জামাইবাবুর এরূপটা প্রকাশের দেখা আছে। যখন প্রকাশকে দিয়ে কোনও জরুরী কাজ করাতে হবে তখন জামাইবাবুর মুখে এই আদরের বড়কুটুম শব্দটা বেরিয়ে আসে।
প্রকাশও জামাইবাবুর কথায় গদগদ হয়ে গেল। বললে–আপনি কিছু ভাববেন না জামাইবাবু, আমি এখখুনি যাচ্ছি, যাবো আর আসবো। প্রকাশ থাকতে আপনার কিছু ভাবনা করবার দরকার নেই–এই আমি চললুম–
বলে প্রকাশ বেরিয়ে চলে গেল।
প্রীতি পাশের বারান্দায় গিয়েই দেখলে, খোকার ঘর থেকে সামনের বারান্দায় বউমা এসে দাঁড়িয়ে আছে। ঘোমটায় মাথাটা ঢাকা। কিন্তু ফাঁক দিয়ে মুখের যেটুকু অংশ দেখা যাচ্ছে তাতে বোঝা যায় বউমার চোখ-মুখ যেন শুকিয়ে গেছে। একটুখানি শুধু মা ডাক! কিন্তু ওই ডাটুকুতেই যেন প্রীতি আবার অন্য মানুষ হয়ে গেল। এতক্ষণ যে-মানুষটার স্বামীর সঙ্গে নির্লজ্জের মত ঝগড়া করতে বাধে নি সেই মানুষটাই যেন একেবারে স্নেহ মমতা করুণায় এক মুহূর্তে জননীতে রূপান্তরিত হয়ে গেল। বউমার কাছে গিয়ে বললে– কী বউমা, আমাকে ডাকছিলে?
নয়নতারা তেমনি মুখটা নিচু করেই রইল। যেন তার মুখের কথাটা খানিকক্ষণের জন্যে মুখেই আটকে রইল। তারপর যেন অনেক কষ্টে তার মুখ দিয়ে কথা বেরোল। বললে–মা, বলছিলাম কি, আমাকে আমার বাবার কাছে পাঠিয়ে দিন না—
প্রীতি বললে–ছি মা, ওকথা কি বলতে আছে? এতক্ষণ দেখলে না তোমার শ্বশুর তোমার কথা ভেবে ভেবে কী রকম মাথা গরম করে ফেলেছেন। তোমার কানে তো সব কথাই গেছে। ও নিয়ে তুমি কিছু ভেবো না, তোমার শ্বশুরের ওই এক স্বভাব, রেগে গেলেন তো গেলেন, তখন একেবারে অগ্নিকাণ্ড, আবার ওই মানুষটাই অন্য সময় একেবারে জল। ওঁর কথায় তুমি কান দিও না বউমা, ওঁর কথায় যদি আমি কান দিতুম তো আমিই কোনদিন বাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়ি পালিয়ে যেতুম। এ বাড়ির সব পুরুষমানুষই ওই রকম। ও-সব কথায় কান দিলে কি সংসার চলে বউমা! শ্বশুরকে আজ যেমন দেখলে, উনি আমার সঙ্গেও ঠিক তেমনি করেন। রাগলে এবাড়ির পুরুষমানুষদের কোনও দিকে আর জ্ঞান থাকে না–
নয়নতারা বললে–কিন্তু আমাকে নিয়েই যখন এত অশান্তি, তখন আমি চলে গেলেই আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি কিছুদিনের মত চলে যাই না, তারপর যখন বাবার রাগ পড়বে না-হয় আবার ফিরে আসবো–
–না না বউমা, তা হয় না, তুমি পাগলামি কোর না, তুমি ঘরে গিয়ে একটু বোস, আমি রান্নাঘরের দিকটা একবার দেখে আসি, আমি যেদিকে দেখব না সেই দিকেই তো চিত্তির হয়ে যাবে–
বলে বাইরে এসে বিষ্ণুর-মার খোঁজে রান্নাবাড়ির দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ দীনু মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। বললে–মা, বউমার বাপের বাড়ি থেকে লোক এসেছে তত্ত্ব নিয়ে–
–তত্ত্ব? কীসের তত্ত্ব?
–শীতের তত্ত্ব!
কথাটা শুনেই প্রীতির মাথাটা আবার গরম হয়ে উঠলো। আর সময় পেলেন না বেয়াই মশাই তত্ত্ব পাঠাবার! ঠিক এই সময়েই কি না তত্ত্ব পাঠাতে হয়!
২.৭ নয়নতারার সুখ
কালীকান্ত ভট্টাচার্যের সব দিকে নজর। সব জিনিস সহজ করে নিতে পারার মত মনের ধৈর্য ছিল বলেই হয়ত এত বড় শোকের মধ্যেও মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে শীতের তত্ত্ব পাঠাবার কথাটাও ভাববার সময় পেয়েছেন। ভেবেছিলেন তাঁর নিজের যাই হোক, মেয়ের শ্বশুর শাশুড়ীর কাছে অন্তত মেয়ের আদর হোক। নয়নতারার সুখ থাকলেই তাঁর সুখ।
নিখিলেশদেরও তাই বলতেন। বলতেন–আমার যা-কিছু আছে সবই তো নয়নতারার। বড়লোকের বাড়িতে সে পড়েছে, তাদের মর্যাদামত তত্ত্ব করতে হবে তো–
নিখিলেশই বলতে গেলে বাজার করে দিয়েছিল। কালীকান্ত ভট্টাচার্য তাকে বলে দিয়েছিলেন–যা কিছু কিনবে সব যেন বাজারের সেরা জিনিস হয়, বুঝলে? একেবারে সেরা সরপুরিয়া, একেবারে সেরা সন্দেশ, সেরা জামা কাপড়–
কালীকান্ত ভট্টাচার্যের নিজের ও-সব শখ-শৌখীনতার বালাই ছিল না কোনও কালে, তিনি একজোড়া চটি, একখানা ধুতি আর একটা উড়ুনি দিয়েই জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন। জামা আছে। কিন্তু সে-জামা পরবার প্রয়োজন তেমন অনিবার্য হয় না কখনও। সেইজন্যেই নিখিলেশকেই ডেকে পাঠিয়েছিলেন বাড়িতে। তাকে সব বললেন। বললেন–মেয়ের শ্বশুর শাশুড়ী যেন না ভাবে যে মেয়ের মা নেই বলে বেয়াই মশাই শীতের তত্ত্বটাও বাদ দিলে।
তারপর বললেন–তুমি তো কলকাতায় যাও, সেখান থেকে সেরা দোকান থেকে গরম কাপড় কিনে সেরা দর্জিকে দিয়ে পাঞ্জাবি করিয়ে নিয়ে আসবে–
নিখিলেশ তাই-ই করিয়েছিল। কোনও খুঁত রাখে নি সে। মাস্টার মশাই-এর কথাটা মনে ছিল তার–টাকা যত লাগে তুমি চেয়ে নিও আমার কাছ থেকে। টাকার জন্যে যেন জিনিস খারাপ কোর না। একেবারে সরেশ জিনিস চাই। নবাবগঞ্জের লোক যেন তত্ত্ব দেখে বলে– হ্যাঁ, তত্ত্বের মতন তত্ত্ব পাঠিয়েছে চৌধুরী মশাই-এর বেয়াই—
কিন্তু তিনিই কি জানতেন, তাঁর অত কষ্টের টাকায় পাঠানো তত্ত্বর এমন হেনস্তা হবে। বিপিন প্রামাণিক ছাড়া কালীকান্ত ভট্টাচার্যের তত্ত্ব নিয়ে আসবার আর কে আছে। বিপিনই যোগাড় করেছিল আরও চারজন লোক। একজনের মাথায় দই রাবড়ি, একজনের মাথায় সরপুরিয়া সরভাজার থালা, একজনের মাথায় কমলালেবু ফুলকপি কড়াইশুটি ইত্যাদির ঝুড়ি, একজনের হাতে বিশ সের ওজনের একটা রুই মাছ, আর একজনের মাথায় জামা কাপড় শাড়ি এই সব।
