প্রকাশ মামা ননী ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে এসে কাণ্ড দেখে অবাক। বললে–কী হে, তত্ত্ব নিয়ে এসেছ? বাঃ বাঃ, বেয়াই মশাই তো কাজের লোক দেখছি, সব দিকে খেয়াল আছে। সরপুরিয়া সরভাজাও তো রয়েছে দেখছি–
আর থাকতে পারলে না। সোজা চলে গেল ভেতর বাড়ির দিকে। দিদি–ও—দিদি—
এমন সুখবরটা দিদিকে না দিতে পারলে যেন তার পেটের ভাত হজম হচ্ছিল না। কিন্তু দিদি তখন সেখানে নেই। প্রীতি তখন বউমার কাছে গিয়ে খবরটা দিচ্ছিল। বলছিল–তোমার বাবা তত্ত্ব পাঠিয়েছেন বউমা, শীতের তত্ত্ব। তারা বোধ হয় তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে–তার আগে তুমি ওই শাড়িটা বদলে একটা ভালো শাড়ি পরে নাও, আয়নাতে মুখ-টুখ দেখে পরিষ্কার হয়ে নাও
কথাটা শুনে নয়নতারা যেন অন্য মানুষ হয়ে গেল। বাবা পাঠিয়েছে? তা হলে কি বিপিন এসেছে নাকি!
শাশুড়ী আবার বললেন–দেখো বউমা, তুমি যেন এসব কেলেঙ্কারির কথা ওদের বোল না, বুঝলে?
নয়নতারা আর কী বলবে! বাবা শীতের তত্ত্ব পাঠিয়েছে! সমস্ত রাত্রের যা-কিছু গ্লানি সব যেন এক মুহূর্তে মুছে গেল তার মন থেকে। সকাল থেকে বাড়িতে যা-যা কাণ্ড ঘটেছে, তাও যেন আর মনে রইল না। বাবা তত্ত্ব পাঠিয়েছে! নয়নতারা যেন এতক্ষণে একটা আশ্রয় খুঁজে পেলো। তাহলে তো সে একেবারে নিঃস্ব নয়, একেবারে নিঃসহায়, নিরাশ্রয় নয়। একটা জায়গা তো তার এখনও আছে, সেখানে গিয়ে দাঁড়ালে তার একটা মাথা গোঁজবার আশ্রয় আছে। মা চলে গেলেও তো একেবারে নিঃস্ব হয়ে যায় নি সে।
তাড়াতাড়ি আয়নার সামনে গিয়ে নয়নতারা শাড়ির আঁচলটা দিয়ে মুখটা মুছে নিলে। রাত জাগার পর চোখের তলায় কেমন একটা কালো দাগ পড়েছিল। সেখানটায় একটু পাউডার ঘষে নিলে। তারপর ঘরের এক কোণে গিয়ে একটা নতুন শাড়ি পরে নিলে। বাপের বাড়ির লোকদের বুঝতে দিতে হবে যে সে এখানে সুখে-শান্তিতে আছে, তার কোনও কষ্ট নেই। শ্বশুর-শাশুড়ী তাকে খুব আদরে-যত্নে রেখেছে।
বাইরে থেকে গলা শোনা গেল–দিদিমণি—
নয়নতারা তাড়াতাড়ি ভেজানো দরজাটা খুলে দিয়ে ডাকলে–এসো, এসো–
পাঁচজন লোক একসঙ্গে গিয়ে ঘরে ঢুকলো। তাদের সকলের আগে বিপিন। বিপিন একেবারে হাসতে হাসতে নয়নতারার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। জিজ্ঞেস করলে–কেমন আছো দিদিমণি–
–ভালো। তোমরা ভালো?
–হ্যাঁ দিদিমণি।
–বাবা? বাবা কেমন আছে?
–পণ্ডিতমশাই মুখে তো ভালো আছেন বলেন। কিন্তু তুমি আসার পর থেকে মনটা কেমন উড়ুউড়ু হয়ে গেছে। সে-মানুষ আর নেই। তারপর অত বড় একটা শোক-তাপ গেল। আমরা হলে তো ভেঙে পড়তুম দিদিমণি। নেহাৎ পণ্ডিতমশাই দিনরাত কাজ নিয়ে। থাকেন বলে তবু শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়ে আছেন–
–কিন্তু এসব তত্ত্ব-টত্ত্বর ব্যবস্থা কে করলে? বাবা একলা সব করতে পারলো?
–তিনি একলাই করলেন। আর দোকলা কে আছে যে করে দেবে!
–বাবার খাওয়া-দাওয়ার কী হচ্ছে?
–ওই যে বামুন মেয়েটা আছে। সে-ই রান্না করে দিয়ে চলে যায়। আর বাবুর তো খাওয়া!
বলতে বলতে বিপিনের কী যেন সন্দেহ হলো। বললে–তোমার মুখটা কেমন শুকনো শুকনো দেখছি, তোমার শরীর ভালো আছে তো দিদিমণি?
নয়নতারা মুখে একটা হাসি ফোঁটাবার চেষ্টা করে বললে–আমি? আমার আবার কী হয়েছে যে খারাপ থাকবো? শ্বশুর-শাশুড়ীর এত আদর পাচ্ছি, খারাপ থাকবো কেন?
–আর জামাইবাবু? জামাইবাবুকে যে দেখছি না? জামাইবাবু কোথায়?
আবার সেই ব্যথার জায়গাটাতেই ঘা দিলে বিপিন। কিন্তু নয়নতারা মুখের হাসিটা সেই একই ভাবে মুখে ধরে রেখে বললে–এই তো এখুনি ছিলেন, বাড়িতেই কোথাও আছেন বোধ হয়–
হঠাৎ বাইরে যেন কী একটা গোলমালের আওয়াজ হলো। কে যেন চিৎকার করে উঠলো কোথায় গেল খোকা? গেল কোথায়? দিন-দিন এরকম বেয়াড়াপনা করে তো আমার ইজ্জৎ থাকে? কথাগুলো যিনি বললেন তিনি যেন খুব রেগে গেছেন বলে মনে হলো। গলার আওয়াজে যেন সমস্ত বাড়িটা গমগম করে উঠলো।
বিপিনের সঙ্গে যারা এসেছিল আওয়াজটা তাদের সকলের কানেই গেল। তারা সবাই শুনতে লাগলো কথাগুলো। বাইরে তখনও গোলমাল চলেছে। কে একজন যেন মেয়েলী গলায় জিজ্ঞেস করলেকী, হলো কী আবার? তুমি অত রেগে গেলে কেন?
–রাগবো না? তোমরাই তো ছেলেকে আদর দিয়ে একেবারে মাথায় তুলেছ! তুমি আর ওই প্রকাশ! কেন? ছেলের বিয়ে হয়ে গিয়েছে বলে ভেবেছে সে যা ইচ্ছে তাই করবে? আমি তাকে কিছু বলতেও পারবো না?
–তুমি চুপ করো। একটু আস্তে আস্তে কথা বলতে পারো না? অত চেঁচাবার কী আছে?
–বেশ করবো চেঁচাবো। আমি ননী ডাক্তারকে নিয়ে ওপরে বাবাকে দেখাতে গেছি, আর এদিকে বাবাজীর ত্রিশূলটা সরিয়ে নিয়ে সে চলে গেছে–
ততক্ষণে প্রকাশ এসে ঢুকলো। প্রকাশ ননী ডাক্তারের ব্যাগ নিয়ে বাড়িতে পৌঁছিয়ে দিতে গিয়েছিল। ফিরে এসে কাণ্ড দেখে অবাক। বাবাজীর ঘরে সিঁদুর মাখানো ত্রিশূলটা ছিল সেটা নাকি সদা আবার সরিয়ে নিয়ে চলে গেছে।
চৌধুরী মশাই বলে উঠলেন–এ তো তোমাদেরই দোষ! আমি সদাকে ঘরের ভেতর পুরে তালা-চাবি বন্ধ করে রেখে দিলুম আর তোমরাই তাকে ছেড়ে দিলে! এখন কোথায় গেল সে? সে গেল কোথায়?
কথার মাঝখানেই বাধা দিলে প্রীতি। বললে–ওগো, তোমার পায়ে পড়ি, তুমি চুপ করো, কুটুমবাড়ি থেকে তত্ত্ব নিয়ে লোক এসেছে, তাদের সামনে আর কেলেঙ্কারি কোর না। ওরা চলে যাক, তখন যত ইচ্ছে ছেলেকে গালমন্দ করো–তার ওপর বউমা রয়েছে। বাড়িতে, বউমা কী ভাবছে বল দিকিনি। তোমার কি একটা আক্কেল বলে কিছু থাকতে নেই?
