তারপর বিকেল হবার সঙ্গে সঙ্গে আবার সাজ-সাজ রব উঠবে। ছোটবাবু না-ই বা রইল বাড়িতে। কিন্তু অন্য সবাই-ই তো রয়েছে। তারা তো তা বলে আর পেটে খিল্ লাগিয়ে বসে থাকবে না। তাদের সব চাহিদা ঠিক ঠিক যুগিয়ে যেতে হবে প্রীতিকেই। ওপরে বুড়ো শ্বশুর অসুস্থ, বারবাড়িতে বাবাজী। পাশের ঘরে নতুন বউ-মানুষ। শুধু যার জন্যে এই সংসার করা, যার মুখ চেয়ে এই পরের বাড়ির মেয়েকে বউ করে আনা, সে-ই কোথায় রইল তার ঠিক নেই।
বাইরে কার পায়ের শব্দ হতেই প্রীতি চেয়ে দেখলে–কে?
বিষ্টুর মা! বিষ্টুর মা বললে–উনুনে আঁচ দেব মা?
প্রীতি রেগে গেল–ভরদুপুর বেলায় উনুনে আঁচ! তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে বিষ্টুর মা?
বিষ্ঠুর মা বললে–দুপুর কোথায় মা! সন্ধ্যে হয়ে এসেছে যে–
সন্ধ্যে! প্রীতি ধড়মড় করে লাফিয়ে উঠলো। শীতের বেলা দেখতে দেখতে পার হয়ে যায়। কখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল, আবার বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল তা টেরই পায় নি সে। গৌরী কোথায়? গৌরী মুখপুড়ী কোথায় গেল? আমাকে একবার ডেকে দেয় নি কেন সে?
গৌরী আসতেই প্রীতি ধমকে দিলে–হ্যাঁ রে, তোরা থাকিস কোথায়? আমাকে একবার ডাকতে পারলি নে? ঘরের মধ্যে আমি কি বেলা ঠাহর করতে পেরেছি? উনুনে এখনও আঁচও পড়ে নি, তোদের দিয়ে কি একটা কাজও হবার নয়? কর্তা বাড়িতে নেই বলে কি তোরা সবাই সাপের পাঁচ-পা দেখেছিস?
গৌরী বললে–তুমি যে ঘুমোচ্ছিলে দেখলুম বউদি, তাই আর ডাকি নি–
প্রীতি রেগে গেল। বললে–আমি ঘুমোচ্ছিলুম? তুই আমাকে ঘুমোতে দেখলি! জানিস খোকা খেতে আসে নি বলে আমি তখন থেকে না-খেয়ে বসে আছি, আর আমি ঘুমোব? আমার ঘুম আসে? চল, ভাঁড়ারের চাবি নে, চাল ডাল বার কর–আমি যাচ্ছি, একবার বউমাকে দেখে এখুনি আসছি–
ওদিকে পরমেশ মৌলিকও চণ্ডীমণ্ডপের কাজ সেরে হারিকেন বাতিটা জ্বালিয়ে সবে আবার হিসেবের খাতায় মন দিতে যাচ্ছে এমন সময় থানা থেকে একজন চৌকিদার এলো দৌড়তে দৌড়তে।
–সেরেস্তাদারবাবু! সেরেস্তাদারবাবু!
বংশী ঢালী চণ্ডীমণ্ডপের পেছনের ঘরখানাতেই তখন রান্না চড়িয়েছিল। থানার চৌকিদারের গলা শুনে সেও চমকে উঠেছে। ছোটবাবু নেই, এই সময়ে আবার থানার চৌকিদার আসে কেন? বাইরে বেরিয়ে দেখলে শুধু থানার চৌকিদার নয়, রেলবাজার থানার দারোগাবাবুও এসেছে।
–কী খবর বংশী? তোর ছোটবাবু কোথায়?
পরমেশ মৌলিকই জবাব দিলে–আজ্ঞে তিনি তো রাণাঘাটের সদরে গেছেন, মামলার দিন পড়েছে কাল–
–কর্তাবাবু?
–তাঁর তো অসুখ। সকাল থেকে মুখে কথা আটকে গেছে। ননী ডাক্তারবাবু দেখছেন। যায়-যায় অবস্থা তাঁর।
–তাহলে আর কে আছে বাড়িতে?
-শালাবাবু আছে, প্রকাশ মামা। তাঁকে ডাকবো?
–না, তাকে দিয়ে হবে না। সে আবার একটা মানুষ নাকি?
তারপর কী ভেবে দারোগা আবার বললে–তা তাঁকেই ডাকো একবার, কথাটা তাঁকেই বলে যাই, খুব জরুরী কথা ছিল–
বংশী ঢালী গিয়ে কর্তাবাবুর ঘর থেকে শালাবাবুকে ডেকে নিয়ে এল। প্রকাশ মামা আসতেই দারোগাবাবু বললে–কেউ যখন বাড়িতে নেই তখন আপনাকেই বলে যাই, সদানন্দ অ্যারেস্ট হয়েছে–
–সদানন্দ? অ্যারেস্ট হয়েছে? সে কোথায়? তাকেই তো আমি সকাল থেকে গরু খোঁজা করেছি, সে খায় নি দায় নি। দিদিও তার জন্যে সারাদিন জলগ্রহণ করে নি, একেবারে উপোস করে রয়েছে। কোথায় ছিল সে?
–কালীগঞ্জে!
–কালীগঞ্জে? কালীগঞ্জে কোথায়?
দারোগাবাবু বললে–কালীগঞ্জের সেই জমিদারের পোড়ো ভাঙা বাড়ির মধ্যে। আরও পাঁচজন ডাকাতদের সঙ্গে ছোটবাবুর ছেলেও ধরা পড়েছে। স্বরূপগঞ্জের ট্রেন ডাকাতির মামলার সব আসামী ওইখানে ছিল। পুরো দলটা একেবারে একসঙ্গে ধরা পড়ে গেছে–
প্রকাশ হতভম্ব হয়ে গেল। এ আবার কী উটকো বিপদ! এখন জামাইবাবু নেই, এখন এসব কে সামলাবে? বললে–তা সদা–সদা কেন ধরা পড়লো? সদাও কি ডাকাতি করেছে নাকি?
.
তা স্বরূপগঞ্জের ট্রেন ডাকাতির কথা নবাবগঞ্জের লোক জানতো। শুধু নবাবগঞ্জ নয়, কেষ্টনগরের ও-অঞ্চলটার সব লোকই অল্পবিস্তর জানতো। তা নিয়ে গ্রামে-গ্রামে আলোচনাও হয়েছিল। সে এক ভীষণ ডাকাতি। স্বরূপগঞ্জ দিয়ে মেল্ ট্রেনটা চলবার সময় হঠাৎ একদিন থেমে গিয়েছিল। রাত তখন কত কে জানে। প্যাসেঞ্জাররা ঘুমে অচৈতন্য। হঠাৎ পিস্তলের গুলির দুমদুম আওয়াজ শুনে সবাই জেগে উঠে ভয়ে থর-থর করে কাঁপতে লাগলো। এমন তো বড় একটা হয় না। যারা সাহসী লোক তারা জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে উঁকি মেরে দেখতে চেষ্টা করলে। কিছুই স্পষ্ট করে দেখতে পেলে না। শুধু দেখলে অন্ধকারে রেল লাইনের ধারে কয়েকজন লোক টর্চ নিয়ে এদিকে-ওদিকে ছুটছে আর গুলি ছোঁড়ার শব্দ হচ্ছে।
তারপর যেন কোন্ কামরা থেকে একটা আর্ত চিৎকার উঠলো।
তার কয়েক ঘণ্টা পরেই আরেকটা ট্রেনে অনেক পুলিস এসে পৌঁছোল। তারা সারা ট্রেনখানাকে তল্লাসী করলে। তারপর ট্রেনটা আস্তে আস্তে এসে দাঁড়ালো স্বরূপগঞ্জে। ততক্ষণে স্টেশনের প্লাটফরমে সেই অত রাত্রে অনেক ভিড় জমে গেছে। পুলিসে-পুলিসে জায়গাটা একেবারে ছেয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত কৌতূহলী প্যাসেঞ্জারদের প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল–ফার্স্ট ক্লাস কামরা থেকে নাকি দেড় লক্ষ টাকা ডাকাতরা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।
