.
প্রকাশ চণ্ডীমণ্ডপ থেকে একেবারে সোজা রান্নাবাড়ির দিকে ছুটলো। নয়নতারার রাতটা যেমন কাটে নি, দিনটাও তেমনি না কাটবার কথা। অন্য দিনের মত আবার তার রাত আসবে। দিনের পর রাত আসার নিয়ম আছে বলেই আসবে। অথচ রাতের কথা ভাবতেই নয়নতারার যেন আতঙ্ক হলো! আবার কি রাত আসবে? আবার কি সেই পুনরাবৃত্তি? আবার সেই অপমান! আবার সেই পোড়া মুখ ঘোমটার আড়ালে লুকিয়ে রাখতে হবে! সে-কথা ভাবতেও যেন ভয় লাগছিল নয়নতারার।
অথচ নতুন বউ সে এবাড়িতে। এ ব্যাপারে প্রতিবাদ করা নতুন বউ-এর ধর্ম নয়। তার ধর্ম সমস্ত কিছু মান-অপমান অনাদর-আঘাত মুখ বুজে হজম করা। তোমাকে সবাই যা খুশী বলুক তোমার কর্তব্য চুপ করে থাকা। এখানে আসার আগে মা তাকে এই কথাই শিখিয়ে দিয়েছিল। তার মনে হলো মা যদি এখন বেঁচে থাকতে তো তাকে নয়নতারা জিজ্ঞেস করতো–মা, তুমি যদি আমার মত অবস্থায় পড়তে তো তুমি কী করতে? তুমিও কি আমার মত সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করতে? এমনি করে সমস্ত সহ্য করেই তুমি তোমার নারী-ধর্ম পালন করতে?
কিন্তু মা যখন নেই তখন এ-প্রশ্ন কাকেই বা সে করবে আর কে-ই বা এর উত্তর দেবে?
হঠাৎ বাইরে মামাশ্বশুরের গলা শোনা গেল–দিদি শুনেছ, সব্বনাশ হয়েছে–
শাশুড়ী সারাদিন খায় নি। তবু একটার পর একটা সর্বনাশ হয়ে হয়ে চরম সর্বনাশের গুরুত্বও বোধ হয় তার শাশুড়ীর কাছে তখন কমে গিয়েছিল। কিম্বা হয়ত সব রকম সর্বনাশের জন্যেই মনটাকে কঠোর করে নিয়েছিল তার শাশুড়ী।
নিরুদ্বেগ গলায় প্রীতি বললে–কী?
প্রকাশ বলল–সদার খোঁজ পাওয়া গেছে–
–পাওয়া গেছে? কোথায়? কোথায় ছিল সে?
প্রকাশ বললে–এই এখখুনি রেলবাজারের দারোগাবাবু এসেছিল, পুলিস-টুলিস নিয়ে। সদাকে পুলিস এ্যারেস্ট করেছে। সে নাকি স্বরূপগঞ্জের ট্রেন-ডাকাতির দলের সঙ্গে ধরা পড়েছে
–ট্রেন ডাকাতি? বলছিস কী তুই? সদা করবে ডাকাতি?
–আমিও তো শুনে তাই অবাক! এখন কী করবো তা বুঝতে পারছি না। সদা হঠাৎ ডাকাতিই বা করতে যাবে কেন? স্বরূপগঞ্জের ট্রেনে তো স্বদেশীরা ডাকাতি করেছিল শুনেছি। সে মাঝখান থেকে তাদের সঙ্গে জুটল কী করে?
প্রীতির তখনও বিশ্বাস হলো না কথাটা।
বললে–তুই ঠিক শুনেছিস তো? আমার ছেলে ডাকাতি করবে? আমার ছেলের কি টাকার অভাব যে ডাকাতি করতে যাবে সে? তাহলে এখন কী হবে?
প্রকাশ বললে–এ তো মহা মুশকিল হলো দেখছি। জামাইবাবু নেই, এই সময়েই কিনা যত ঝামেলা। আমি একলা মানুষ। কর্তাবাবুকে দেখবো, না সদাকে সামলাবো! কী করি বল দিকিনি এখন?
প্রীতি কথাটা শুনে সেখানেই বসে পড়লো। বললে–আমি সারাদিন খাই নি, আমার মাথাটা ঘুরছে, আমি কিছু ভাবতে পারছি না–
–তা আমিই কি ছাই কিছু ভাবতে পারছি! তা থাক গে, তুমি খেয়ে নাও, বুঝলে? খেলে তবু একটু বুদ্ধি বেরোবে। তা বাবাজীর কাছে একবার যাবো? দেখবো বাবাজী কী বলে?
প্রীতি বললে–তুই আর হাসাস নি! থাম্। তা হ্যাঁরে, তাকে জামিনে ছাড়িয়ে নিয়ে আসা যায় না?
প্রকাশ বললে–আমি তো জীবনে কখনও জামিন-টামিন হই নি–কে জামিন দাঁড়াবে?
–তা পুলিসকে টাকা দিলে পুলিস তো কেস ছেড়েও দেয়। কত টাকা লাগে একবার জিজ্ঞেস করে আয় না। পুলিস তো আমাদের হাত-ধরা লোক।
প্রকাশ বললে–পুলিস তো চলে গেছে। খবরটা দিয়েই চলে গেছে
প্রীতি বললে–তুই তাহলে একবার এখুনি রেলবাজারে যা ভাই। হয়ত রাস্তাতেই তাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে
–তাহলে টাকা দাও।
–কত টাকা দেব?
প্রকাশ বললে–পাঁচশো, হাজার, যা আছে তোমার কাছে দিয়ে দাও, ডাকাতির মামলা তো সস্তায় হবে না–
প্রীতি আর দাঁড়ালো না। তার শোবার ঘরেই সিন্দুক থাকে। সিন্দুকের তলায় গোছা গোছা নোট থাকে। একগাদা নোট বার করে গুনে বাইরে নিয়ে এল।
–কত আছে এতে?
–চারশো তিরিশ টাকা।
–এতে কি হবে?—
ওতে যা আছে এখন তাই নিয়ে খোকাকে ছাড়িয়ে নিয়ে তো আয়। তারপর তোর জামাইবাবু এলে বেশি দিতে পারবো।
প্রকাশ টাকা নিয়ে কোথায় চলে গেল।
ঘরের ভেতরে নয়নতারার কানে সব কথাগুলোই গিয়েছিল। শুনতে শুনতে যেন পাথর হয়ে গেল সে। এ কী হলো? এমন তো হবার কথা নয়। এ কোথায় কার সঙ্গে তার বিয়ে হলো! আস্তে আস্তে সে নিজের ঘর থেকে বেরোল। তারপর পায়ে পায়ে রান্নাবাড়ির কাছে এল।
–মা।
প্রীতির কানে গেছে কথাটা।
–কী বউমা? কিছু বলবে?
নয়নতারা বললে–কী হয়েছে মা? আপনারা কী বলাবলি করছিলেন?
–ও, তুমি শুনেছ সব?
নয়নতারা বললে–শুনেছি। এত বড় একটা কাণ্ড হলো, বাবাকে একটা চিঠি দেব?
–চিঠি? প্রীতি যেন কী ভাবলে। তারপর বললে–চিঠি দিয়ে আর কী হবে বউমা, এই তো তত্ত্ব নিয়ে তোমার বাপের বাড়ির লোকেরা সব গেল। এখনও বোধহয় তারা কেষ্টনগরেই পৌঁছোয় নি। তারা তো দেখেই গেছে তুমি ভালো আছো–
নয়নতারা বললে–মা, আমার কথা নয়। বাবা যদি শেষকালে বলেন, ওঁর এত বড় একটা বিপদ গেল আর তোরা কেউ আমায় একটা খবরও দিলি নে তখন? শেষকালে তো আমাকেই দোষ দেবেন।
প্রীতি বললে–তাঁকে বুড়ো মানুষকে আবার কেন মিছিমিছি ভাবাবে? তিনি তো সেখানে বসে এর কিছু সুরাহা করতে পারবেন না। উলটে মিছিমিছি তাঁর উদ্বেগ বাড়ানো। আর যা করবার তা তো আমরা এখান থেকেই করতে পারবো
নয়নতারা বললে–আমার মনে হচ্ছিল বাবাকে খবরটা দিলে ভালো হতো, শেষে জানতে পারলে আমার ওপর রাগ করবেন
