চৌধুরী মশাই আর দাঁড়ালেন না সেখানে। তাড়াতাড়ি ভেতরবাড়ি পেরিয়ে সোজা গিয়ে বারবাড়িতে পড়লেন। ততক্ষণ আওয়াজটা স্পষ্ট কানে আসছে–
তারপর মনে হলো এ যেন খোকার গলার আওয়াজ–
বার বাড়ির মুখেই একটা বড় ঘরে বাবাজীর থাকবার ব্যবস্থা হয়েছিল। সেই ঘরের ভেতরে বসেই বাবাজীর পূজো-আস্রা-সেবা যা-কিছু সব হতো। আওয়াজটা সেই ঘরের দিক থেকেই আসছে। সেখানে যাবার পথেই দেখলেন, চণ্ডীমণ্ডপ থেকে উঠোন থেকে নানা দিক থেকে কৌতূহলী লোকজন বাবাজীর ঘরের দিকে আসছে।
–এই শশী, কী হচ্ছে রে ওখানে?
শশী দাঁড়িয়ে পড়লো। বললে–কী জানি ছোটবাবু, আমি তো তাই জানতেই যাচ্ছি–
দীনু ভেতর দিক থেকে দৌড়ে বাইরে আসছিল।
তাকেও জিজ্ঞেস করলেন–চৌধুরী মশাই–কী হচ্চে রে ওখানে? কীসের গোলমাল?
–আজ্ঞে আপনাকে ডাকতেই যাচ্ছিলুম, খোকাবাবু বাবাজীকে মারছে—
–খোকাবাবু!
যেন বজ্রপাত হলো চৌধুরী মশাই-এর মাথায়। বললেন–কেন? মারছে কেন?
দীনু বললে–আজ্ঞে আমি তো তা জানি নে, শব্দ শুনে দৌড়ে এসে কাণ্ড দেখলুম। দেখেই আপনাকে ডাকতে যাচ্ছিলুম–
সমস্ত জিনিসটা এতক্ষণে যেন চৌধুরী মশাই আন্দাজ করতে পারলেন। তারপর বাবাজীর ঘরের দিকেই যাচ্ছিলেন, কিন্তু যেতে গিয়েও থেমে গেলেন। পেছন ফিরে বললেন–হ্যাঁ রে, কর্তাবাবু কী করছে?
–আজ্ঞে তিনি তো ভোরবেলাই ঘুম থেকে উঠেছেন। এখন পুজোয় বসেছেন।
–এই গোলমাল কানে গেছে নাকি?
–তা জানি নে। আমি এখন গেলে জানতে পারবো। এখনও গোমস্তা মশাই আসেন নি–
চৌধুরী মশাই বললেন–তা হলে তুই কর্তাবাবুর কাছে গিয়ে তাঁকে সামলে রাখ। যদি জিজ্ঞেস করেন নিচেয় কীসের গোলমাল তাহলে যেন কিছছু বলিস নে! বলবি বেহারি পালের বাড়িতে ঝগড়া হচ্ছে–
বলে আর দাঁড়ালেন না। দৌড়তে দৌড়তে এক লাফে গিয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হয়েছেন। চৌধুরী মশাইকে দেখে রাস্তা করে দিলে সবাই। ঘরের ভেতরে তখন তুমুল কাণ্ড। চৌধুরী মশাই ঘরে ঢুকে দেখেন সদানন্দ এক হাতে বাবাজীর মোটা মোটা জটাগুলো পাকিয়ে ধরেছে, আর এক হাতে বাবাজীর সিঁদুর-মাখা ত্রিশূলটা ধরে তাঁর দিকে তাগ করে আছে।
বলছে–আর করবি তুই? আর এমন করবি কখনো?
বাবাজীও নাচার হয়ে বলেছেন–আমাকে ছাড়ুন বাবা, আমাকে ছাড়ুন।
সদানন্দর শক্ত মুঠির তেজ, অত বড় দশাসই বাবাজী যেন একেবারে ভয়ে কুঁকড়ে গেছেন।
চৌধুরী মশাই আর থাকতে পারলেন না। ঘরে ঢুকেই বাবাজীর ত্রিশূলটা সদানন্দর হাত থেকে কেড়ে নিতে গেলেন। কিন্তু সদানন্দর গায়েও যেন অসুরের শক্তি। সেও আটকে ধরেছে সেটা।
চৌধুরী মশাই বললেন কী হচ্ছে কী খোকা? ছাড়ো, এটা ছাড়ো–
–আমি ছাড়বো না। আপনি কেন বাধা দিচ্ছেন? ছেড়ে দিন—
চৌধুরী মশাইও ছাড়বেন না, সদানন্দও ধরে থাকবে।
–ছাড়ো, ছাড়ো—
সদানন্দ গলা চড়িয়ে বলে উঠলো–না ছাড়বো না-আমি বুজরুকটাকে খুন করে ফেলবো–
এতক্ষণে চৌধুরী মশাই-এর নজরে পড়লো একপাশে প্রকাশ মামা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে। চৌধুরী মশাই তার দিকে চেয়ে তাকে ধমকে উঠলেন। বললেন–তুমি এখেনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছো, খোকার হাত থেকে ত্রিশূলটা কেড়ে নিতে পারছো না?
প্রকাশ বললে–আজ্ঞে জামাইবাবু, আমি তো তখন থেকে সদাকে তাই বলছি। বাবাজী কী দোষ করলেন? বাবাজীর তো কিছুই দোষ নেই। তা ও কিছুতেই আমার কথা শুনছে না, আমি কী করব?
চৌধুরী মশাই বললেন–তুমিই তো যত নষ্টের গোড়া। তোমার জন্যেই তো যত গণ্ডগোল হয়েছে
প্রকাশ মামা যেন আকাশ থেকে পড়লো। বললে–আমি? আমিই যত নষ্টের গোড়া? সদা দোষ করলো, আর দোষ পড়লো আমার মাথায়?
–তা দেখছ ত্রিশূলটা দিয়ে খোকা মানুষ খুন করতে যাচ্ছে আর তুমি হাঁ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছো? এতখানি বয়েস হলো, আর তোমার এতটুকু আক্কেল হলো না? তারপর সদানন্দর দিকে চেয়ে বললেন–এখনও ছাড়ছে না, ছাড়ো বলছি–
–আমি ছাড়বো না।
বলে পাথরের মত কঠোর হয়ে সদানন্দ বাবাজীর মাথার জটগুলো আরো জোরে ধরে রইল।
বাবাজী তখন মাথার যন্ত্রনায় ছটফট করছেন। বলছে–ছেড়ে দিন বাবা, ছেড়ে দিন, আমি তো আপনার ভালো করবার চেষ্টাই করেছি। আমি আপনার মঙ্গলই চাই—
সদানন্দ চিৎকার করে বলে উঠলো–দরকার নেই তোর মঙ্গল করে, তুই আগে এ বাড়ি থেকে বিদেয় হ—
এর জবাব দিলেন চৌধুরী মশাই। বললেন–কেন, বিদেয় হবেন কেন? বাবাজীকে বিদেয় করবার তুমি কে শুনি? বাবাজীকে আমি এবাড়িতে ডেকে এনে তুলেছি, উনি তো নিজের থেকে আসেন নি, এবাড়ির মালিক আমি, ওকে বিদেয় করতে হয় তো আমি বিদেয় করবো, তুমি কে?
সদানন্দ বললে–কিন্তু ও কেন আমার ব্যাপারে নাক গলাতে আসে?
–কেন? উনি কী করেছেন তোমার? উনি তো আমাদের সকলের মঙ্গল কামনাই করেন।
–না, আমি কী করিনা করি তা দেখবার দরকার কী ওর? আমি রাত্তিরে বাড়িতে শুয়েছিলুম কিনা তা জানবার কীসের দরকার পড়েছে?
–তা গুরুজনরা জিজ্ঞেস করেন না? জিজ্ঞেস করেছেন তো ভালো কাজই করেছেন।
সদানন্দ বললে–ও কি আমার গুরুজন বলতে চান আপনি? একটা বুজরুক ঠগ জোচ্চোর হবে আমার গুরুজন, আর ও যা বলবে আমি তাই মানবো?
–কেন মানবে না? তোমাকে মানতেই হবে ওঁর কথা। উনি যখন আমার গুরুজন, তুমিও যখন আমার ছেলে তখন উনি তোমারও গুরুজন। ছাড়ো, ওঁর জটা ছেড়ে দাও, ত্রিশূল ছেড়ে দাও, ছেড়ে দিয়ে ওঁকে প্রণাম করো–
