চৌধুরী মশাই তখনও প্রকাশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে ব্যস্ত। বললেন–তুমি আমাদের ব্যাপারে কেন মাথা ঘামাতে আসো শুনি? তোমার নিজের বাড়ি-ঘর-দোর নেই?
প্রকাশ বললে–আমি তো যেতে চাই-ই। আমার ছেলে-মেয়ে বউ সেখানে পড়ে রয়েছে, আমি তো যেতেই চাই সেখানে–
–তা যাচ্ছো না কেন–গেলেই তো পারো? আপদ চোকে–
–কিন্তু দিদি যে আমাকে যেতে দেয় না। সদানন্দর বিয়ের পরই তো আমি যেতে চেয়েছিলুম, কিন্তু দিদিই তো আমাকে আটকে রাখলে।
চৌধুরী মশাই বললেন–দিদি কে? এ আমার বাড়ি, আমি এ বাড়ির মালিক। আমি বলছি তুমি এখান থেকে চলে যাও তুমি কেন এখানে বসে বসে আমার অন্ন-ধ্বংস করছো–
প্রকাশের মতন হ্যাংলা মানুষেরও বোধ হয় মান-অপমান জ্ঞান আছে। নইলে জামাইবাবুর কথায় সেই বা অমন হঠাৎ চুপ হয়ে যাবে কেন? এতক্ষণ তার মুখের যা-চেহারা ছিল তা যেন হঠাৎ এই কথাগুলোয় চুপসে গেল। সে মুখ চুন করে একপাশে গিয়ে দাঁড়ালো। এতগুলো বাড়ির লোকের সামনে এত বড় অপমান তার জীবনে আর কখনও ঘটে নি।
শুধু একবার বললে–তাহলে ননী ডাক্তারকে ডাকতে যাবো না?
এত কাণ্ডের মধ্যে চৌধুরী মশাই-এর বোধ হয় মাথার ঠিক ছিল না। প্রকাশের কথায় যেন মনে পড়ে গেল। বললেন–তা ডাক্তারের কাছে যেতে কি আমি তোমাকে বারণ করেছি? আগে ডাক্তারের কাছে যাও–
প্রকাশ বললে–তা আপনি যে এখখুনি আমায় বাড়ি থেকে চলে যেতে বললেন?
চৌধুরী মশাই বললেন–তুমি দেখছি বড় বে-আক্কেলে মানুষ। ডাক্তারকে ডেকে দিয়ে নিজের দেশে চলে যাওয়া যায় না? ডাক্তারকে ডেকে দিয়ে খেয়ে-দেয়ে দুপুরের গাড়িতে চলে যেও–
এতক্ষণে প্রীতির কানে কথাগুলো গেছে। সে এগিয়ে এল। বললে–কী হলো? কাকে যেতে বলছো? কে বাড়ি থেকে চলে যাবে?
প্রকাশ মুখ কাঁচুমাচু করে বললে–জামাইবাবু আমাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলছেন
–কেন? প্রকাশ চলে যাবে কেন?
এতক্ষণ হঠাৎ চৌধুরী মশাই-এর নজরে পড়লো ঘরের দরজাটা খোলা। ভেতরে চেয়ে দেখলেন খোকা নেই।
বললেন–খোকা কোথায় গেল?
প্রীতি বললে–তাকে আমি ছেড়ে দিয়েছি
–ছেড়ে দিয়েছ মানে? কোথায় গেল সে?
–কোথায় গেল তা আমি কী জানি!
চৌধুরী মশাই বললেন–তুমি কেন দরজার চাবি খুলে দিতে গেলে? আমি নিজে তাকে তালাবন্ধ করে দিয়ে গেলুম তবু তুমি তাকে দরজা খুলে বার করে দিলে কেন?
প্রীতি বললে–বেশ করেছি–
চৌধুরী মশাই স্তম্ভিত হয়ে স্থানুর মত সেইখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর যেন একটু সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বললেন–তুমি এই কথা বললে?
প্রীতি বললে–বলবো না? কেন তুমি এত বড় সেয়ানা ছেলেকে সকলের সামনে এমন অপমান করলে? তার এখন বয়েস হয়েছে, তার বিয়ে হয়েছে, ঘরে তার নতুন বউ রয়েছে, এই সময়ে তুমি এমন করে তার ইজ্জৎ নিলে, আর আমি তালা খুলে দেব না?
চৌধুরী মশাই বললেন–তার ইজ্জৎ? তার ইজ্জতের কথাটাই তুমি ভাবলে? আর আমি? আমি এবাড়ির মালিক, আমার ইজ্জতের কথাটা তো একবারও ভাবলে না? তোমার কাছে তোমার ছেলের ইজ্জৎটাই বড় হলো?
প্রকাশ কী করবে তখনও বুঝতে পারছে না। একবার জামাইবাবুর মুখের দিকে চাইছে আর একবার দিদির মুখের দিকে। চৌধুরী মশাই রাগে ফুলছেন। দিদির সঙ্গে জামাইবাবুর এমন ঝগড়া আগে কখনও প্রকাশ দেখে নি। দিদিও বলছে বেশ করেছে সদানন্দকে ঘর থেকে বার করে দিয়েছে, জামাইবাবুও বলছে–কেন তালা খুলে দিলে! তাহলে কি জামাইবাবুর কথার কোনও দাম নেই?
জামাইবাবু মাঝখানে বলে উঠলো–তাহলে আমি যদি এ বাড়ির কেউই না হই তো হয় আমি এবাড়ি ছেড়ে চলে যাই, আর নয় তো তুমিই চলে যাও–
দিদি বললে–তুমি কেন যাবে? তুমি কী দোষ করেছ? যেতে হলে আমিই যাবো। আমাকে তুমি বাবার কাছে পাঠিয়ে দাও, আমি যে কটা দিন বাঁচি সেখানেই থাকবো সারাদিন তুমি নিশ্চিন্তে তোমার জমি-জমা বউ-ছেলে নিয়ে আরাম করে কাটাবে–কেউ আর তখন তোমাকে কথা শোনাতে আসবে না–
চৌধুরী মশাই বললেন–ওটা তো তোমার রাগের কথা হলো। আমি কি তোমাকে রাগের কথা বলেছি কিছু যে ভাগলপুরে চলে যাবো বলছো?
প্রীতি বললে–তা কোন্ কথাটা বলতে আমাকে বাকি রেখেছ তুমি? মানুষ আবার কী রকম করে লোককে হেনস্তা করে? এই তো প্রকাশ সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ও–ও তো সব শুনেছে। ও-ই বলুক না, তুমি আমাকে অপমান করলে, না আমি তোমায় অপমান করলুম? বলুক ও, বুকে হাত দিয়ে ও বলুক–
প্রকাশ বললে–দিদি তুমি চুপ করো না, কেন কথা বাড়াচ্ছো? তুমি নিজের কাজ করো গে যাও না–
চৌধুরী মশাই যেন এতক্ষণে আবার প্রকাশের উপস্থিতি টের পেলেন। বললেন–তুমি থামো তো হে। তোমাকে কে মাতব্বরি করতে বলেছে? আমি তোমাকে ননী ডাক্তারকে ডাকতে বললুম না–
এমন সময় হঠাৎ ভেতর থেকে মৃদু গলায় আওয়াজ এলো—মা–
এতক্ষণে যেন সবাই সম্বিৎ ফিরে পেলে। যেন এতক্ষণে হঠাৎ খেয়াল হলো যে এ বাড়িতে এমন একজন লোক আছে যার সামনে এমন ব্যবহার করা অসঙ্গত। অন্তত চক্ষুলজ্জার খাতিরেও যেন সে-মানুষটার সামনে একটু সংযত হয়ে কথা বলা দরকার। এছাড়াও যেন নতুন করে চৌধুরী মশাই-এর মনে পড়ে গেল যে ওপরে কর্তাবাবুর মরণাপন্ন অসুখ। তারপর আরো মনে পড়ে গেল যে একটু দূরেই বাবাজী রয়েছেন, তাঁর কানেও এই স্বামী-স্ত্রীর কথা কাটাকাটির শব্দ পৌঁছোনো সম্ভব। সকলের সব কথাই মনে পড়ে গেল। পাশের বাড়ির শ্যেনচক্ষু বেহারি পালের কানেও যে শব্দটা পৌঁছতে পারে সে কথাটাও যেন এতক্ষণে সকলের খেয়াল হলো। খেয়াল হতেই এক মুহূর্তের জন্যে সবাই নিজের আসল স্বরূপটা ফিরে পেলে। লজ্জায় চৌধুরী মশাই যেন যেখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচেন। সামনেই দেখলেন প্রকাশ হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে আছে। তাকে নিয়েই বার বাড়ির দিকে চলতে চলতে বললেন–তুমি এখনও এখানে দাঁড়িয়ে আছো বড়কুটুম, ওদিকে যে কর্তাবাবু ছটফট করছেন–
