দিদি আর রাগ সামলাতে পারলে না। ঝাঁঝিয়ে উঠলো–হ্যাঁ রে, তোর এই এত বয়েস হলো, বুড়ো ধাড়ি হলি, এখনও তোর নোলা গেল না? আমার কি মরবার সময় আছে এখন যে তোকে সরভাজা খেতে দেব?
–তা তোমাকে কে দিতে বলছে? আমাকে বলো না কোথায় রেখেছ, আমি নিজেই নিতে পারবো, তোমায় আর কষ্ট করতে হবে না। আর বেয়াই মশাই কী রকম তত্ত্বটা করলে, ভালো কি মন্দ, একবার পরখ করে দেখতে হবে না?
দিদি হঠাৎ হাতের কাজ ফেলে ভাঁড়ার ঘর থেকে সরভাজা আর সরপুরিয়ার দুটো হাঁড়ি প্রকাশের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। বললে–খা, গেল্–
প্রকাশ বললে–এ কী করলে? এতগুলো দিতে গেলে কেন? এতগুলো কি মানুষে খেতে পারে? তুমি নিজের জন্যে কিছু রাখলে না? জামাইবাবুও তো খাবে–
ওদিকে চৌধুরী মশাই স্নান করে এসে হাজির। বললে–কই রে গৌরী, আমায় ভাত দে–
তারপর প্রকাশের কাণ্ড দেখে অবাক। বললেন–এগুলো কী খাচ্ছো?
প্রকাশ বললে–এই দেখুন না জামাইবাবু, এত সরপুরিয়া সরভাজা কেউ খেতে পারে? এই দু’হাঁড়ি? শীতের তত্ত্ব এসেছে বেয়াইবাড়ি থেকে, এ তো একলা আমাকে দেয় নি। আপনি খাবেন, দিদি খাবে, সদা খাবে, বউমা খাবে। তা নয়, দিদি সব আমাকে দিয়ে গেল–
চৌধুরী মশাই-এর তখন তাড়া ছিল। সদর থেকে উকিলবাবু জরুরী তলব দিয়েছে। মামলা আছে সেখানে। রজব আলি গাড়ি নিয়ে তৈরি। খেয়ে উঠেই রওনা দেবেন তিনি।
গৌরী ভাতের থালা দিয়ে গেল। প্রীতি এসে বললে–খাক খাক, ও পছন্দ করে বউ এনে দিয়েছে, ওই-ই খাক্–
কিন্তু এসব কথা নিয়ে আলোচনা করার মত সময় তখন ছিল না চৌধুরী মশাই-এর। তাড়াতাড়ি খেতে লাগলেন। তারপর যখন দেখলেন বাইরের কেউ নেই তখন জিজ্ঞেস করলেন–সদা কোথায়? সদা সেই সকালবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল আর বুঝি আসে নি?
প্রীতি বললে—না–
–আর বউমা কী বলছেন? কুটুমবাড়ির লোককে এখানকার ব্যাপার কিছু বলে নি তো?
প্রীতি বললে–বউমা না বললেই বা, কিন্তু তুমি এমন হইচই করলে তাতেই তো তারা সব জেনে গেল
–কী রকম?
–তোমার তো মাথা গরম হলে আর কাণ্ডাকাণ্ডি জ্ঞান থাকে না, তুমি এমন চেঁচাতে লাগলে যে পাশের বাড়ির লোকও সব জেনে ফেললে।
চৌধুরী মশাই খেতে খেতে বললেন–বেহারি পাল তার আগেই যে সব কর্তাবাবুকে বলে গেছে। সেই জন্যেই তো এত ডাক্তার–ওষুধের হিড়িক হলো।
কৈলাস গোমস্তা সবই বলেছে আমাকে–
প্রীতি বললে–সে তো তোমারই দোষ। আমি তো আর বাড়ি বয়ে ভেতরের ব্যাপার কাউকে বলতে যাই নি–আমার সেরকম স্বভাবও নয়। তুমি নিজেই সকলকে বলে বেড়াবে আর নিজেই আবার আমাদের সাবধান করে দেবে–
চৌধুরী মশীই এ কথার কোনও জবাব না দিয়ে বললেন–তা আজকে কী করবো?
–কীসের কী?
–আজকে তো রাত্তিরে আমি থাকছি নে। কাজকর্ম মিটিয়ে রাণাঘাট থেকে কোর্টকাছারি করে ফিরে আসতে সেই পরশু গড়িয়ে যাবে–আজ যদি খোকা বাড়িতে আসে তো আজকে সে কোথায় শোবে?
প্রীতি বললে–সে তোমাকে ভাবতে হবে না, তুমি নিজের কাজ করো গে যাও। কালই বা তুমি কী করেছিলে? তুমি তো ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে লাগলে। যা কিছু করবার তা আমি আর প্রকাশই তো করলুম–
–তা তুমি কি বলতে চাও আমার ভাবনা হয় না? আমি জমি-জমা নিয়ে ভাবি বলে ছেলে-বউএর ব্যাপার কি আমার নিজের ব্যাপার নয়? এত জমি-জমা তাহলে কার জন্যে করছি? এত মামলা-মকর্দমার ঝামেলাই বা কার জন্যে? আমি আর কদিন? আমি যখন থাকবো না তখন এসব কে দেখবে? আমার যা কিছু সব তো ওই ছেলের জন্যেই। ছেলে মানুষ হলো কি অমানুষ হলো তা আমি ভাববো না তো কে ভাববে? এই যে আমি রাণাঘাটে যাচ্ছি, তা সেখানে গিয়েই কি আমি শান্তি পাবো মনে করছো? আমার মন কেবল পড়ে থাকবে এখানে। রাত্তিরে সেখানে শুয়ে শুয়েও মনে পড়বে খোকা কী করছে, খোকা কোথায় শুয়েছে। খোকার সঙ্গে বউমার ভাব হলো কি না, এই সবই ভাববো। মামলার ব্যাপার যা-কিছু উকিলবাবু করবে, আমি তো এখানকার কথা ভেবেই সারাদিন সারারাত ছটফট করবো…
খাওয়া তখন হয়ে এসেছিল। তিনি উঠছিলেন।
প্রীতি বললে–এ কী? তুমি উঠলে যে? দুধ খাবে না?
–না, খাওয়া-দাওয়া এখন আমার মাথায় উঠেছে। ছেলের একটা ব্যবস্থা না করতে পারা পর্যন্ত আমার খেয়েও সুখ নেই–
প্রীতি বললে–ছেলের কথা তোমায় আর অত ভাবতে হবে না। আমি তো বলছি, সে ভার আমাদের ওপর তুমি ছেড়ে দাও। আমি আছি, প্রকাশও রইল। আমরা দুজনে যাহোক একটা ব্যবস্থা করবোই। ওই তো প্রকাশ বলছিল, কোন্ সাধুর কাছ থেকে একটা বশীকরণ মাদুলি নাকি ও এনে দেবে–
–মাদুলি তোমার ছেলে পরবে? খোকা কি সেই রকম ছেলে তোমার?
–খোকা কেন মাদুলি পরবে? বউমাকে পরিয়ে দেব। সে যা-হোক আমরা একটা ব্যবস্থা করবোই। তুমি দুধটা খেয়ে নাও, এখন তো দু-তিন দিন আর দুধ-ঘি কিছুই জুটবে না–
চৌধুরী মশাই দুধটা চোঁ-চোঁ করে চুমুক দিয়ে খেয়ে নিয়ে বললেন–ও সাধু-সন্নিসী মাদুলি-তাবিজের ওপর আমার আর বিশ্বাস নেই। আমার খুব শিক্ষা হয়ে গেছে।
এতক্ষণ প্রকাশের কানে এসব কথা যায় নি। জামাইবাবুকে উঠতে দেখেই খেয়াল হলো। বললে–এ কি, আপনি সরভাজা সরপুরিয়া খেলেন না জামাইবাবু? বেয়াই মশাই এত খরচ-পত্তোর করে তত্ত্ব পাঠালেন আর আপনি একটা মুখে দিলেন না–যাবার আগে অন্তত একটা সরভাজা চেখে দেখুন–
