নদীটা পার হয়ে একেবারে ওপারে গিয়ে দাঁড়ালো সদানন্দ। যেদিকটায় লোকের ভিড় সেদিকে গেল না সে। আলের পথে রাস্তাটা বেশ ফাঁকা। যতদূর চোখ চাও কেবল ছোলার ক্ষেত। ছোট ছোট আধ ইঞ্চির মত সবুজ ছোলা গাছের চারা। কতকগুলো পাখি ক্ষেতের ওপর বসে বসে কী খাচ্ছিল কে জানে। সদানন্দকে দেখেই তারা ভয়ে উড়ে পালিয়ে গেল।
সদানন্দ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো। চেয়ে দেখলে পাখিগুলো আরো দূরে কাদের একটা ক্ষেতের ওপর গিয়ে ঝাঁক বেঁধে বসলো। সদানন্দ কী করবে বুঝতে পারলে না। ওর পাশ দিয়েই রাস্তা। ওখান দিয়ে গেলে তো আবার পাখিগুলো ভয় পাবে। আবার উড়ে যাবে।
সদানন্দ সেখানে দাঁড়িয়েই বললে–আমি কিছু করবো না রে, তোদের কিচ্ছু ভয় নেই, তোরা খাচ্ছিস খা–
পাখীগুলো তার কথা বুঝতে পারলে কিনা কে জানে। তারা ঝাঁকে ঝাঁকে সবাই নিশ্চিন্ত মনে ছোলা গাছের কচি পাতা খেতে লাগলো। সদানন্দর নিজেরও ক্ষিধে পেয়েছিল। কিন্তু পাখিদের খেতে দিয়ে তার নিজের ক্ষিধেই যেন মিটে যেতে লাগলো। খা, খা, তোরা খা। যাদের ছোলার ক্ষেত তাদের অনেক আছে। তারা অনেক কপিল পায়রাপোড়া অনেক মানিক ঘোষ আর অনেক ফটিক প্রামাণিককে খেতে না দিয়ে উপোস করিয়ে মেরে ফেলেছে। তারা অনেক কালীগঞ্জের অনেক বউ-এর অনেক সর্বনাশ করেছে। ও ক’টা খেলে তাদের কোনও ক্ষতি হবে না। তোরা গরীব, তোদের বরং খাওয়াবার কেউ নেই। তোরা খা, পেট ভরে খা। আমি কিছু বলবো না। এখানে কর্তাবাবুরাও নেই, চৌধুরী মশাইরাও নেই, কৈলাস, দীনু, প্রকাশ মামা, মা কেউই নেই। কেবল আমি আছি। আমি তোদের কিছু বলবো না। আমিও তোদের মতন, জানিস। খা, খা, তোরা খুব খা–
তারপর নলগাড়ির মাঠ, বউমারীর বিল, একটা খেজুর গাছ। দুটো গরু। তারও পরে ওমরপুর। তারপরে শুধু আকাশ। কেবল আকাশ আর আকাশ। আর আকাশের ওপারে?
–কে?
কখন যে হাঁটতে হাঁটতে সে কালীগঞ্জে এসে পড়েছে তা তার নিজেরই খেয়াল ছিল না। কখন যে সূর্য ডুবে গেছে তারও খেয়াল ছিল না তার। একেবারে কালীগঞ্জের বাজারের কাছে এসে পড়েছিল।
–আমি।
–আমি কে?
সদানন্দ বললে–আমি সদানন্দ।
–কোথায় বাড়ি তোমাদের?
–নবাবগঞ্জে
বলে আর দাঁড়ালো না সেখানে সদানন্দ। শেষকালে হয়ত কুলুজীর পরিচয় দিতে হবে। বলতে হবে কেন সে এখানে এসেছে। কেন সে এখানে প্রায় আসে। নবাবগঞ্জের হরনারায়ণ চৌধুরীর ছেলের এখানে আসার দরকারটা কী? জিজ্ঞেস করলে সে কী উত্তর দেবে? কী উত্তর দেওয়া তার উচিত? আর উত্তর আছেই বা কি ছাই যে সে উত্তর দেবে! কেন যে সে ঘুরে ঘুরে কালীগঞ্জে আসে তা কি সে নিজেই জানে? সত্যিই তো, কেন সে এখানে আসে! সমস্ত মাঠ-ঘাট-প্রান্তর অতিক্রম করে এখানে এই কালীগঞ্জে?
হাটের একটা কোণে তখন বেশ ভিড় হয়েছে। চারিদিকে গোল হয়ে লোক দাঁড়িয়ে। ভেতর থেকে একটা মেয়েলী গলার গান ভেসে আসছে–
আগে যদি সখি জানিতাম।
শ্যামের পীরিত গরল মিশ্রিত
কারো মুখে যদি শুনিতাম ॥
কুলবতী বালা হইয়া সরলা
তবে কি ও-বিষ ভখিতাম ॥
আরে, এ তো সেই গান! বহুদিন আগে সেই রাণাঘটের সদরে রাধার মুখে শোনা। প্রকাশ মামা যাত্রা-শোনার পরে রাত দুটোর সময় তার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। তবে কি ও-বিষ ভখিতাম মানে খাইতাম! সদানন্দ সেখানে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গানটা শুনলো। আসলে গান শুনলো না! মনে হলো সে তার নিজেরই মনের কথা যেন শুনতে লাগলো। আগে যদি কালীগঞ্জের বউ জানতো যে বিয়েবাড়িতে গেলে তাকে এমন করে গুম খুন করে ফেলবে তাহলে কি সে নবাবগঞ্জে যেত! কপিল পায়রাপোড়া যদি জানতো তাকে বারোয়ারিতলায় একদিন গলায় দড়ি দিয়ে মরতে হবে তাহলে কি সে কর্তাবাবুর নাতিকে বিনে পয়সায় রবারের বেলুন উপহার দিত! এই রকম কত যদি আছে তার জীবনে। কর্তাবাবু যদি বলতো যে কালীগঞ্জের বউকে টাকা দেবে না তাহলে সদানন্দ বিয়ে করতেই কি যেত! আর নয়নতারার বাবাই যদি জানতো যে টাকা না দিলে জামাই তার মেয়ের সঙ্গে ঘর করবে না তাহলে কি সদানন্দর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিত।
অথচ ইতিহাসের পাতায় তো সবই লেখা আছে। তারও আগে হাজার হাজার সদানন্দ তো এমনি করেই সংসারের সঙ্গে কত অসহযোগিতা করেছে। কপিলাবস্তুর রাজা শুদ্ধোদন তো অনেক চেষ্টা করেছে সিদ্ধার্থকে ঘরে ফিরিয়ে আনবার জন্যে। নদীয়ার শচীমাতাও তো অনেক সাধ্য-সাধনা করেছে নিমাইকে সংসারী করবার জন্যে। আসলে ইতিহাসের তো ওই একটাই শিক্ষা। আমরা তো ইতিহাস পড়েই শিখি যে ইতিহাস পড়ে আমরা কিছুই শিখি না। নইলে নবাবগঞ্জের এত বংশ থাকতে কালীগঞ্জের নায়েব নরনারায়ণ চৌধুরীর বংশেই বা কেন সদানন্দর জন্ম হলো!
আবার সেই অদ্ভুত গলার শব্দটা–কে?
–আমি!
–আমি কে?
–আমি সদানন্দ।
–কোথায় বাড়ি তোমাদের?
–নবাবগঞ্জে।
কে কথাটা জিজ্ঞেস করলে, কোথা থেকে জিজ্ঞেস করলে, কিছুই বোঝা গেল না। তখন বেশ আবছা অন্ধকার হয়ে এসেছে চারদিকে। কালীগঞ্জের জমিদারের বাড়ির ভেতরে কতদিন সে লুকিয়ে ঢুকেছে, কতদিন এখানে কত সময় কাটিয়ে গিয়েছে। বাড়ি থেকে বেরিয়েই এখানে চলে এসেছে সকলের চোখের আড়ালে। এখানে এসে নিরিবিলিতে কালীগঞ্জের বউ-এর সঙ্গে দু’ দণ্ড কথা বলেছে, কিন্তু এমন করে কেউ কখনও তার নাম-ধাম জিজ্ঞেস করে নি, এমন করে তাকে চ্যালেঞ্জও করে নি।
