প্রীতি বললে–এই তো বউমার কাছ থেকে আসছি। একটু গরম দুধ খাইয়ে এলুম–
–আর খোকা? খোকা কোথায়?
প্রীতি বললে–সারা রাত নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়ে এখন তোমার খোকার কথা মনে পড়লো?
চৌধুরী মশাই বললেন কী জানি কেন, কালকে খুব ঘুম পেয়ে গিয়েছিল। কেন যে এত ঘুমিয়ে পড়লুম হঠাৎ কে জানে!
প্রীতি বললে–কবে তুমি ঘুমোও না বলো তো? তুমি তো চিরকাল বিছানায় শুলেই নাক ডাকাও। তোমার মতন অমন ঘুম হলে আমি বেঁচে যেতুম। সরো, আমার কাজ আছে–
চৌধুরী মশাই বললেন–কাজ তো আমারও আছে, কিন্তু কালকে কী হলো তা তো আমাকে বললে না। খোকাকে তো শেকল দিয়ে গিয়েছিলে বাইরে থেকে, শেষকালে প্রকাশ শেকল খুলে দিয়েছিল নাকি?
প্রীতি বললে–এখন এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোমার সঙ্গে অত কথা বলবার সময় নেই। বলছি যে আমার কাজ আছে—
চৌধুরী মশাই বললেন–কাজ কি আমারই নেই? আমাকে আবার একবার রানাঘাটে যেতে হবে। উকিলবাবুর জরুরী চিঠি আছে। তা বলে আমার কথার জবাব দিতে আর কতক্ষণ সময় লাগে! জবাব দেবে না তাই-ই বলো!
প্রীতি বললে–তা তোমার কথার জবাব দিতে গেলে আমার সংসার চলবে? আর জবাব দিয়েই বা কী করবো? তোমাকে দিয়ে তো আমার কাজের কোনও সুরাহা হবে না–
–তার মানে? এ যেমন তোমার সংসার তেমনি তো আমারও সংসার। এ সংসারের ভালোমন্দ কি আমিও ভাবি না?
প্রীতি বললে–অত চেঁচিও না, একে তো লজ্জায় বউমার কাছে আমার মাথা হেঁট হয়ে গেছে, তার ওপরে তুমি আমার মাথাটা আরো হেঁট করে দিও না। আমি বলে সারারাত ঘুমোই নি, এমনিতেই আমার বুক ধড়ফড় করছে, তার ওপরে তোমার বাক্যবাণ আমি আর সইতে পারছি না–
চৌধুরী মশাই বললেন–তোমার শরীরের কথা ভেবেই তো আমি জিজ্ঞেস করছি কাল রাত্তিরে কী হলো, তা তুমি অত মেজাজ গরম করবে তা জানলে আর ভেতরবাড়িতে আসতুম না–
প্রীতি বললে–আমার শরীরের জন্যে যেন ভেবে ভেবে তোমার ঘুম হচ্ছে না–
–বেশ, আমার কথা বিশ্বাস না করলে আমি নাচার, কিন্তু এখনই তো বাবাজীর কাছে যাবো, যখন তিনি জিজ্ঞেস করবেন তখন তো বলতে হবে কিছু–
প্রীতি বলে–তাঁর মন্তরে কোনও কাজ হয় নি-আর কাজ হবেও না–
–কেন? কাজ হয় নি কেন?
প্রীতি বললে–তা কাজ হলে আমার এই হেনস্তা? এই সক্কালবেলা বউমাকে গিয়ে গরম দুধ খাইয়ে আসি? কোথায় বউ আমার সেবা করবে, না আমি বউ-এর সেবা করে করে মরছি। আমারও যেমন কপাল–
চৌধুরী মশাই বললেন–তা প্রকাশ কি ঘরের শেকল খুলে দিয়েছিল রাত্তিরে বেলা? খোকা পালিয়ে গেল কী করে?
প্রীতি বললে–শেকল খুলে দেবে কেন? ঘরের মধ্যেই দুজনে মুখ ফিরিয়ে বসে রাত কাটিয়েছে।
–সমস্ত রাত?
প্রীতি বললে–হ্যাঁ, সমস্ত রাত। তাই জানতে পেরেই তো আমার এত হেনস্তা। এমন ছেলে আমি বাপের জন্মে কখনও দেখি নি! বউমা তো তাই বলছিল তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে–
–কেন?
প্রীতি বললে–তা বউমার দোষ কী? তোমার ছেলে অমন করে তাকে অপমান করবে, তার দিকে ফিরে তাকাবে না, তাকে দেখলেই ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাবে, একঘরে থাকলেও অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে থাকবে, তাতে তার কষ্ট হয় না? এতটুকু আত্মসম্মান-জ্ঞান থাকলে কোনও মেয়েমানুষ তা সহ্য করতে পারে? আমার তো ভয় হচ্ছে বউমা শেষকালে কোনও কাণ্ড না বাধিয়ে বসে!
কী কাণ্ড বাধাবে?
–আরে মেয়েদের মনের হিসেব তোমরা পুরুষমানুষরা কী করে বুঝবে? আমি ভাবছি শেষকালে আত্মঘাতী না হয়! শেষকালে গলায় দড়িটরি দিয়ে একটা কেলেঙ্কারি না করে বসে!
এতক্ষণে যেন চৌধুরী মশাই-এর হুঁশ হলো।
বললেন–কেন? খুব কাঁদছে নাকি বউমা? কিছু বলছে?
–তা বলবে না? এই সবে দুদিন আগে একটা শোক পেয়েছে, তারপর তোমার ছেলের এই কাণ্ড, এর পর যদি কিছু বলেই তো আমি তার মুখ বন্ধ করতে পারবো?
–তা বলো না, বউমা কী বলছিল, বলো না?
–বলবে আবার কী! দুঃখের জ্বালায় বলছিল যে আমরা তাকে দেখে শুনে পছন্দ করে নিয়ে এসেছি, সে তো নিজে থেকে আসে নি, তাহলে কেন তার ওপর আমরা এত প্রতিশোধ নিচ্ছি–সে কী দোষ করেছে!
–তা তুমি কী বললে–তার জবাবে?
প্রীতি বললে–এ কথায় আমার কী জবাব থাকতে পারে বলে দিকিনি। আমিও তো মেয়েমানুষ। আমি নিজে মেয়েমানুষ হয়ে মেয়েমানুষের দুঃখ যদি না বুঝি তো কি তুমি বুঝবে, না তোমার ছেলে বুঝবে?
–তারপর?
প্রীতি বললে–তারপর আর কী, তারপর কেবল কাঁদতে লাগলো হাউহাউ করে। তা আমি আর কী করবো, আমারও খুব কষ্ট হলো দেখে। আমিও খানিক কাঁদলুম। বেচারী সারারাত ঠায় একপাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেবল কেঁদেছে আর জেগে কাটিয়েছে। তাই এখন একটু গরম দুধ খাইয়ে দিয়ে এলুম–
–আর খোকা? খোকা কোথায় গেল? সে—
হঠাৎ কানে এল বার বাড়ি থেকে যেন একটা কী আওয়াজ এল। যেন গোলমালের আওয়াজ। কান খাড়া করলেন চৌধুরী মশাই। বললেন–ও কীসের গোলমাল?
অনেকক্ষণ শব্দটা শুনলেন তবু কিছু বুঝতে পারলেন না। প্রীতির তখন অত সব বাজে কথা শোনবার সময় নেই। এত বড় সংসারের সব লোকের সমস্ত দাবি তার মুখের দিকেই হাঁ করে চেয়ে আছে। সারারাত তার ঘুম হোক আর নাই হোক তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। সকলেরই এক কথা : আমার দাবি মেটাতে হবে। কোথা থেকে টাকা আসছে, কে উপার্জন করছে, তা যাচাই করবার দায়িত্ব আমার নেই। আমি শুধু ঠিক সময়ে মাইনে পেলেই হলো আর খেতে পেলেই হলো। আমরা শুধু নেব, তোমার দেবার শক্তি-সামর্থ আছে কিনা সে তোমার বিবেচ্য। অথচ পান থেকে চুন খসলেই আমি তোমাকে দায়ী করবো। নইলে তুমি এ বাড়ির গিন্নী হয়েছিলে কেন?
