চৌধুরী মশাই যেন আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন–তত্ত্ব এসেছে? কীসের তত্ত্ব? শীতের?
প্রকাশ মামা বললে–হ্যাঁ জামাইবাবু, আমি নিজে দেখেছি যে। সদার কাপড়-জামা, কমলালেবু, কপি, কড়াইশুটি, সরপুরিয়া, সরভাজা–
বিপিনের দলের লোকেরা এতক্ষণ সব শুনছিল। বিপিন নয়নতারার দিকে চেয়ে দেখলে। দিদিমণির মুখটা যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। জিজ্ঞেস করলেও কা’র গলা দিদিমণি?
নয়নতারা এর কী উত্তর দেবে! তার যেন তখন লজ্জায় অপমানে মাথা কাটা গেছে।
কিন্তু তাকে আর এ প্রশ্নের জবাব দিতে হলো না তখন।
বিপিন তখনি আবার জিজ্ঞেস করলে বাড়িতে কে আছে দিদিমণি? তার ত্রিশূল বুঝি জামাইবাবু নিয়ে গেছেন?
হঠাৎ শাশুড়ী ঘরে ঢুকলো। বললে–এসো বাবা, তোমরা খাবে এসো, তোমাদের খাবার দেওয়া হয়েছে–
বিপিন দিদিমণির শাশুড়ীকে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতেই বললে–থাক থাক বাবা, সব ভালো খবর তো তোমাদের?
ভেতর-বাড়িতে রান্না বাড়ির বারান্দায় সার সার আসন পেতে কুটুমবাড়ির লোকজনদের পেট-ভরা খাওয়াবার আয়োজন হয়েছিল। লুচি বেগুনভাজা থেকে শুরু করে ডাল মাছ দই মিষ্টি কিছুই বাদ নেই। যারা কুটুমবাড়িতে তত্ত্ব নিয়ে এসেছে তাদের খাওয়ার অধিকার আছে। গৌরী পরিবেশন করছিল আর প্রীতি তদারক।
বিপিন খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলে–জামাইবাবু কোথায়, তাঁকে তো দেখছি নে। সেবারে পণ্ডিতমশাই এসেছিলেন, তিনিও জামাইবাবুকে দেখতে পান নি, আসবার সময় বলে দিয়েছিলেন জামাইবাবুর সঙ্গে দেখা করতে–
প্রীতি বললে–তা খোকা তো বাড়িতে নেই এখন, মামলার কাগজপত্র নিয়ে সে রানাঘাটে গেছে উকিলবাবুর সঙ্গে দেখা করতে–
কথাটা শুনে বিপিন যেন কেমন একটু বিভ্রান্ত হয়ে গেল। দিদিমণি এক রকম বললে, দিদিমণির শাশুড়ী একরকম বললে, আর দিদিমণির শ্বশুরের আর একরকম কথা।
চৌধুরী মশাই অনেকক্ষণ পরে এলেন। বিপিনদের তখন খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেছে। হাত-মুখ ধুয়ে পান খাচ্ছে।
–বেয়াই মশাই কেমন আছেন?
–আজ্ঞে, ভালোই আছেন।
–তোমাদের পেট ভরেছে তো?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, খুব খেয়েছি। তাহলে আসি আমরা–
আর একবার প্রণাম করে তারা বিদায় নিচ্ছিল। যাবার আগে বিপিন বললে–সকলের সঙ্গেই দেখা হলো আজ্ঞে, শুধু জামাইবাবুর সঙ্গেই দেখা হলো না–
চৌধুরী মশাই বললেন–সে তো সকালে ছিল বাড়িতে, এই তোমরা আসবার কিছুক্ষণ আগে মাঠে গেছে ছোলা দেখতে। এবারে পাঁচশো বিঘে জমিতে ছোলা বোনা হয়েছে কি না, নিজেরা না দেখলে কে দেখবে, তাই…
বিপিন আরো অবাক হয়ে গেল। সমস্ত জিনিসটার পেছনে যেন একটা রহস্য মেশানো রয়েছে। একই বাড়ির লোক এক-এক রকম কথা বলে কেন? তবে কি কেউই জামাইবাবুর সঠিক খবর রাখে না?
বিপিনরা চলে যাবার পর প্রকাশ ছুটতে ছুটতে এসে চৌধুরী মশাইএর সামনে দাঁড়ালো। বললে–এই দেখুন জামাইবাবু, আপনি বলছিলেন সদা বাবাজীর ত্রিশূল নিয়ে পালিয়েছে, এই তো বাড়িতেই ত্রিশূল রয়েছে, আমি খুঁজে বার করলুম–
চৌধুরী মশাই বললেন–কোথায় ছিল?
–শশী কয়াল আমাকে দিলে। মরাই-এর পাশে পড়ে ছিল।
–তা ওখানে ওটা কে নিয়ে গেল?
প্রকাশ বললে–কে নিয়ে গেল কে জানে! হয়ত ভূতে নিয়ে গেছে। ভূত প্রেতদের চটিয়ে দিয়েছেন বাবাজী, তারা কি অত সহজে বাগ মানে? যাবার সময় হয়ত এই হাতিয়ারাটা সামনে পেয়ে তুলে নিয়ে গেছে।
ত্রিশূলটা নিয়ে চৌধুরী মশাই বাবাজীর ঘরের দিকে চলতে লাগলেন। প্রকাশও পেছন পেছন চলছিল। সে বললে–আপনি মিছিমিছি সদার নামে দোষ দিলেন….
–তুমি থামো, তুমি আর অত ফ্যাচফ্যাচ কোর না। ফ্যাচফ্যাচ করা আমার ভাল লাগে না। আমি মরছি আমার নিজের জ্বালায়, আর এই সময়ে কিনা কর্তাবাবুর অসুখ, কুটুমবাড়ির তত্ত্ব, বাবাজীর ত্রিশূল, ছেলের বেয়াড়াপনা, সদরের মামলা, সব একেবারে পঙ্গপালের মত পেছনে তাড়া করতে হয়–
বলতে বলতে দু’জনেই বাবাজীর ঘরের মধ্যে ঢুকলেন। কিন্তু বাবাজী তখন চোখ বুজে জপ করছেন। একেবারে ধ্যানস্থ। বাহ্যজ্ঞানশূন্য। কোনও পার্থিব দিকে তাঁর আর মনোযোগ নেই। ধ্যানযোগে তখন হয়ত তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অলৌকিক-লোকে বিচরণ করছেন।
চৌধুরী মশাই আর প্রকাশ মামা যেমন ঘরে ঢুকেছিলেন তেমনি আবার বেরিয়ে এলেন। বাবাজীর ধ্যান ভাঙাতে আর ইচ্ছে হলো না।
.
একদিনের মধ্যেই বাড়িতে যেন ঝড় বয়ে গেল। কুটুম্বিতা, আতিথেয়তা, অসুখ আর ঝামেলার ঝড়! আসলে বলতে গেলে ঝড় শুরু হয়েছিল সেই সদানন্দর গায়ে-হলুদের দিন থেকেই। তারপর থেকে এই ঝঞ্ঝাটের আর যেন কামাই নেই। চৌধুরী মশাই আর প্রীতির যেন মাথা খারাপ হবার যোগাড়।
একলা প্রকাশ কোন্ দিক সামলাবে! তাকে একবার ডাক্তারবাড়ি যেতে হচ্ছে, আর একাবার সদানন্দকে সামলাতে হচ্ছে। তারও ঘুম হয় নি সারারাত। অন্ধকার বারান্দায় সারারাত সদার ঘরের দরজার সামনে ঠাণ্ডা মেঝের ওপর শুয়ে কি কারো ঘুম আসে!
ডাক্তারবাড়ি থেকে ওষুধটা কোনও রকমে কর্তাবাবুর ঘরে ফেলে দিয়ে এসেই একেবারে সোজা রান্নাঘরে ছুটে এসেছে। এসেই বললে–কই দিদি, আমাকে সরভাজা দিলে না যে?
দিদি তখন রান্নার তদারকে ব্যস্ত ছিল। কথাটা শুনে ঝঙ্কার দিয়ে উঠলো–আমার এখন দেবার সময় নেই–পরে দেব’খন
–তার মানে? পরে তো খাবোই। এখন একটু চেখে দেখবো, তাও দেবে না?
