কথাটা চরমে উঠলো তার পরেই। বেহারি পাল হঠাৎ বলে বসলো–আগে নিজের বাড়ির দিকে নজর দিয়ে দেখুন কর্তাবাবু, পরের ব্যাপার পরই ভাল করে নজর দিতে পারবে–
–কী বললে–তুমি? কী বললে?
বেহারি পাল বললে–এখন তো সবে নাতির বিয়ে দিলেন। এখন নাতবউও বাড়িতে এসেছে। এখন সেই দিকেই নজর দিন, নইলে আপনারই ক্ষতি, আমার কলা–
বলে বেহারি পাল তাড়াতাড়ি উঠে পড়লো। কিন্তু উঠে পড়বার আগেই যা হবার তা হয়ে গেল। কর্তাবাবুর মুখ দিয়ে কি রকম একটা গোঁ-গোঁ শব্দ বেরোতে লাগলো। যেন কী বলতে যাচ্ছিলেন, সে কথাটা জিভের মধ্যেই আটকে গেল। রাগের মাথায় দুটো সচল হাত তুলে কী বলতে চাইলেন তা আর কেউ জানতে পারলে না। বেহারি পাল আর দাঁড়ালো না। সে ঘর থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল।
কিন্তু মুশকিল হলো কৈলাস গোমস্তার। সে ভয় পেয়ে গেল। সে আর সেখানে দাঁড়ালো না। তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নিচেয় একতলায় নেমে এসেছে।
নিচেয় তখন চৌধুরী মশাই সদানন্দকে ঘরের ভেতর পুরে দরজায় তালা-চাবি বন্ধ করে দিয়েছেন। আর বাড়ি যত লোক আশ-পাশ থেকে উঁকি মেরে কাণ্ডটা লক্ষ্য করছে।
সদানন্দের ঘরের দরজায় তালাবন্ধ হলে কী হবে, পাশেই একটা বিরাট জানালা। গরাদের বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছিল সদানন্দ এতটুকু প্রতিবাদ করছে না, বাধাও দিচ্ছে না। তালা চাবি বন্ধ হবার পর সে মাথা নিচু করে ঘরের ভেতরে রাখা খাটটার পরে গিয়ে বসে মাথা নিচু করে রইলো।
সমস্ত ব্যাপারটা প্রীতির চোখের সামনেই ঘটলো! বললে–ওগো দরজাটা খুলে দিয়ে যাও, দরজা বন্ধ করে চলে গেলে কেন?
গৌরীও এতক্ষণ নির্বাক হয়ে সব কিছু দেখছিল। সে-ই নিজের হাতে ছোটবাবুকে তালা চাবি এনে দিয়েছে। এক মুহূর্তের মধ্যে যে কী কাণ্ড ঘটে গেল তা যেন কেউ তখনি-তখনি কল্পনাও করতে পারলো না। কী যে অপরাধ সদানন্দের আর কত বড় অপরাধের যে এত বড় শাস্তি, তাও কেউ অনুমান করতে পারলে না।
প্রীতি বাইরের জানালা দিয়ে জিজ্ঞেস করলে–হ্যাঁ রে খোকা, তুই কী করেছিলি রে? কর্তা এমন রেগে গেলেন কেন তোর ওপর? তুই কী করেছিলি?
প্রকাশ মামাও এতক্ষণ কোনও কথা বলে নি। পেছনে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। এত যে বাক্যবাগীশ মানুষটা সেও যেন ঘটনার আকস্মিকতায় খানিকক্ষণের জন্যে একেবারে বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল।
প্রীতি তার দিকে চেয়েও জিজ্ঞেস করল কী রে, কী হয়েছিল রে? তোর জামাইবাবু এত রেগে গেল কেন রে? কী করেছিল খোকা?
প্রকাশ বললে–বাবাজীর ত্রিশূল কেড়ে নিয়েছিল, আর বাবাজীর জটা টেনে ধরে গালাগালি দিচ্ছিল–
–গালাগালি দিচ্ছিল? খোকা গালাগালি দিচ্ছিল? এ হতেই পারে না। খোকা কখনও কাউকে গালাগালি দিতেই পারে না–
ভেতরে সদানন্দ তখনও মুখ নিচু করে খাটের ওপর চুপ করে বসে ছিল। প্রীতি তার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলে কী রে খোকা, তুই বাবাজীকে গালাগালি দিয়েছিলি? কী করেছিল বাবাজী?
সদানন্দ যেমন বসে ছিল তেমনিই বলে রইল। এ কথার কোনও জবাব দিলে না।
প্রীতি আবার জিজ্ঞেস করলে–হ্যাঁ রে, কথার জবাব দে–
জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে একজন প্রশ্ন করছে আর ভেতরে যে শুনছে সে পাথর না গাছ তার কোনও প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।
কথার জবাব দিবি না? বলি, আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস?
তবু সদানন্দর দিক থেকে কোনও উত্তর নেই।
প্রীতি যেন নিজের মনেই বললে–এ আমার কী মুশকিল হলো বল্ তো প্রকাশ। এ আমি কাকে কী বলি? তোর জামাইবাবু তো খোকাকে ঘরের ভেতরে রেখে দিয়ে চলে গেল। আবার ওদিকে কর্তাবাবুর কী হলো কে জানে। এখন আমি সংসার দেখবো, না এই ছেলেকে সামলাবো। ছোট ছেলে হলে না হয় তবু তাকে সামলাতে পারা যায়, কিন্তু বুড়ো ধাড়ি ছেলেকে নিয়ে আমি কী করি? বাবাজী সন্নিসী মানুষ, তিনি তো কোনও ক্ষতি করেন নি, তাকে কেন খামোকা তুই মারতে গেলি মাঝখান থেকে। তিনি তোর কী করেছিলেন?
প্রকাশ বললে–দাঁড়াও, তুমি কিছু ভেবো না দিদি, তুমি এখান থেকে সরে যাও দিকি, তোমরা সবাই এখান থেকে সরে যাও, সবাই সরে যাও–
গৌরী, বিষ্টুর মা, ঝি, শশী, আরো সব ভেতর বাড়ির ঝি-ঝিউড়ি যে-যে আশপাশ থেকে উঁকিঝুঁকি মারছিল সবাই ধমক খেয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। অদৃশ্য হয়ে গিয়েও পাছে কাছাকাছি থাকে সেই জন্যে প্রকাশ আবার বললে–সবাই ভাগো এখান থেকে, ভাগো–
প্রীতি নিজের জ্বালায় জ্বলেপুড়ে আগেই রান্না বাড়ির ভেতরে চলে গিয়েছিল। তার তখন মাথা ঘুরছে একেবারে বনবন্ করে। একেকটা রাত ঠায় জাগা। তার ওপর এই উটকো ঝামেলা। কিন্তু খাবার সময় কেউ পেট খালি করে খাবে না। তখন পান থেকে চুন খসলে যত দোষ বাড়ির গিন্নীর। বিষ্টুর মা গৌরী তারাও প্রীতির সঙ্গে তখন চলে গেছে। প্রকাশ তবু চারিদিকে খুঁটিয়ে দেখে নিলে। না, কেউ কোথাও নেই। প্রকাশ জানালার কাছে এগিয়ে গেল।
বললে–এই সদা, শোন! আয় ইদিকে—
কিন্তু কাকে কথা বলা! সদা প্রকাশ মামার কথা শুনলে তবে তো!
প্রকাশ মামা আবার ডাকলে–আমার কথা শুনবি না?
এতক্ষণে সদানন্দ মুখ তুললো। চেহারা দেখলে বোঝা যায় সে যেন রাগে ফুঁসছে।
–চা। আমার দিকে চেয়ে দেখ!
সদানন্দ বলে উঠলো–কী বলবে বলো না
প্রকাশ মামা বললে–আয়, একবার জানালার কাছে আয়, তোর কানে কানে একটা কথা বলবো–
সদানন্দ বললে–যা বলবে তুমি ওখান থেকেই বলো।
