প্রকাশ মামা জানালার গরাদের কাছে মুখ নিয়ে গেল। গলাটা একটু নামালে। বললে– দ্যাখ, একটা কথা শোন্, মন দিয়ে শোন, বাড়িতে এখন পরের বাড়ির মেয়ে রয়েছে, এই সময় তুই কেন এমন কেলেঙ্কারি করছিস বল তো? জামাইবাবুর কথা একটু শুনলে তোর কী এমন ক্ষতিটা হয়? তোকে তো এমন কিছু শক্ত কাজ কেউ করতে বলছে না?
বলে প্রকাশ মামা চুপ করলো। তারপর সদানন্দর তরফ থেকে কোনও জবাব না পেয়ে আবার বললে–কী রে, জবাব দিচ্ছিস নে যে?
সদানন্দ বলে উঠলো–তুমি এখান থেকে যাও প্রকাশ মামা, আমাকে বিরক্ত কোর না–
প্রকাশ মামা বললে–আমি তোকে বিরক্ত করছি? কী বলছিস তুই? আমি তোর ভালোর জন্যে বলছি, আর তুই কিনা বলছিস আমি তোকে বিরক্ত করছি?
তারপর একটু থেমে বললে–তা যাক গে, আমি জামাইবাবুকে এখুনি ডেকে নিয়ে আসছি, তুই শুধু তার সামনে বলবি তুই আর অমন করবি না, যা করেছিস তার জন্যে মাপ চাইবি, চুকে যাবে ল্যাঠা। পারবি না? এইটুকুও বলতে পারবি না?
সদানন্দ তবু কিছু জবাব দিলে না। চুপ করে রইল।
–কী রে, আবার চুপ করে রইলি? জানিস ওপরে এখন কী হচ্ছে? তোর দাদুর হঠাৎ অসুখ বেড়েছে, যায়-যায় অবস্থা। বাড়িতে এই রকম বিপদ চলছে আর তোর কি না এই আক্কেল! তোর মা বাবা আমি–সবাই কোন্ দিকটা সামলাই বল্ দিকিনি। তুইও তো সারা রাত জেগে কাটিয়েছিস। বউমারও তো সেই অবস্থা। ওদিকে বাবাজী মানুষটার সেবার ব্যবস্থা আছে। এই সময়ে কে কাকে দেখে বল তো? একটা তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে তুই সেয়ানা ছেলে হয়ে এ কী করছিস আমি বুঝতে পারছি না।
এমন সময় দীনু ওপর থেকে সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে আসছিল। তাকে দেখেই প্রকাশ মামা জিজ্ঞেস করলে কী রে, কর্তাবাবুর কী রকম অবস্থা?
দীনু হাঁফাচ্ছিল। বললে–কর্তাবাবু অজ্ঞান হয়ে গেছে
–কেন? অজ্ঞান হয়ে গেছে কেন? মারা যাবে নাকি?
কিন্তু তার আগেই চৌধুরী মশাই নিজেই আবার সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন। এসেই প্রকাশকে সামনে দেখে এগিয়ে এলেন। বললেন–প্রকাশ, ও দীনুকে দিয়ে হবে না, তোমাকেই যেতে হবে
প্রকাশ বললে–কোথায়?
–ননী ডাক্তারকে ডাকতে। বাবার অবস্থা ভালো মনে হচ্ছে না। চোখ উল্টে গেছে।
–তা হঠাৎ এমন হলো কেন?
চৌধুরী মশাই বললেন–সে-সব কথা পরে হবে। আগে তুমি যাও, ননী ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে এসো। আমি ভালো বুঝছি না। বেহারি পাল মশাই-এর সঙ্গে কী নাকি কথা কাটাকাটি হয়েছিল শুনলাম, এখন কী করি!
প্রীতিও চৌধুরী মশাই-এর গলার শব্দ পেয়ে দৌড়ে এলো। বললে–কী হলো! ওপরে কী দেখে এলে?
প্রকাশকে যে কথাগুলো বলেছিলেন সেই কথাগুলোই চৌধুরী মশাই গিন্নীকে বললেন। কিন্তু প্রীতি সে কথায় কান দিলে না। বললে–তা তুমি যে খোকাকে ঘরে তালা-চাবি দিয়ে গেলে, ও খাবে না? ও মুখ-হাত-পা ধোবে না? রাগ হলে কি তোমার এই রকমই মাথা গরম হয়ে যায়?
চৌধুরী মশাই এ-কথায় আরো রেগে গেলেন। বললেন–মাথা গরম হবে না? তুমি আমার মাথারই দোষ দেখলে? আর তোমার ছেলে যে কত বেয়াড়া তা তো একবারও দেখতে পাও না?
প্রীতি বললে–তা বুঝলাম না-হয় যে আমার ছেলে বেয়াড়া, তা বলে তাকে ঘরে তালা চাবি বন্ধ করে রেখে দেবে? তালা-চাবি বন্ধ করলে ছেলে তোমার শোধরাবে? এ কি ছেলেমানুষ ছেলে যে মেরে-ধরে ভুলিয়ে ভালিয়ে তাকে ভালো করে তুলবে?
চৌধুরী মশাই বললেন–তা অত বড় বুড়ো ধাড়ি ছেলে, ওর এতটুকু জ্ঞানগম্যি থাকবে না তা বলে? ভেবেছে ওর যা খুশি তাই করবে? যে ছেলে নিজের বাপের মুখের ওপর কথা বলে তাকে এই রকম শাস্তিই দিতে হয়। দরকার নেই ওর খেয়ে। ও-ছেলে আমার থাকলেই বা কী আর না থাকলেই বা কী! তুমি ওরকম ছেলেকে পেটে ধরেছিলে কেন?
-–আঃ—
বলে প্রীতি বিরক্তিতে একেবারে ফেটে পড়লো। বললে–-তোমার কী মুখের আড় থাকতে নেই? তুমি কী বলছো তাও তুমি জানো না। দাও, আমাকে চাবি দাও, আমি দরজা খুলে দেব
চৌধুরী মশাই চাবিটা চেপে ধরলেন। বললেন–না, চাবি কখনো দেব না—
প্রীতি বললে–পাগলের মতো কাণ্ড কোর না। দাও চাবি দাও–
–কিন্তু তোমার ছেলে তাহলে বাবাজীর কাছে এখনি ক্ষমা চাক। এখুনি বাবাজীর কাছে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা চাক।
প্রীতি আর কথা না বলে চৌধুরি মশাই-এর কাছ থেকে এক টানে চাবি কেড়ে নিলে। তারপর দরজার তালাটা খুলতে যেতেই চৌধুরী মশাই গিন্নীর হাতটা চেপে ধরলেন। বললেন–চাবি দাও, চাবি দাও আমাকে–তালা খুলতে পারবে না–
বলে চাবিটার জন্যে গিন্নির হাতটা ধরে টানতে লাগলেন।
প্রকাশ মামা এতক্ষণে চৌধুরী মশাই-এর হাতটা ধরতে গেল। বললে–জামাইবাবু, আপনি করছেন কী? আপনি ঠাণ্ডা হোন–
চৌধুরী মশাই প্রকাশের হাতটা ঠেলে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। বললেন–খবরদার, তুমি আমার হাত ধরবার কে? যাও এখান থেকে চলে যাও। একবার তোমাকে ঠেলে দিয়েছি! আমার গায়ে হাত দিলে এবার উঠোনের কুয়োর মধ্যে ফেলে দেবে–যাও–
প্ৰকাশ বললে–কিন্তু আপনি মাথা ঠাণ্ডা করে জিনিসটা ভেবে দেখুন জামাইবাবু, দিদি যা বলছে ঠিকই বলছে
–আবার? আবার তুমি আমার সামনে আসছো?
–কিন্তু প্রীতি তখন সেই ফাঁকে তালাটা খুলে ফেলেছে। খুলে ফেলে সদানন্দকে ডাকলে–আয় খোকা, আয়, আয়, বেরিয়ে আয়।
সদানন্দ কিন্তু বেরিয়ে আসবার কোনও চেষ্টাই করলে না। প্রীতি এবার নিজেই ঘরের ভেতরে গিয়ে ঢুকে সদানন্দর হাতটা ধরে টানতে লাগলো। বললে–হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? বেরিয়ে আয়–
