চৌধুরী মশাই যেতে যেতে বললেন–ওসব তুমি খাও বড়কুটুম, তোমার মনে তো কোনও অশান্তি নেই, মামলা-মকর্দমার ঝামেলাও নেই। মামলা-মকর্দমা যে কী ব্যাপার তা তুমিই বা কী বুঝবে আর তোমার দিদিই বা কী বুঝবে–
প্রীতি পেছনে ছিল। বললে–আমি খুব বুঝি। আমিও জমিদারের মেয়ে। বাবা বলতো– সম্পত্তি করবো অথচ মামলা-মকর্দমা করবে না, তা কি হয়!
জামাকাপড় পরে তৈরি হতে বেশি সময় লাগলো না। জুতো জোড়া পরে নিয়ে হাতে কাগজপত্রের পুঁটলিটা নিয়ে চৌধুরী মশাই গাড়ীতে উঠে বসলেন। অন্য সময় হলে কৈলাস গোমস্তা সঙ্গে যেত। কিন্তু সে চলে গেলে কর্তাবাবুকে কে দেখবে?
— দুর্গা দুর্গা, দুর্গা–দুর্গা–
পরম ভক্তিভরে পুব দিককে উদ্দেশ করে কিম্বা হয়ত ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করে তিনি রওনা দিলেন।
গাড়ি চলতে আরম্ভ করলো।
.
চৌধুরী মশাই না থাকলে সেরেস্তাদার পরমেশ মৌলিকই চণ্ডীমণ্ডপের কাজ চালাতো। একেবারে নির্বিকার নির্বিরোধ মানুষ। বাড়ির ভেতরের কোনও ঝঞ্ঝাট-ঝামেলা তার ছিল না। যেমন ঝঞ্ঝাট ছিল কৈলাস গোমস্তার। শুধু হিসেবের খাতাটা নিয়ে কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে ঝিমিয়ে নিত। চৌধুরী মশাই চলে যাবার পর পরমেশ মৌলিকও বাড়িতে গিয়ে খেয়ে নিয়ে একটু দিবানিদ্রা দিয়েছিল। সেরেস্তার কাজে তেমন তাড়া ছিল না সেদিন। বাড়ির কর্তাই যখন বাড়িতে নেই তখন তার কাজেরও তাড়া নেই। চণ্ডীমণ্ডপের সামনেটায় গ্রীষ্মকালে বেশ ছায়া-ছায়া থাকে। কিন্তু শীতকালটাতেই যত বিপদ। বিরাট আতা গাছটার ডালপালার ছায়ায় রোদ এসে ঢোকে না।
পরমেশ মৌলিক চণ্ডীমণ্ডপ থেকে বাইরের দাওয়ায় বসে গায়ে একটু রোদের আঁচ লাগাচ্ছিল। ছোটবাবু নেই তাই পরমেশ মৌলিকের মনটাতেও একটু ছুটির আমেজ!
শালাবাবু হন হন করে বাড়ির ভেতরের দিকে আসছিল। পরমেশ মৌলিককে দেখেই জিজ্ঞেস করলে–হ্যাঁ গো সেরেস্তাদার, সদাকে দেখেছ?
–খোকাবাবু! কই, না তো!
-–দেখ নি? তা দেখবে কেন? তাহলে যে বাড়ির উপকার করা হবে। উপকার করবার সময় তো কেউ নেই, শুধু গায়ে রোদ লাগিয়ে বেড়াচ্ছো!
পরমেশ মৌলিক বললে–কেন? খোকাবাবু খেতে আসে নি?
–তোমার কি বুদ্ধি হে সেরেস্তাদার, খেতেই যদি আসবে তো আমি সারা গাঁ খুঁজে বেড়াবো কেন তাকে?
বলে আর দাঁড়ালো না সেখানে। একেবারে সোজা দিদির কাছে গিয়ে হাজির। বললে– কই, সদা এসেছে দিদি?
প্রীতি ছেলের জন্যে তখনও না-খেয়ে বসে ছিল। বললে–কই না তো–
–তা তুমি খেয়ে নিলে না কেন?
–আমি কী করে খাই বল! বউমাকে বলে কয়ে অনেক কষ্টে এখন খাইয়ে দিলুম। প্রথমে খেতে চাইছিল না। আমি বললুম, আমি শাশুড়ী হই, আমি তোমাকে বলছি, খেলে কোনও দোষ হবে না–
প্রকাশ বললে–দেখেছ কী রকম সতীসাধ্বী বউ এনেছি তোমার! সদাটা একটা আস্ত লক্ষ্মীছাড়া, অমন সতী-সাধ্বী বউ পেয়েছে আর তার এ কি হেনস্তা! বেশ করেছ তুমি খাইয়ে দিয়েছ, তা তুমিও খেয়ে নিলে পারতে? সে লক্ষ্মীছাড়ার জন্যে কতক্ষণ বসে থাকবে শুনি?
–সে খেলে না, আমি মা হয়ে কী করে খাই বল্ দিকিনি!
–আর বাবাজী? বাবাজীর সেবা হয়েছে?
প্রীতি বললে–ওই এক জ্বালা হয়েছে। তখনই তোর জামাইবাবুকে বললুম ও-সব হাঙ্গামা বাড়ির মধ্যে কোর না। অত পারবো না আমি। তো তোর জামাইবাবুর তো বিশ্বাস হলো না, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ হলো। এখন সামলাবার সময় তো সেই আমাকেই একলা সামলাতে হবে–
তারপর একটু থেমে বললে–তা খোকাকে কোথাও পেলি নে তুই?
প্রকাশ বললে–না, হেঁটে হেঁটে আমার পায়ের খিল খুলে গেছে। বারোয়ারিতলা চষে এলাম, নদীর ধারে গেছলুম, ভাবলুম সেখানেই বোধ হয় একলা-একলা শিবের গাজন গাইছে! যা ভাবুক ছেলে তোমার! কী যে এত ভাবনা ওর, তা বুঝতে পারি নে। রাগ করবি যত ইচ্ছে রাগ কর, ভাতের ওপর কেউ রাগ করে? এমন বোকা কেউ আছে? তুমিই বলো না–
–তা আর কোথাও পেলি নে তাকে?
–তারপর গেলাম দক্ষিণ পাড়ার দিকে, গেলাম পশ্চিম পাড়ায়। কোথাও নেই। ওই যে বললুম হেঁটে হেঁটে আমার পায়ের খিল্ খুলে গেছে। শেষকালে আমার ক্ষিদে পেয়ে গেল।
প্রীতি বললে–সে কী রে, এই তো এখুনি ভাত খেয়ে গেলি। তারপর সকালে অতগুলো সরভাজা সরপুরিয়া খেলি, এরই মধ্যে তোর আবার ক্ষিধে?
–তা ক্ষিধের কী দোষ বলো? তুমি আমার মত একটু হেঁটে এসে দেখবে তোমারও চড়চড় করে ক্ষিধে পেয়ে যাবে। বেয়াই মশাই যে কমলালেবু পাঠিয়েছিল, সে তো একটাও চেখে দেখি নি তখন
প্রীতির তখন ওসব কথা ভালো লাগছিল না। বললে–ভাঁড়ার ঘরে সব আছে, যে ক’টা পারিস খেগে যা–
প্রকাশ বললে–আরে আমি কি তাই বলেছি, বলছিলুম কমলালেবুগুলো মিষ্টি না টক সেটা চেখে দেখতে হবে তো
প্রীতি বললে–মিষ্টি হোক টক হোক ও তো আর ফেরত দিতে পারবো না। ও তো দোকানের জিনিস নয়–খেতেই হবে—
বলে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে রইল প্রীতি। সমস্ত বাড়িটা শীতের দুপুরে নিঝুম হয়ে রয়েছে। সকালবেলার কর্মব্যস্ত বাড়িটা তখন ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে বোধ হয় একমনে সন্ধ্যার প্রত্যাশায় ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে। কখন খোকা আসবে তার জন্যে হাঁড়িতে ভাত রাখা আছে। গৌরী গিয়ে রোদে গা দিয়ে একটু ঝিমিয়ে নিচ্ছে। বিষ্ঠুর মাও তখন সারা দিনের কাজের অবসরে একটু গড়িয়ে নেবার আশায় বাড়ির কোনও জায়গায় আড়াল দেখে নিশ্চিন্ত আশ্রয় নিয়ে আত্মগোপন করে আছে।
