প্রীতি বললে–তাহলে আর দুটো দিন সবুর করো বউমা। তোমার শ্বশুর তো রাণাঘাট থেকে পরশু ফিরছেন, তিনি এলে তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করে যা-হয় একটা কিছু করা যাবে। আর এ তো সাজানো মামলা বউমা! বোঝাই যাচ্ছে। সদার মত ছেলে ডাকাতি করতে যাবে এ কেউ বিশ্বাস করবে? তুমিই বলো না, তুমিও তো তাকে দেখেছ। আর কীসের জন্যে ডাকাতির মধ্যে থাকবে সে? তার এত কীসের টাকার দরকার পড়লো যে ডাকাতির মধ্যে যাবে সে?
নয়নতারা শাশুড়ীর কথার যুক্তি হয়ত বুঝলো, হয়ত বা বুঝলো না। আর যুক্তিটা যত ধারালোই হোক, শাশুড়ীর কথার ওপরে কথা বলা কি তার মানায়?
নয়নতারা আবার নিঃশব্দে তার নিজের ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে ঢুকে গেল।
.
সকালবেলা নিখিলেশ তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। বাইরে থেকে ডাক এলো–নিখিলেশ, নিখিলেশ—
শেষ রাত্রের ঘুম। আসলে ঘুম নয়, তন্দ্রা। গলার আওয়াজটা শুনেই নিখিলেশ ধড়মড় করে উঠে পড়েছে বিছানা থেকে। পণ্ডিতমশাই এত সকালে তাকে ডাকছেন কেন? আর এত কীসের তাড়া যে একেবারে তার বাড়িতে এসে?
বাইরে বেরিয়ে আসতেই নিখিলেশ দেখে একেবারে জামাকাপড়-জুতো পরে পণ্ডিতমশাই দাঁড়িয়ে আছেন।
–তুমি ঘুম থেকে উঠেছ নিখিলেশ? আমি ভাবলাম তুমি হয়তো এখনও ঘুমোচ্ছ।
নিখিলেশ বললে–কাল অনেক রাত্তিরে ফিরেছি কলকাতা থেকে–
পণ্ডিতমশাই বললেন–বড় বিপদে পড়ে তোমার কাছে এসেছি নিখিলেশ। আমি সকালের গাড়িতেই একবার নবাবগঞ্জে যাচ্ছি, তুমি সঙ্গে গেলে ভালো হতো।
–নবাবগঞ্জে? নয়নতারার শ্বশুরবাড়ীতে? হঠাৎ?
পণ্ডিতমশাই বললেন–একটা বড় বিপদের সঙ্কেত পেলাম নিখিলেশ। বিপিনরা নবাবগঞ্জে গিয়েছিল শীতের তত্ত্ব নিয়ে, সে তো তুমি জানো!
–তার অসুখ-বিসুখ নাকি?
–না তা নয়, বিপিনরা তো রেলবাজার স্টেশন হয়ে ফিরছিল। স্টেশনে এসে দেখে একদল পুলিস ডাকাতদের একটা দলকে প্ল্যাটফরমে ধরে নিয়ে অপেক্ষা করছে ট্রেনের জন্যে। স্বরূপগঞ্জের ট্রেন ডাকাতির কথা তোমার মনে পড়ে?
–হ্যাঁ, খুব মনে পড়ে। খবরের কাগজে পড়েছিলুম।
–হ্যাঁ, সেই তাদের দলটাকেই পুলিস নাকি কালীগঞ্জের একটা বাড়ি থেকে ধরে কলকাতায় চালান দিচ্ছে। কলকাতা থেকে তার জন্যে বিশেষ পুলিস এসেছিল। তা সেই ডাকাত দলের মধ্যে নাকি আমার জামাইকেও তারা দেখেছে!
নিখিলেশ চমকে উঠলো–বলছেন কী? নয়নতারার স্বামী? সেও ডাকাতির মধ্যে জড়িয়ে ছিল নাকি?
–তা ওরা তো বললে–জামাইবাবুকে কোমরে নাকি দড়ি বাঁধা অবস্থায় দেখেছে।
নিখিলেশের বিশ্বাস হলো না। বললে–না না, তা কখনও হতে পারে? বিয়ের সময় আমি তো সদানন্দবাবুকে দেখেছি। কথাও বলেছি, সে রকম তো কিছু মনে হয় নি। আমার তো বিশ্বাস হচ্ছে না। হয়ত অন্ধকার প্ল্যাটফরমে কাকে দেখতে কাকে দেখেছে। অন্য কাউকে জামাইবাবু বলে ভুল করেছে
তারপর একটু ভেবে নিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলে–আর তাছাড়া বিপিনরা যখন তত্ত্ব নিয়ে নবাবগঞ্জে গিয়েছিল তখন জামাইবাবুকে বাড়িতে দেখে নি?
পণ্ডিতমশাই বললেন–না, তাইতেই তো আমার আরো সন্দেহ হচ্ছে। মেয়েটাকে তবে কি আমি না জেনে-শুনে জলে ফেলে দিলুম নিখিলেশ? ওরা শাশুড়ীকে জিজ্ঞেস করেছে জামাইবাবু কোথায়, তিনি এক রকম উত্তর দিয়েছেন, আবার বেয়াই মশাইকে জিজ্ঞেস করেছে, তিনি আবার তার উল্টো উত্তর দিয়েছেন, আমার মেয়ে আবার আর এক রকম উত্তর দিয়েছে। আমি যেদিন নয়নতারাকে শ্বশুরবাড়িতে রাখতে গিয়েছিলুম সেদিন সকলকেই বাড়িতে দেখলুম, জামাইবাবাজীকে তো কই দেখি নি। তারপর আমার গৃহিণী যখন মারা যান তাঁর শ্রাদ্ধের সময় নয়নতারা এখানেই ছিল, নয়নতারার মামাশ্বশুর এসেছিল নিমন্ত্রন রক্ষা করতে কিন্তু জামাইবাবাজী তো একবারও আসে নি–
কথাটা নিখিলেশকেও ভাবিয়ে তুললো। এর কী জবাব সে দেবে তা বুঝতে পারলে না।
কালীকান্ত ভট্টাচার্য বললেন–এই সব কথা আমার এখন মনে পড়ছে নিখিলেশ। আগে এসব ভাবিও নি। কাল অনেক রাত্রে বিপিনদের কাছে ঘটনাটা শুনে ভালো ঘুম হয় নি। তখন ট্রেন থাকলে তখনই নবাবগঞ্জে চলে যেতাম। কিন্তু সকালবেলার ট্রেন, ভাবলাম একলা কী করে যাই, তাই তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবার কথাটা মনে উদয় হলো। তুমি যাবে?
–নিশ্চয় যাবো, আপনি স্টেশনের দিকে যান। আমি তৈরি হয়ে নিয়ে এখুনি বেরোচ্ছি–
কালীকান্ত ভট্টাচার্য বললেন–আমি তাহলে এগোই, তুমি দেরি কোরো না–
বলে স্টেশনের দিকে চলতে লাগলেন। কেষ্টনগরে তখন ভালো করে রোদ ওঠে নি। ফার্স্ট ট্রেনটা ধরলে রেলবাজারে বেলা দশটার মধ্যে পৌঁছে যাবেন। সেখান থেকে যদি একটা সাইকেল-রিকশা পাওয়া যায়, তাহলে আর দেরি হবে না। ঘণ্টা দুয়েকেই মধ্যেই একেবারে নয়নতারার শ্বশুরবাড়ি।
খানিক দূর গিয়ে পেছন ফিরে দেখলেন একবার। বাজারের টিনের চালের বাড়িটার একেবারে ওধারে যেন মনে হলো নিখিলেশ হন্ হন্ করে এগিয়ে আসছে। সারা রাত ঘুম হয় নি। মাথাটা কী রকম করছিল। তাড়াতাড়ি হেঁটে আসতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। ততক্ষণে নিখিলেশ পণ্ডিতমশাই-এর নাগাল পেয়ে গেছে।
পণ্ডিতমশাই বললেন–এসো, তুমি তো তাড়াতাড়ি আসতে পেরেছ–খবরটা শোনার পর থেকে আমার মনটা কেমন করছে নিখিলেশ। আমি তো অনেক দেখেশুনেই বিয়ে দিয়েছিলাম নয়নতারার। তোমরা তো জানো নয়নতারার মত মেয়ের পাত্রের অভাব হবার কথা নয়। ওর রূপ গুণ দেখে কত জায়গা থেকে কত সম্বন্ধ এসেছিল, কিন্তু সবগুলো নাকচ করে এখানেই বিয়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম বনেদী বংশ, প্রচুর অর্থ। কিন্তু শেষকালে এ কী হলো নিখিলেশ!
