কিন্তু এ-সময়ে এরা কারা?
হর্ষনাথ চক্রবর্তীর বাড়ি সহজ বাড়ি নয়। এককালে পয়সা ছিল তাঁর প্রচুর, জমিও ছিল প্রচুর। কিম্বা হয়ত কর্তাবাবুর মত কপিল পায়রাপোড়া, মাণিক ঘোষ আর ফটিক প্রামাণিকদের ঠকিয়েই তিনি পয়সা করেছিলেন। কিন্তু শেষ জীবনে আসক্তি ত্যাগ করে নবদ্বীপবাসী হতে গিয়েছিলেন হয়ত সেই কারণেই। আর হয়ত নরনারায়ণ চৌধুরীর মত নায়েব না থাকলে এ বাড়ির এমন দশাও হতো না। অর্থ আর প্রতিপত্তির শিখরে যখন তিনি উঠেছিলেন তখন তিনি এই বাড়ি করেছিলেন। তাই যতটা না প্রয়োজন তার চেয়েও বেশি ছিল বাড়ির আয়োজন। যত না মানুষ তার চেয়ে বেশি ছিল ঘর। এবং যত না ঘর তার চেয়েও বেশি ছিল ঘরের আসবাবপত্র। তা আসবাবপত্র বোধ হয় পোড়াবাড়িতে পড়ে থাকার কথা নয়। তাই সেগুলো যথাসময়েই অদৃশ্য হয়েছে। কিন্তু ইট কাঠ? ও-গুলো তো আর একদিনে কাঁধে করে তুলে নিয়ে যাওয়া যায় না, তাই আছে। সেই ভাঙা ইট-কাঠের মধ্যেই সদানন্দ রোজ এসে যেন খানিকক্ষণের শান্তি খুঁজতো। তখন নিরিবিলিতে কালীগঞ্জের বউ-এর সঙ্গে দুদণ্ড কথা হতো। নিজের মনকে উজাড় করে ঢেলে দিত তার কাছে। বলতো–আমি আমার পূর্ব পুরুষের সব পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবো কালীগঞ্জের বউ, তুমি কিছু ভেবো না, আমি প্রায়শ্চিত্ত করবোই–
কিন্তু সেদিন আর তা হলো না। ভাঙা পাঁচিলটা টপকে ভেতরের উঠোনের কাঁটাঝোপ মাড়িয়ে যখন সিঁড়ি দিয়ে ওপরের দোতলার উঠেছে তখনই কাদের ফিসফিস আওয়াজ শুরু হয়েছিল।
–কে?
–আমি!
–আমি কে? কোথা থেকে আসছো তুমি?
–আমি সদানন্দ, নবাবগঞ্জে থাকি।
তারপর যারা এতক্ষণ অদৃশ্য ছিল তারা একে একে সবাই সামনে বেরিয়ে এল। একেবারে চার-পাঁচ জন। সবাই তারই বয়েসী। তারপর তাদের জেরা। কোথায় থাকেন? কেন এখানে আসেন রোজ? এই অন্ধকার ভূতের বাড়িতে আপনার কীসের প্রয়োজন? অনেক কথা তাদের, অনেক জিজ্ঞাসা। কিন্তু তবু মনে হলো তাদের যেন অনেক সন্দেহ।
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–কিন্তু আপনারা কারা? আপনাদের তো কোনও দিন এ বাড়িতে দেখি নি?
–আমরা কালীগঞ্জে এসেছিলুম হাট করতে। আজ এখানে হাটবার। কাল সকালে আবার ফিরে যাবো।
তবু সদানন্দর সন্দেহ গেল না। হাট বার তো বাড়িতে যেতে কী! এর আগেও তো অনেক হাট গেছে এই কালীগঞ্জে। কোনও দিন তো তোমরা এখানে আসে নি। তোমরা এখানে খাবে কী! থাকবে কোথায়? ঘুমোবে কোথায়? কতক্ষণ থাকবে?
–আর আপনি? আপনি কী খাবেন? আপনি কোথায় ঘুমোবেন? আপনি বাড়ি যাবেন না?
সদানন্দ বললে–আমি তো রাত্তিরে এখানে থাকি না। আমি নবাবগঞ্জে চলে যাই, নবাবগঞ্জে আমাদের বাড়ি আছে–
তবু সন্দেহ গেল না তাদের। একজন চুপি-চুপি আর একজনকে বললে–ও নিশ্চয়ই পুলিসের লোক—চর–
আর একজন বললে–ওকে ছাড়িস নি, এখানেই আটকে রাখ, বেরিয়েই পুলিসে খবর দিয়ে দেবে–
একজন সদানন্দর দিকে এগিয়ে এল। একজনের হাতে রিভলবার। সদানন্দ তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার উদ্যোগ করছে। ছেলেটা এসে তার দিকে রিভলবারটা তাগ করে বললে–কোথায় যাচ্ছেন?
–বাড়ি।
–বাড়ি, না পুলিসের হেডকোয়ার্টারে? আমরা সব জানি। আপনাকে যেতে দেওয়া হবে না।
সদানন্দ হাসলো। বললে–বেশ তো, এখানেই থাকবো। বাড়ির ওপর আমার এমন কিছু টান নেই যে সেখানে যেতেই হবে–
সবাই অবাক! সদানন্দ যে পুলিসের স্পাই এ-সম্বন্ধে আর কোনও সন্দেহই রইল না তাদের। অতি ধূর্ত না হলে কি এমন কথা কেউ বলে!
–খাবেন কী?
সদানন্দ বললে–খাওয়া? আমার অত ক্ষিধে পায় না–
এবার আরো নিঃসন্দেহ হয়ে গেল সবাই। বললে–তাহলে আপনাকে এই ঘরের মধ্যে রেখে আমরা বাইরে থেকে দরজায় শেকল দিয়ে দেব। তারপর সেই ভোরবেলা আবার দরজা খুলে দেব।
ঠিক আছে। তাই সই। তেমনি করেই তাকে ঘরের মধ্যে রেখে তারা বাইরে থেকে দরজায় শেকল দিয়ে চলে গিয়েছিল।
তারপর সেই কাণ্ডটা ঘটলো। সেই পোড়োবাড়ির পরিত্যক্ত একটা ঘরে। মনে আছে সদানন্দের জীবনে এর পরে অনেক কাণ্ডই ঘটেছে। কিন্তু সেদিনকার সেই ঘটনার যেন আর তুলনা নেই। যে-মানুষ একদিন আসামী হয়ে কাঠগড়ায় উঠবে, তার শুরু অনেক দিন আগে থেকেই অবশ্য শুরু হয়ে গিয়েছিল। কেমন করে সে এই পৃথিবীটাকে নিজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে এইটেই ছিল তার সব চেয়ে বড় সমস্যা। অথচ সবাই চাইতো তাদের সঙ্গেই সদানন্দ নিজেকে খাপ খাইয়ে নিক। সেখানেই তো ছিল তার যত বিরোধ। সেই বিরোধটাই সেইদিন প্রথম মোটা আকারে ধরা পড়লো সেই কালীগঞ্জের পোড়ো বাড়িটাতে।
হঠাৎ কখন কে জানে ঝনাৎ করে একটা শব্দ হয়ে দরজাটা খুলে গেল। আর খুলে যেতেই সদানন্দ দেখলে একগাদা পুলিস তার সামনে। তারা সবাইকে ধরে ফেলেছিল। এবার তাকেও তারা ধরে ফেললে। সদানন্দ কোনও প্রতিবাদ করলে না। পালাতেও চেষ্টা করলে। না। যে-অপরাধে আর পাঁচজন ধরা পড়লো, তার অপরাধও সেই একই। এর জন্যে তার কৈফিয়ৎ চাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না, কেবল শাস্তির প্রশ্নই ওঠে। সেই ঘরখানার সামনে দাঁড়িয়েই যেন সদানন্দর ওপর শেষ বিচারের দণ্ড নেমে এলো। যেমন করে দণ্ড নেমে এসেছিল নবাবগঞ্জে তাদের নিজেদের বাড়িতে।
তারপর ছ’জনকেই হাতে হাতকড়া পরানো হলো। পুলিসের দল আসামীদের সকলকে নিয়ে সদরে চালান দিয়ে দিলে।
জিনিসটা এত তাড়াতাড়ি আর এত রোমাঞ্চকর ভাবে ঘটলো যে কাউকে যেন কিছু ভাবতেও সময় দিলে না।
