সদানন্দ যেন চৌধুরী মশাই-এর কথার প্রতিবাদেই বাবাজীর জটা ধরে আরো জোরে টান দিলে। বললে–আমি ওকে আজ বাড়ি থেকে বিদেয় করবো তবে ছাড়বো–
–কী, এত বড় আস্পর্ধা তোমার? তুমি আমার মুখের ওপর কথা বলো?
সদানন্দ বললে–হ্যাঁ কথা বলবো, আলবৎ বলবো–
–খবরদার!
চৌধুরী মশাই রাগে গরগর করতে লাগলেন। তার গলার আওয়াজে সমস্ত ঘরখানা যেন থর-থর করে কেঁপে উঠলো।
প্রকাশ আর থাকতে পারলে না। এতক্ষণ জামাইবাবুর সামনে সে বেশি কথা বলে নি। এবার যখন দেখলে ব্যাপারটা অনেক দূর গড়িয়েছে তখন সদানন্দর দিকে এগিয়ে গেল। বললে–এই সদা, করছিস কী? তোর কি জ্ঞান-গম্যি কিচ্ছু নেই? কার সঙ্গে কেমন করে কথা বলতে হয় তাও জানিস না?
–তুমি থামো প্রকাশ মামা!
–পাগল না কী তুই?
চৌধুরী মশাই সামনে এগিয়ে গিয়ে প্রকাশকে বললেন–তুমি সরো, আমি দেখছি–
বলে প্রকাশকে জোরে পাশে ঠেলে দিলেন। প্রকাশ ঘরের মেঝের ওপর গিয়ে ছিটকে পড়লো। কে একজন তাকে ধরে তুলতে এল। প্রকাশ রেগে গেল। বললে–যা, সরে যা, কে তুই? আমাকে তুলতে হবে না, আমি নিজেই উঠবো, যা
কিন্তু উঠতে গিয়েই আবার পড়ে গেল। মাথায় খুবই লেগেছিল বোধ হয়। মাথা দিয়ে তখন তার রক্ত পড়ছে।
কিন্তু সেদিকে তখন চৌধুরী মশাই এর খেয়াল নেই। তিনি তখন ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সদানন্দর ওপর। সদানন্দর হাত থেকে বাবাজীকে ছাড়িয়ে নিয়ে ত্রিশূলটাও কেড়ে নিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। তারপর সদানন্দকে দুই হাতে ধরে ফেলেছেন।
বললেন–চলো, চলো, ভেতরে চলো—
সদানন্দ তখন চেঁচিয়ে উঠেছে–আমি যাবো না, আমি কিছুতেই যাবো না—
চৌধুরী মশাই জোরে চিৎকার করে ডাকলেন–দীনু, দীনু–
দীনু কাছে দাঁড়িয়েই ভয়ে ভয়ে সব দেখছিল এতক্ষণ। ছোটবাবুর ডাক শুনেই দৌড়ে এল।
চৌধুরী মশাই বললেন–খোকাবাবুকে ধর তো– খোকাবাবুকে ধরতে যেন সঙ্কোচ হচ্ছিল তার। ধরতে গিয়েও যেন আড়ষ্ট হয়ে রইল।
চৌধুরী মশাই ধমক দিলেন। বললেন–হাঁ করে দেখছিস কী? ধর একে, ধরে টেনে নিয়ে আয়, আমি আজ একে আটকে রেখে দেব ঘরের ভেতরে। আমি জব্দ করবো একে, বড় বাড় বেড়েছে এ–
বলে আর কারো ভরসা না করে নিজেই সদানন্দকে টানতে টানতে ভেতর বাড়ির দিকে নিয়ে চললেন। আশেপাশে যারা কাণ্ড দেখতে এসেছিল তারা তখন আড়ালে লুকিয়েছে। আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে সব দেখছিল।
চৌধুরী মশাই তাদের দেখতে পেয়েই চেঁচিয়ে উঠলেন–বেরো সব এখান থেকে বেরো, বেরিয়ে যা
সবাই হুড়মুড় করে যে-যেদিকে পারলে পালিয়ে বাঁচল। সদানন্দ তখন ছটফট করছে ছাড়া পাবার জন্যে। বলছে-আমি যাবো না, আমাকে ছেড়ে দিন–
কিন্তু চৌধুরী মশাই-এর গায়ে যেন তখন অসুরের শক্তি নেমে এসেছে। তিনি সদানন্দকে ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে একেবারে ভেতর বাড়িতে একটা ঘরে পুরে দিলেন। তারপর ডাকলেন–গৌরী—গৌরী–
গৌরী আসবার আগে প্রীতি দৌড়তে দৌড়তে এসে হাজির। বললে–কী করছ, খোকাকে ধরেছ কেন? খোকা কী করেছে?
–সে তোমাকে পরে বলবো, গৌরী কোথায়?
গৌরী পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। তার দিকে চেয়ে বললেন–একটা তালা-চাবি নিয়ে আয় তো–
গৌরী তালা-চাবি এনে দিতেই সদানন্দকে ঘরে পুরে দরজায় চাবি বন্ধ করে দিলেন চৌধুরী মশাই। বললেন–থাকুক এখানে পড়ে, যেমন ব্যবহার তেমনি জব্দ হোক—
প্রীতি তখন উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। বললে–তুমি করছো কী? বাড়িতে নতুন বউ রয়েছে, তুমি এ কী করছো?
চৌধুরী মশাই সেকথায় কান না দিয়ে বললেন–সে তুমি বুঝবে না, ওদিকে উকিলবাবুর চিঠি এসেছে, আমার মামলার তারিখ পড়েছে, আর এদিকে ছেলের এই বেয়াড়াপানা, আমি কত সহ্য করবো? আমিও তো মানুষ, আমারও তো একটা সহ্যের ক্ষমতা আছে.
প্রীতি কী যেন বলতে যচ্ছিল কিন্তু তার আগেই বাধা পড়লো। কৈলাস গেমস্তা দৌড়তে দৌড়তে এলো।
–ছোটবাবু!
–কী?
চৌধুরী মশাই অবাক হয়ে গেছেন। এ-সময়ে আবার কৈলাস এলো কেন? কৈলাস বললে–কর্তাবাবু কেমন করছেন! আপনাকে একবার ডাকছেন।
–কর্তাবাবু? কর্তাবাবু কি এই খবর পেয়েছেন নাকি?
–হ্যাঁ।
–কে এ খবর দিলে কর্তাবাবুকে? আমি যে দীনুকে বলে দিলুম যেন কর্তাবাবুর কানে খবরটা না পৌঁছোয়, তবু কে তাঁর কানে দিলে?
–বেহারি পাল মশাই।
চৌধুরী মশাই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। বেহারি পালের আর সময় নেই, ঠিক এই সময়েই কিনা আসতে হয়!
চৌধুরী মশাই তখন চাবিটা নিজের ট্যাঁকে গুঁজে ফেলেছেন। বললেন–চলো কৈলাস, চলো—
.
সদানন্দের মনে আছে বাড়িতে তখন সে কী বিশৃঙ্খলা! যে বাড়িতে এতদিন সব কাজ নিয়ম করে চলেছে, যে বাড়িতে সকাল থেকে সবাই নিয়ম মেনে চলেছে, সেই বাড়িতেই যেন হঠাৎ এক অরাজক অবস্থা নেমে এল। একদিকে কর্তাবাবুর অসুখ, অন্যদিকে মামলা আর বাড়ির ভেতরে তখন বেনিয়ম। অথচ সমস্ত কিছুর পেছনে সদানন্দ। তার সামান্য একটু অসহযোগিতার জন্যে এতদিনের সব অইনকানুন যেন একেবারে ভেঙে-চুরে তছনছ হয়ে গেল।
এমনই হয়। সত্যিই এমনি হয়। কারণ সবাই তো সংসারের নিয়মের সঙ্গেই নিজেকে মানিয়ে নেয়। সংসারের সঙ্গে আপস করে চলেই সবাই সুখে-শান্তিতে বেঁচে থাকতে পারলে বর্তে যায়। কিন্তু এমন লোকও সংসারে জন্মায় যারা সংসারের নিয়মের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে না চলে সংসারকেই নিজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করে। লোকে এদেরই বলে বেহিসেবী। অথচ এই বেহিসেবী লোকগুলোর জন্যেই আমাদের এই পৃথিবীটা এগিয়ে চলে। তাদের অমানুষিক কৃচ্ছসাধনের মধ্যে দিয়েই পরবর্তী যুগের মানুষ অনেক অনাচার আর অনেক অত্যাচারের হাত থেকে পরিত্রাণ পেয়ে বাঁচে।
