সত্যিই প্রীতির বুকটার কাছে তখন কেমন ব্যথায় টনটন করছিল। এ রকম প্রায়ই হয় প্রীতির। একটু অনিয়ম হলেই এই রকম হয়। বিয়ের হাঙ্গামে কত দিন ধরে ভালো করে ঘুমই হয় নি। তার ওপর বিয়ের হাঙ্গামা চুকে যাবার পরও অনিয়ম চলছে। হার্টের আর দোষ কী?
প্রীতি বললে–ওরে, ভোর হয়ে এসেছে, এবার তুই শেকলটা খুলে দে–আর কষ্ট দিস নে খোকাকে–
প্রকাশও বুঝলো আর দরজায় শেকল দিয়ে রেখে লাভ নেই।
বললে–খুলে দিই তাহলে?
প্রীতি বললো, খুলে দে।
প্রকাশ বাইরে থেকে চেঁচিয়ে সদার নাম ধরে ডাকলে–সদা-সদা–
বলে শব্দ করে শেকলটা খুলে দিলে। আর খানিক পরেই ভেতর থেকে নিঃশব্দে দরজাটা খুলে বেরিয়ে এল সদানন্দ।
প্রকাশ মামা সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। সদানন্দ তার দিকে একবার চেয়ে দেখেই মুখ ফিরিয়ে নিলে। তারপর প্রকাশ মামাকে পাশ কাটিয়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল।
প্রকাশ মামা তাকে গিয়ে ধরলে। বললে–কী রে, এত সকালে উঠে পড়লি যে? তুই ঘুমোস নি নাকি?
তাকে দেখে মনে হলো সদানন্দ যেন রাগে ফুলছে। প্রকাশ মামার কথায় কান না দিয়ে যেদিকে যাচ্ছিল সেইদিকেই চলতে লাগলো। প্রকাশ মামা সদানন্দর সামনে গিয়ে তার রাস্তা আটকে দাঁড়ালো।
বললে–কী রে, তুই কি আমার সঙ্গে কথাই বলবি না নাকি? আমার ওপর রাগ করলি কেন? আমি তোর কী করলুম?
সদানন্দ বললে–তুমি ছাড়ো আমাকে–
প্রকাশ মামা বললে–তা ছাড়বো না তো কি তোকে আমি ধরে রাখবো? কিন্তু তোর কী হলো তা আমাকে বলবি তো?
সদানন্দ বললে–তুমি কেন মিছিমিছি আমাকে বিরক্ত করছে প্রকাশ মামা? আমার শরীর খারাপ, কিছু ভালো লাগছে না–
প্রকাশ মামা সদানন্দর সঙ্গে সঙ্গে চলতে চলতে বললে–কেন, শরীর খারাপ কেন? রাত্তিরে ঘুম হয় নি?
সদানন্দ রেগে উঠলো। বললে–তোমরা কি আমাকে পাগল করতে চাও প্রকাশ মামা? আমাকে কি তোমরা মেরে ফেলতে চাও? তোমরা কী পেয়েছ আমাকে? আমি পাগল?
প্রকাশ মামা বললে–দূর, তুই পাগল কেন হতে যাবি, তুই যে কাণ্ড করছিস তাতে আমাদেরই পাগল করে ছাড়বি–
সদানন্দ বললে–তার চেয়ে তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও প্রকাশ মামা, আমার যেদিকে দু চোখ যায় সেই দিকেই চলে যাই। আমার কিছু ভালো লাগছে না–
প্রকাশ মামা সদানন্দর পিঠে হাত বুলোতে বুলোত বললে–না না, অমন কাজ করিস নি তুই সদা, তুই লেখাপড়া-জানা ছেলে, পাগলামি করিস নি তুই। কী হয়েছে তাই তুই বল্ আমাকে–
সদানন্দ রেগে গেল। বললে–কাকে কী বলবো? কতবার বলবো? কেউ যদি আমার কথা না শোনে তো আমি কী করবো? কেন তুমি আমাকে বিয়ে করতে বললে প্রকাশ মামা? কেন আমাকে তোমরা মিছিমিছি ধাপ্পা দিলে? কেন তোমরা আমার কথা রাখলে না? কেন তোমরা কালীগঞ্জের বউএর এমন সর্বনাশ করলে? কেন তোমরা তাকে তার দশ হাজার টাকা দিলে না? কেন? কেন দিলে না, কেন?
প্রকাশ মামা বললে–কেন টাকা দিলে না তা তোর দাদু জানে, তোর বউ কী দোষ করলো? তোর দাদুর দোষের জন্যে তুই তা বলে তোর বউএর ওপর প্রতিশোধ নিবি?
ওদিকে প্রীতি তাড়াতাড়ি খোকার ঘরে ঢুকে পড়েছে। ভেতরে ঢুকেই ডাকলে বউমা—
নয়নতারা তখনও খাটের কোণের দিকে ঠায় সেই একই ভাবে বসে ছিল। শাশুড়ীর গলার শব্দে তার ঘোমটাটা যেন একটুখানি কেঁপে উঠলো। কিন্তু তখনই সে নিজেকে সামলে নিয়েছে। শাশুড়ী যখন সামনে এসে দাঁড়ালো তখন চোখের জলে সব কিছু ঝাপসা হয়ে গিয়েছে।
শাশুড়ী সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলে–কী বউমা, কাঁদছো যে? কী হয়েছে?
নয়নতারা তার মাথাটা আরো নিচু করে নিলে। যেন পোড়ামুখ দেখাতেও তার লজ্জা হচ্ছিল।
শাশুড়ী আবার বউমাকে জিজ্ঞেস করলে–কী হলো? কথা বলছো না যে? আজ তো খোকা রাত্তিরে তোমার ঘরে ছিল? আজ তো আর পালিয়ে যায় নি?
তবু নয়নতারার মুখ দিয়ে কোনও কথাই বেরোল না। তার মাথাটা যেন আরো নিচু হয়ে গেল।
প্রীতি এবারে নয়নতারার চিবুকে হাত দিয়ে তার মুখটা নিজের দিকে তুলে ধরলে। নয়নতারা সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় ঘৈন্নায় অপমানে চোখ দুটো বুঁজিয়ে ফেলেছে। কিন্তু চোখ বুঁজলেই কি আর চোখের জলকে আটকানো যায়! সেটা তখন অঝোর ধারায় গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
প্রীতি বললে–আমার কথার জবাব দাও বউমা, আমি জানতে চাইছি আজকে খোকা তোমাকে কী বললে? তোমার সঙ্গে কোনও কথা বলেছে সে?
নয়নতারা মুখে কিছু বললে না। শুধু ঘাড় নেড়ে জানালে—না–
–কোনও কথা বলে নি?
–না।
–তা হলে সমস্ত রাত ঘুমিয়ে কাটালে?
–না।
–সমস্ত রাত জেগে ছিলে? বলো, জবাব দাও? দুজনেই জেগে কাটালে অথচ দুজনের মধ্যে কোনও কথা হলো না মোটে? সেই জন্যেই বুঝি তোমার চোখ দুটো এত ফুলে উঠেছে? একে রাত জাগা তার ওপর সমস্ত রাত কেঁদেছ, চোখ তো ফুলবেই।
তারপর এ সমস্যার কী সমাধান করবে তা ভেবে না পেয়ে প্রীতি বললে–তা হলে তুমি একটু এখন শুয়ে পড় বউমা, একটু ঘুমোবার চেষ্টা করো, ভোর হয়ে এসেছে, আমি বাসি কাপড় বদলে তোমার জন্যে একটু দুধ গরম করে আনতে বলি
বলে প্রীতি চলে যাচ্ছিল। নয়নতারা এবার কথা বলে উঠলো। বললে—মা–
–কী বউমা, আমাকে কিছু বলবে? কী বলতে যাচ্ছিলে, বলো?
নয়নতারা আধ-ফোটা গলায় বললে–আমাকে বাবার কাছে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করে দিন–
প্রীতি স্তম্ভিত হয়ে গেল বউমার প্রস্তাব শুনে। বললে–ছি বউমা, অমন কথা বলতে নেই, লোকে বলবে কী? তাতে তোমারও নিন্দে হবে, তোমার শ্বশুরবাড়িরও নিন্দে হবে। বলবে চৌধুরী মশাই এমন বউ করেছিল যে সে শ্বশুর-শাশুড়ীকে মানিয়ে চলতে পারলে না। আর তোমার বাবার কথাটা একবার ভাবো তো! সবে তিনি এত বড় একটা শোক সামলে উঠেছেন, এর পরে যদি শোনেন যে তোমারও কপাল ভেঙেছে তা হলে কি আর তিনি বাঁচবেন?
