যারা ডাকাতি করেছে তারা নাকি ঠিক ডাকাত নয়। স্বদেশী কোন্ পার্টি!
এ-সব কয়েক মাস আগেকার ঘটনা। এ ঘটনার পর কর্তাবাবু খুব সাবধান হয়ে গিয়েছিলেন। খবরের কাগজটা যখন পড়িয়ে শুনিয়েছিল কৈলাস তখন কর্তাবাবু খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। যাদের কিছু আছে তাদেরই খোয়া যাবার ভয় থাকে। যাদের বেশি আছে তাদের আবার বেশি খোয়া যাবার ভয়। কর্তাবাবু সেই বেশি থাকার দলে। তাই তাঁর ভয়টাই আরো বেশি করে হয়েছিল।
তার পরে সপ্তাহে দু’বার যখনই কাগজ এসেছে তখনই কর্তাবাবু কৈলাসকে খুঁচিয়েছেন–কৈলাস, সেই ডাকাতদের কথা আর কিছু লেখে নি কাগজওয়ালারা?
কৈলাস তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সে-সম্বন্ধে আর কিছু নতুন খবর পায় নি। প্রত্যেকবারই বলেছে-আজ্ঞে না কর্তাবাবু–
এমনি প্রত্যেকবার। দেখতে দেখতে কত মাস কেটে গেল। তারপরে অন্য খবরের তলায় স্বরূপগঞ্জের ডাকাতির খবর একদিন চাপা পড়ে গেল। কর্তাবাবুর মনে হলো সব ঠিক হয়ে গেছে। আর কিছু হবে না। এবার শান্তি। এবার তাঁর জমি-জমা-টাকা-কড়ি আর কেউ কেড়ে নেবে না। এবার থেকে তিনি নিশ্চিন্তে নিরুপদ্রবে পৃথিবীর সব উপকরণ ভোগ-দখল করতে পারবেন। হয়ত তাঁর পা-ও একদিন আবার ভালো হয়ে যাবে। আবার তিনি হেঁটে চলে ঘুরতে পারবেন। তখন তিনি আবার ক্ষেত-খামার চষে বেড়াবেন। তখন আর পৃথিবাতে ডাকাত থাকবে না।
কিন্তু আশ্চর্য, তাঁর আশেপাশে তখন কেউ-ই আর বলবার ছিল না যে আসলে তিনিও একজন ডাকাত। তিনিও একদিন ওই স্বরূপগঞ্জের ডাকাতদের মতই ডাকাতি করেছেন। ডাকাতি করেই এই সংসার-সম্পত্তি-জমি-জমা করেছেন। স্বরূপগঞ্জের ডাকাতরা ট্রেন ডাকাতি করেছে আর তিনি করেছেন কালীগঞ্জের জমিদারি ডাকাতি। এ ডাকাতি আর ও-ডাকাতিতে যে কোনও তফাৎ নেই তা বোঝবার মত চেতনা ছিল না কর্তাবাবুর। আর কর্তাবাবুরই বা দোষ কী! কর্তাবাবুর চেয়েও যারা আরো বেশি বড় ডাকাত তাদেরই কি সে চেতনা থাকে? ইতিহাসের তো ওই একটাই শিক্ষা। আমরা তো ইতিহাস পড়েই শিখি যে ইতিহাস পড়ে আমরা কোন শিক্ষাই নিই না। নইলে এই কর্তাবাবুর বংশেই বা এই কালাপাহাড় সদানন্দর জন্ম হলো কেন!
ইতিহাসেই লেখা আছে আড়াই হাজার বছর আগে আর এক দেশে আর এক জমিদার বংশে আর এক সদানন্দর জন্ম হয়েছিল। সেই ছেলেরও সেই কর্তাবাবু একদিন পরমা রূপসী মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল। সেই সদানন্দর জন্যেও অনেক আদর অনেক যত্ন অনেক বিলাসের উপকরণের আয়োজন হয়েছিল, কিন্তু এই সদানন্দর মত সেই সদানন্দরও সেদিন মন ভরে নি। তারও মনে প্রশ্ন জেগেছিল–এ অন্যায়, এ পাপ! এই অন্যায় আর এই পাপের প্রতিকার চাই–
এই বলে কপিলাবস্তুর সেই সদানন্দও একদিন সব আয়োজন-উপকরণ-পত্নী-প্রিয়জন সবাইকে ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিল।
নবাবগঞ্জের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এই সদানন্দরও সেদিন মনে হলো–এ অন্যায়, এ পাপ। এই অন্যায় আর এই পাপের প্রতিকার চাই–এই বুজরুক, এই ভণ্ড, আর এই মিথ্যের সৌধ ছেড়ে সে রাস্তায় নামবে।
সকালবেলাই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল সে। প্রকাশ মামা খানিক দূর পর্যন্ত এসেছিল। বলেছিল–কোথায় যাচ্ছিস তুই?
তারপর নিজেই আবার বলেছিল–তোকে নিয়ে দেখছি মুশকিল হলো আমার, এই সব দায়িত্ব দেখছি শেষকালে আমার ঘাড়েই পড়লো–
একটু আগে বাড়িতে যে কাণ্ড ঘটে গেছে সেটা তখনও প্রকাশ মামার মনে ছিল। একদিকে দিদির সঙ্গে জামাইবাবুর কথা কাটাকাটি, চাবি নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া, ওদিকে বাবাজীর হেনস্তা, আর তার ওপর কর্তাবাবুর হঠাৎ অসুখ। তারপরে ননী ডাক্তারকে ডাকতে যাওয়া। যত রকমের ঝঞ্ঝাট শুরু হয়ে গেল ওই নতুন বউ বাড়িতে আসবার পর থেকেই। তাহলে ওই বউটাই আসলে অপয়া।
আর সদানন্দর সঙ্গে বেশি দূর যাবার সময় ছিল না। প্রকাশ মামা ফিরলো। দূর হোক গে, সকাল থেকে তখনও প্রকাশ মামার কিছু পেটে পড়ে নি। না-খেয়ে ভাগ্নের পেছন পেছন কত ঘোরা যায়? ও তো একটা বাউণ্ডুলে মানুষ, ও খালি পেটে ঘুরতে পারে। কিন্তু প্রকাশের তো তা চলবে না। খাওয়া চাই, পেটটা আগে ভরানো চাই।
বললে–আমি আর যাবো না তোর সঙ্গে–তুই কখন আসছিস?
সদানন্দ সেকথার উত্তর না দিয়ে যেমন চলছিল তেমনিই চলতে লাগলো।
প্রকাশ মামা আবার বাড়িতে ফিরলো। বাড়ি নয় তো যেন আগুন। সেখানে ফেরা মানে আগুনের মধ্যে ফেরা। তবু না ফিরে উপায়ই বা কী! এমন হাত পাতলেই টাকা কোথায় পাওয়া যাবে? ভাগলপুরে গেলে তো আর এমন আরাম নেই। সেখানে সেই বউ-ছেলে মেয়ের ঝামেলা। আজ এটার অসুখ, কাল সেটার। এখানে দরকার হলে তো দিদির কাছে হাত পাতলুম। সেই টাকা থেকে কিছু পাঠিয়ে দিলুম বউ-এর কাছে। তারা সেখানে খেতে পাক আর না-পাক সেসব তো আমাকে আর চোখ মেলে দেখতে হচ্ছে না।
কিন্তু বাড়িতে এসেই দেখলে খণ্ডযুদ্ধ বেধে গেছে দিদিতে আর জামাইবাবুতে।
সদানন্দর তখন ওসব সমস্যা নেই। মাথার ওপর আকাশ। বারোয়ারিতলার দিকে গেলে তাদের সেই গাছের তলায় দোকানের মাচার ওপর বসে বসে আড্ডা আর রাত্তিরে সেই মহড়া। তার চেয়ে আরো দূরে চলে চলো। একেবারে নদীর ধারে।
শীতকালে নদীটার চেহারাটাই একেবারে অন্য রকম হয়ে যায়। জল শুকিয়ে আসে তখন। নল-খাগড়ার ডগাগুলো তখন জলের ওপর মাথা তুলে আকাশের দিকে হাত বাড়ায়। যেন জলের বেড়া ডিঙিয়ে তারা সূর্যের নিঃসীমতায় প্রাণ খোঁজে। তখন ইছামতী হেঁটেই পার হওয়া যায়।
