায় না।
রাত তখন বেশি হয় নি। সংসারে এত বড় একটা বিপর্যয় হয়ে গেল অথচ সংসারে দৈনন্দিন কাজকর্মের কোনও ব্যতিক্রম হলো না। সকলের সব কাজ ঠিক ভাবেই সমাধা হলো। নয়নতারাকেও খেতে ডাকতে এল গৌরী। এ যেন নিয়মরক্ষে। রাত্রে খেতে হয় বলেই খাওয়া।
প্রীতি তখনও নিজের ঘরে শুয়ে ছিল। গৌরীকে ডাকলে। জিজ্ঞেস করলে–হ্যাঁ-রে, বউমা খেয়েছে?
গৌরী বললে–খেতে চাইছিল না, আমি জোর করে খাইয়ে দিয়েছি। তুমি খাবে?
প্রীতি বললে–না।
গৌরী বললে–না খেলে শরীর টিকবে কেন? খেয়ে নাও।
প্রীতি বললে–তুই আর বকবক করিস নি আমার কানের কাছে, যা,–
কিন্তু গৌরীও ছাড়বার পাত্র নয়। বললে–না, তোমাকে খেতেই হবে। একে বাড়িতে এই কাণ্ড, এর মধ্যে তুমি বাড়ির গিন্নী, তুমি যদি অসুখে পড়ে যাও, তখন তোমার সংসার কে সামলাবে শুনি? আপন বলতে আর কে আছে তোমার যে তোমাকে সেবা করবে?
শেষ পর্যন্ত প্রীতি যা পারে মুখে পুরে দিয়ে আবার উঠে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়েছিল। কিন্তু বেশিক্ষণ শুতে পারলে না। যেন পিঠে কাঁটা ফুটতে লাগলো। আস্তে আস্তে উঠে বউমার ঘরে গেল। ঘরের দরজা খোলা ছিল। নয়নতারা তখনও ঘুমোয় নি। দুজনে দুজনের মুখের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে দেখলে। যেন অনেক কথা রয়েছে দু’জনেরই, কিন্তু বলবার ক্ষমতা নেই কারো। শেষকালে অনেক কষ্টে শাশুড়ীর মুখ দিয়ে একটা কথা বেরোল–
–বউমা, তুমি খেয়েছ?
নয়নতারা বললে–হ্যাঁ, খেয়েছি, আপনি?
শাশুড়ী বললে–আমিও খেলাম বউমা। খোকা কোথায় রইল, সে খেলে কি খেলে না তার ঠিক নেই, কিন্তু আমি মা হয়ে খেলাম। আমার গলা দিয়ে ভাত গললো। আমি মা নই বউমা, আমি রাক্ষুসী। কিন্তু আমার কথা থাক, আমি তোমার কথাই কেবল ভাবছি বউমা। আমি কেন মরতে তোমাকে বউ করে নিয়ে এলাম বউমা, তোমাকে আমি কত কষ্ট দিচ্ছি, অন্য কোথাও বিয়ে হলে তোমার কত সুখ হতো। তুমি কত সুখে থাকতে সেখানে। কেন আমি এ-পাপ করতে গেলাম! এর সব দোষ আমার বউমা, আর কারো নয়, আমার। আমার ওপর তুমি রাগ করো বউমা, রাগ করে আমাকে তুমি কিছু বলো, একটু গালমন্দ দাও, তাতে যদি আমার প্রায়শ্চিত্ত হয়, তাতে যদি আমার কিছু শিক্ষা হয়। এর বেশি আমি আর কী বলতে পারি বলল বউমা? তোমার যা-কিছু কষ্ট তার জন্যে আমিই দায়ী বউমা, আমাকে তুমি ‘মা’ বলেও আর ডেকো না–
বলতে বলতে শাশুড়ী যেন ভেঙে পড়লো।
নয়নতারা শাশুড়ীকে ধরে ফেলে বিছানার ওপর বসিয়ে দিলে। বললে–আপনি চুপ করুন মা, আপনি স্থির হোন–
–না বউমা, আমাকে অমন করে মা বলে ডেকো না আর। আমি তোমার মায়ের কাজ করি নি। আমাকে তুমি ক্ষমা করো বউমা।
নয়নতারা বললে–মিছিমিছি আপনি কেন ও-সব কথা বলছেন মা, ওতে আপনার ছেলের অকল্যাণ হবে–
–ছেলে? তুমি আমার ছেলের কথা বললে? যে ছেলে নিজের বাপ-মার কথা ভাবলে না, নিজের বিয়ে করা বউ-এর দিকে ফিরে চাইলে না, তাকে আমি ছেলে বলবো? সে আমার ছেলে নয় বউমা, সে আমার শত্রু। আমি আমার শত্রুকে পেটে ধরেছিলুম বউমা, সে-ই আমার অপরাধ হয়ে গিয়েছিল–
নয়নতারা শাশুড়ীর হাত দুটো ধরলে–আপনি ঘুমোতে যান মা, সারা দিন আপনার কষ্ট গেছে, এর ওপর রাত জাগলে আপনার শরীর ভেঙে পড়বে–চলুন আমি আপনাকে আপনার ঘরে শুইয়ে দিয়ে আসছি।
প্রীতি উঠলো। বউমা তাকে আদর করছে এটা তার বড় ভালো লাগলো। এমন লক্ষ্মী বউ পেয়েও কিনা খোকা তার মর্যাদা দিলে না। হাতের লক্ষ্মী এমন করে পায়ে ঠেললে কি তারই ভালো হবে? তা যদি হয় তাহলে তো ভগবানও মিথ্যে, ভগবানের পৃথিবীতে এই সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-নক্ষত্র তাও তো মিথ্যে।
