নয়নতারা কথাগুলো মন দিয়ে শুনলো। কিছু উত্তর দিলে না।
প্রীতি বললে–তার চেয়ে তুমি আর কটা দিন সহ্য করো, দেখি আমি কী করতে পারি। আমাকে একটু ভাবতে সময় দাও–
নয়নতারা হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে কিন্তু আমি কী অন্যায় করেছি মা, কী এমন অন্যায় করেছি যে, আমাকে এত শাস্তি পেতে হবে? আমাকে তো আপনারা দেখে শুনে পছন্দ করে বউ করে এনেছেন। আমি তো নিজে থেকে যেচে আপনাদের বাড়ি আসি নি যে এমন করে তার প্রতিশোধ নেবেন আমার ওপর–
বলতে বলতে নয়নতারা যেন ভেঙে পড়লো। মনের জ্বালায় হয়তো আরো অনেক কিছু সে বলতো কিন্তু বলতে গিয়ে তার গলাটা কথার মাঝখানেই ঝুঁজে এল।
প্রীতি নয়নতারার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললে–দোষ তুমি কেন করতে যাবে বউমা, সব দোষ আমার আর আমার ছেলের। আমরাই দোষ করেছি। আমার ছেলে বিয়েই করতে চায় নি। তবু তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তা তুমি তার জন্যে ভেবো না বউমা, প্রথম প্রথম অনেক ছেলেই বিয়ে করতে চায় না, কিন্তু শেষকালে তো সবই ঠিক হয়ে যায়। তখন আবার ছেলেমেয়ে হয়ে ঘর একেবারে ভরে যায়। এরকম অনেক দেখেছি আমি। আমাদের সুলতানপুরেই আমি কত দেখেছি। কিন্তু তুমি যেন এ নিয়ে এখন সাতকান কোর না। কথাটা যদি একবার পাড়ার লোকের কানে যায় তো আর রক্ষে থাকবে না। তখন গাঁয়ে এই নিয়ে ঢি-ঢি পড়ে যাবে একেবারে–
হঠাৎ বাইরে থেকে ডাক এলো—বউদি–
প্রীতি বললে–ওই গৌরী ডাকছে, এখনই বিষ্টুর মা রান্নাঘরে ঢুকবে, গৌরী ভাঁড়ারের চাবি চাইতে এসেছে। আমি এখনই আসছি, উনুনে আগুন দিলেই তোমার জন্যে একটি গরম দুধ নিয়ে আসছি। সারারাত জেগে আছো, শরীরটা একটু সুস্থ হবে–
বলে বাইরে চলে গেল প্রীতি।
.
কিন্তু সেই সেদিন থেকেই যেন শনির দৃষ্টি পড়লো চৌধুরী বংশের ওপর। সেই যেদিন কালীগঞ্জের বউ এসেছিল নতুন বউ-এর মুখ দেখতে সেই দিন থেকে। রানাঘাট থেকে লোক এসে খবর দিয়ে গেল যে, উকিলবাবু খবর দিয়েছেন কোর্টে আর একটা মামলা উঠেছে। চৌধুরী মশাইকে একবার সেখানে যেতে হবে।
জমি-জমা থাকলেই অবশ্য মামলা-মোকর্দমা থাকবে। কথাটা তা নয়। কিন্তু এটা বড় জটিল মামলা। উকিলবাবুর চিঠিটা দুদিন আগেই এসেছিল। চৌধুরী মশাই ভেবেছিলেন বউমা কেষ্টনগর থেকে আসার পর ছেলের কী মতিগতি হয় তা দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে রানাঘাটে যাবেন। বাবাজীকেও তাই বলেছিলেন। বাবাজী বলেছিলেন–তুই নিশ্চিন্ত থাক, আমি তো রইলুম–আমি সব ঠিক করে দেব–
চৌধুরী মশাই বলেছিলেন–কিন্তু আপনার দিগ্বন্ধনের কিছু ফল দেখে না গেলে বড় ভয় করছে বাবাজী, জানেনই তো আমার ওই একমাত্র সন্তান, ওই একই ছেলে। যদি কিছু উল্টো ফল হয় তো তখন বড় মুশকিলে পড়বো। এখনও পর্যন্ত বাবাকে কিছুই বলা হয় নি।
–না বলেছিস ভালো করেছিস। গুহ্য কথা কাউকে বলতে নেই—
আগের দিনই এই সব কথা হয়ে গিয়েছে। পরের দিন যখন ঘুম থেকে উঠলেন তখন দেখলেন বেশ বেলা হয়ে গিয়েছে। তিনি মস্ত বড় বিছানায় একলাই শুয়ে আছে, পাশে কেউ নেই। ধড়মড় করে বিছানা থেকে উঠে পড়লেন। ঘরের বাইরে এসে দেখলেন ভেতর বাড়িতে সেদিনকার কাজকর্ম সব শুরু হয়ে গিয়েছে। গৃহিণীর দেখা পাবার জন্যে একবার রান্না বাড়ির দিকে উঁকি দিলেন। সেখানেও তিনি নেই।
কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। ফিরেই যাচ্ছিলেন। তারপর চলে গেলেন কুয়োতলার দিকে। কদিন আগেই বাড়িতে বিয়ে হয়ে গেছে। বড় বড় গর্ত খুঁড়ে ভিয়েনের উনুন তৈরী করা হয়েছিল। সে উনুন আর কাজে লাগবে না। পোড়ামাটির ভাঙা ঢ্যালাগুলো তখনও জমা হয়ে রয়েছে সেখানে। কুয়োতলার পাশে মুখ-হাত-পা ধোবার বড় বড় মাটির জালা রাখা ছিল। সেখান থেকে জল নিলেন। একটু পরেই রোজকার কাজকর্ম শুরু হয়ে যাবে। তখন আসবে কৃষাণ, কয়াল, প্রজা-পাঠক। তখন চৌধুরীদের বারবাড়ি একেবারে গম্-গম্ করে উঠবে। বিধু কয়ালের ছেলে শশী কয়াল সেই নিয়মমত সরষে ঝাড়তে বসবে। মাঠ থেকে সরষে গাছগুলো এনে গোবর-দেওয়া উঠোনের ওপর ছড়িয়ে রেখেছে। গোছ-গোছ শুকনো সরষে গাছের আঁটি। সেগুলোকে ঝাড়তে হবে মাড়তে হবে। তারপর দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে মেপে মেপে মরাইতে তুলবে। রজব আলিও আসবে দামড়া দুটোর তদারক করতে। তাদের খাওয়ানো তাদের সেবা-শুশ্রূষার ভারও তার ওপর। তারপর যেদিন চৌধুরী মশাই সদরে যাবেন সেদিন ভোর থেকেই গরুর গাড়ির চাকায় রেড়ির তেল মাখাবে। গাড়ির ছইটা ঝাড়বে মুছবে। পাতবার শতরঞ্জিটা পুকুরে নিয়ে গিয়ে কেচে রোদে শুকোতে দেবে। শুধু শশী কয়াল, রজব আলিই নয়, হাজারটা লোকের হাজার রকম কাজের বরাদ্দ। সবাই কাজ করছে কিনা তার তদারক করার কাজ চৌধুরী মশাই-এর। এই এতগুলো লোক ঠিকমত কাজ করলেই তবে চৌধুরী বংশের সংসার যন্ত্রের চাকা নিয়ম করে ঘুরবে।
গৌরী তখন রান্নাবাড়ির দিক থেকে আসছিল। তারও সকাল বেলা থেকে ফুরসৎ নেই। চৌধুরী মশাইকে ভেতর বাড়িতে আসতে দেখে একটু পাশ দিচ্ছিল। চৌধুরী মশাই তাকে দেখেই জিজ্ঞেস করলেন–হ্যাঁ রে, তোর বৌদি কোথায়?
প্রীতিও সেই সময়ে ছেলের ঘর থেকে দুধের বাটি হাতে নিয়ে এই দিকে আসছিল।
বললে–কী হলো, তুমি ঘুম থেকে উঠেছ?
চৌধুরী মশাই কাছে এগিয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন–বউমার কী খবর?
