সদানন্দও বোধ হয় এমনি এক বেহিসেবী মানুষ!
নইলে বেশ তো ছিল সে। তার পূর্বপুরুষের পাপের কৈফিয়ৎ তো কেউ তার কাছে চাইতে যায় নি। কেউ তো বলে নি তুমি প্রায়শ্চিত্ত করো। কেউ তো তাকে বলে নি, তুমি তোমার পূর্বপুরুষের সব কলঙ্ক নিজের আত্মাহুতির প্রলেপে মুছে ফেল। কেউ তো বলে নি তোমার জন্মতাদার সব অপরাধের উত্তরাধিকারী তুমি। আর তুমিই তার প্রায়শ্চিত্ত করবার একমাত্র হকদার।
বেহারি পাল প্রথমে বুঝতে পারে নি। কিন্তু খবরটা কানে পৌঁছুল তার গিন্নির মারফত। পাশাপাশি বাড়ি। এ বাড়ির চিলেকোঠায় বেড়াল এসে বসলে ওবাড়ির বেড়াল রাগে গোঁ-গোঁ করে। সেই বেহারি পালের কানে গেল খবরটা।
গিন্নী বললে–ছি ছি ছি, আমার বাপের জন্মেও এমন কাণ্ড কখনও শুনি নি মা–
বেহারী পালের কৌতূহল আরো বেড়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে–তা খবরটা তুমি কার কাছে শুনলে?
–ওই বিষ্টুর মা। বিষ্টুর মার সঙ্গে যে আমার ঘাটে দেখা হল। মাগী বদমাইশ হলে কী হবে, মানুষটার মনটা ভালো।
–কী রকম?
গিন্নী বললে–ওই মাগীই তো বললে–ওদের নতুন বউএর সঙ্গে নাকি চৌধুরী মশাই এর ছেলে একঘরে এক বিছানায় শোয় না। আমার তো শুনে বিশ্বাস হলো না। বিষ্ঠুর মা বললে–বউটা নাকি নষ্টা–
–সে কী?
এ-খবর ক’ দিন থেকেই বেহারি পালের কানে যাচ্ছিল। বেহারি পাল মশাই নিজের কাজকর্ম করে, আর চৌধুরী বাড়ি থেকে কাঁসর-ঘণ্টার আওয়াজও শোনে। কিন্তু কারণটা এতদিনেও বুঝতে পারতো না। এবার যেন সেটা একটু স্পষ্ট হলো। বুঝতে পারলে চৌধুরী মশাইএর বংশের মেরুদণ্ডেই ঘুণ ধরেছে। এইবার জব্দ হবে বুড়ো। এইবার মচকাবে কর্তাবাবু।
গিন্নীকে বেহারি পাল একান্তে ডেকে বলে দিলে–তুমি যেন এখন এসব কথা কাউকে বলে ফেলো না আবার। বুঝলে?
–কেন? বললে–দোষ কী?
বেহারী পাল সাবধানী লোক। বললে–এখন বললে–জিনিসটা আর বাড়বে না, এখন একটু বাড়তে দাও, বেড়ে বেড়ে ওর ডাল-পালা গজাক, তখন বলো–
অবশ্য বেহারি পাল বুঝতো মেয়েমানুষদের ও-কথা বলাও যা আর না বলাও তাই। তবু যে কথাটা বলে রাখলো তারও একটা দাম আছে। কিন্তু তাতেও নিশ্চিন্ত হওয়া গেল না। কখন কোন ফাঁকে মেয়েমানুষের মুখ ফসকে কথাটা বাইরে ফাঁস হয়ে যায় সেই ভাবনাতেই রাতটা কাটলো। বলতে গেলে রাত্তিরে ভালো করে ঘুমও হলো না বেহারি পালের। তাই ভোর-ভোর ঘুম থেকে উঠে সামনের বাগানের সামনে পায়চারি করছিল। দেখলে কৈলাস গোমস্তা যাচ্ছে।
বললে–কী গো কৈলাস, খবর কী? কী রকম সরষে উঠলো তোমাদের?
কৈলাস বললে–এবার তো নাবি সরষে, তাই ভালো হলো না। শ’পাঁচেক বস্তা হয়েছে। কোনও রকমে।
–তা কর্তাবাবু কেমন আছেন?
–কর্তাবাবু আর কেমন থাকবেন, সেই একই রকম।
বেহারি পাল পায়ে-পায়ে কৈলাস গোমস্তার সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগলো। বললো–চলো, অনেক দিন তোমাদের কর্তাবাবুকে দেখি নি, আজ দেখে আসি গে চলো—
এইভাবেই কর্তাবাবুর কাছে বেহারি পালের আসা। পাশাপাশি বাড়ি, অথচ দেখাশোনা হয় না। প্রথমে কিছু শিষ্টাচারসম্মত কথা হলো। তারপরেই হঠাৎ কর্তাবাবু জিজ্ঞেস করে বসলেন–তোমার বাড়িতে অত শাঁখকাঁসর-ঘণ্টা বাজে কেন হে বেহারি? তুমি কি দীক্ষা নিয়েছে নাকি?
–দীক্ষা?
–হ্যাঁ, দীক্ষা না নিলে অত পূজা আস্রার ঘটা কেন তোমার বাড়িতে?
বেহারি পাল তো অবাক! বললে–আমার বাড়িতে শাঁখ-কাঁসর-ঘণ্টা? ও তো আমার বাড়িতে নয় কর্তাবাবু, ও তো আপনার বাড়িতে বাজে। আপনার বাড়িতেই তো এক সাধু বাবাজী এসেছেন, তিনিই যাগযজ্ঞ করেন দিনরাত, বাড়ি থেকে দিগ্বন্ধন করে ভূত-প্রেত তাড়িয়ে দেন। আপনি এ-সব কিছু জানেন না?
কর্তাবাবু কথাটা শুনে রেগে আগুন। বললেন–তার মানে? শাঁখ-কাঁসর-ঘণ্টা বাজলো তোমার বাড়িতে আর তুমি বলছো আমার বাড়িতে পূজো হচ্ছে? তুমি কি আজকাল জেগে ঘুমোচ্ছ নাকি হে বেহারি? সুদে টাকা খাটিয়ে কিছু টাকা হয়েছে বলে একেবারে মুখে যা আসে তাই-ই বলতে আরম্ভ করেছ?
তারপর কৈলাসের দিকে চাইলেন। বললেন–শুনলে কৈলাস, বেহারির কথাটা শুনলে?
কৈলাসের তখন ত্রিশঙ্কু অবস্থা। কর্তাবাবুর কথার না করতে পারে প্রতিবাদ আর না করতে পারে সমর্থন।
বেহারি পাল ভেতরের কথা অত-শত জানে না। সে বললে–আজ্ঞে, সুদে আমি টাকা খাটাই বটে, কিন্তু সে কি আজ নতুন কর্তাবাবু? তার জন্যে আমি খামোকা মিথ্যে কথা বলতে যাবো কেন আপনার কাছে? আর শাঁক কাঁসর-ঘণ্টা বাজাটা কি অন্যায় কর্তাবাবু?
কর্তাবাবু আরো উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বললেন–তার চেয়ে বলো না ওটা তোমার ভড়ং–ভড়ং বলতে তোমার অত লজ্জা কীসের?
–কী আশ্চর্য, আমি এলুম আপনার কাছে আপনি কেমন আছেন তাই জানতে, আর আপনি আমাকে গাল মন্দ করছেন?
–আমি তোমাকে গালমন্দ করলুম? বা রে মজা! তোমার বাড়িতে শাঁখকাঁসর-ঘণ্টা বাজার কথা বললেও গালমন্দ করা হলো? তুমি তো আজকাল ভারি বেআক্কেলে হয়ে গেছ হে বেহারি? দুটো টাকা হলেই মানুষকে এমন বেআক্কেলে হতে হয়, ছি ছি ছি–
শেষের ছি-টার ওপর একটু বেশী জোর দিয়ে কর্তাবাবু কথাটা শেষ করলেন। ভাবলেন এই চিৎকারেই বেহারি পাল নরম হয়ে আত্মসমর্পণ করবে।
কিন্তু না, কর্তাবাবু বেহারি পালকে চেনেন নি। ভেবেছেন সেই আগেকার বেহারি পালই আছে। সেই সবে গোঁফ-গজানো নিরীহ গোবেচারী মানুষ। কিন্তু তারপরে এতকাল ইছামতীতে যে কত জল গড়িয়ে গেছে, চারপাশের দুনিয়াটা যে কত বদলে গেছে, ঘরের মধ্যে বসে সে খবর তিনি পান নি। ভেবেছেন সেই কালীগঞ্জের হর্ষনাথ চক্রবর্তীর আমল বুঝি এখনও চলছে। এখনও জমিদার যা বলবে সবাই বেদবাক্য বলেই তা মেনে নেবে। তিনি নিজে যখন নবাবগঞ্জের সব চেয়ে ধনী ব্যক্তি তখন যেন আর কোনও ধনী ব্যক্তি এ দিগরে থাকতে পারবে না, থাকতে পারা যেন বে-আইনী। নিজে পঙ্গু মানুষ, তাই ভেবে নিয়েছেন পৃথিবীটাও যেন তাঁরই মত পঙ্গু হয়ে শুয়ে পড়ে আছে।
