প্রকাশ বললে–রাত তো আর বেশি নেই, ভোর তো হয়ে এল—
তারপর যেন কী ভাবলে। বললে–দাঁড়াও, একটা মতলব বার করেছি। আমি একবার খিড়কির দরজা খুলে বাগানের দিকে যাই; ওখানে গিয়ে সদার ঘরের জানালা যদি খোলা থাকে তো উঁকি মেরে দেখি যে কী করছে তারা–তুমি এখেনে দাঁড়াও–
বলে আর সেখানে দাঁড়ালো না প্রকাশ। বারান্দা পেরিয়ে উঠোন। ভেতরবাড়ির উঠোন। উঠোনে নেমে পশ্চিম দিক দিয়ে বাগানের বেড়ার দরজা। সেই দরজা খুলে ভেতরে বাগান। ভোর হয়-হয়। চাঁদটা ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে। গাছ-পালা মাড়িয়ে প্রকাশ একেবারে সদার ঘরের উত্তর দিকের জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। সেদিকটা ঝোপঝাড়। কলাগাছ, নেবুগাছের ঝাড়। মাথায় কাটা ফুটে রক্তারক্তি হবার মত অবস্থা। গিয়ে দেখলে জানালার পাল্লা দুটো খোলা। টিপি-টিপি পায়ে প্রকাশ মাথা নিচু করে সেখানে গিয়ে উঁকি দিলে। উঁকি দিয়ে দেখে অবাক।
প্রকাশ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা দেখলে।
তারপর যে পথ দিয়ে গিয়েছিল আবার সেই পথ দিয়েই উঠোন পেরিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লো। প্রীতি সেখানেই হাঁ করে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রকাশ আসতেই জিজ্ঞেস করলে– কী রে, কী দেখলি? দেখতে পেলি কিছু? কী করছে ওরা? ঘুমোচ্ছে? ঘুমিয়ে পড়েছে?
প্রকাশ বললে–তুমিও দেখবে এসো না–
–আমি? আমি আবার কী দেখবো?
প্রকাশ বললে–চলো না, তুমি তোমার ছেলের কাণ্ড নিজের চোখেই দেখবে চলো না।
প্রীতি বললে–তুই নিজেই বল না, আমি আবার কী দেখবো?
প্রকাশ নাছোড়বান্দা। বললে–না, তোমার নিজের চোখেই দেখা উচিত, এসো, আমার সঙ্গে এসো। তোমার ছেলের কাণ্ড দেখবে এসো–
বলে প্রকাশ দিদির একটা হাত খপ করে ধরে ফেললে। ধরে টানতে লাগলো। বললে– এসো, এসো, দেখবে এসো–
প্রীতি বললে––ওরে না না, হাত ছাড়, আমি মা হই, আমার দেখতে নেই, আমার দেখা ঠিক নয়–
কিন্তু প্রকাশ দিদির কথা শুনবে, এমন পাত্রই সে নয়। সে দিদির হাত ধরে টানতে লাগলো। টানতে টানতে একেবারে বাগানের ভেতরে নিয়ে গেল। তারপর হাতটা ছেড়ে দিলে। বললে–এবার একটু আস্তে এসো। পা টিপে টিপে এসো। শুকনো পাতা যেন মাড়িয়ে ফেলো না, শব্দ হবে।
প্রীতি আবার একবার আপত্তি করতে যাচ্ছিল। প্রকাশ বললে–না, তোমার ছেলের কীর্তি তোমার নিজের চোখে দেখা ভালো। নইলে আমার মুখ থেকে শুনলে তুমি বিশ্বাস করবে না। এসো–
প্রীতিও প্রকাশের পেছন পেছন পা টিপে টিপে চলতে লাগলো। উত্তর দিকের দেয়ালের জানালার কাছে এসো প্রকাশ গলা নিচু করে প্রীতির কানের কাছে ফিসফিস্ করে বললে–এইখান দিয়ে ভেতরে উঁকি মেরে দেখো–
প্রীতির যেন কেমন সঙ্কোচ হলো। বললে–আমি দেখব?
প্রকাশ বললে–হ্যাঁ, দেখ না, চাঁদের আলো ঘরের মধ্যে গিয়ে পড়েছে, সব স্পষ্ট দেখতে পাবে–
প্রীতি বললে–কিন্তু আমি যে মা হই রে, আমাকে দেখতে নেই যে
প্রকাশ বললে–একটু আস্তে কথা বলো না, শুনতে পাবে যে–দেখো এবার ভেতরে উঁকি মেরে দেখ, কিছু অন্যায় হবে না। আমি বলছি তোমার কিছু অন্যায় হবে না–
প্রীতি কী আর করবে। মাথাটা উঁচু করে জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতরে উঁকি দিলে।
দেখে অবাক হয়ে গেল। দেখলে খোকা ঘরের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটা চেয়ারের ওপর মাথা নিচু করে চুপ করে বসে আছে। মুখের চেহারাটা যেন মনে হলো গম্ভীর-গম্ভীর। যেন খুব কষ্ট পাচ্ছে মনে মনে। আর খাটের দক্ষিণ দিকে বিছানার একটা কোণের ওপর পেছন ফিরে পা ঝুলিয়ে বসে আছে বউমা। মাথায় একগলা ঘোমটা। কারো মুখে কোনও সাড়া নেই শব্দ নেই। যেন দুজনেই বোবা।
তা হলে কি সারা রাতই ওরা ওইভাবে রাত কাটিয়েছে নাকি?
প্রীতির দু-চোখ ভরে জল এসে গিয়েছিল। আর দেখতে ভালো লাগলো না। তাড়াতাড়ি জানালা থেকে চোখ নামিয়ে নিলে।
প্রকাশ বললে–কী? কী দেখলে দিদি?
প্রীতি কিছু কথা বললে–না। যে রাস্তা দিয়ে এসেছিল সেই রাস্তা দিয়েই আবার ফিরে চলতে লাগলো। তারপর বাগান পেরিয়ে উঠোনে এসে পড়লো।
প্রকাশও পেছন-পেছন আসছিল। এতক্ষণ সেও কোনও কথা বলে নি। এবারে উঠোনে পড়েই জিজ্ঞেস করলে–দেখলে তো? দেখলে তো তোমার ছেলের কাণ্ড?
তবু প্রীতির মুখে কোনও কথা নেই। সে যেন খানিকক্ষণের জন্যে বোবা হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে বারান্দায় উঠলো।
প্রকাশ বললে–কী হলো? তুমি কথা বলছে না যে?
প্রীতি বললে–আমি আর কী বলবো?
প্রকাশ বললে–কী অদ্ভুত ছেলেই পেটে ধরেছিলে তুমি দিদি! ধিক্ তোমার ছেলেকে, ধিক্! আমি এতদিন ধরে চেষ্টা করেও ওকে মানুষ করতে পারলুম না। আমারই লজ্জা হচ্ছে, বুঝলে দিদি। লজ্জা আমারই হচ্ছে, অথচ অত সুন্দরী দেখে ওর বউ এনে দিলুম। আমি জানতুম আগুনের পাশে ঘি রাখলে ঘি গলে জল হয়ে যায়, এ যে দেখছি একেবারে আইস, একেবারে বরফ—
প্রীতি তখনও যেন নিজের মনেই কী ভাবছিল। বললে–আমার মনে হয় ওর বিয়ে না দিলেই ভালো হতো রে। ও তখন আপত্তি করেছিল। কেন যে তখন আমি অত জোর জবরদস্তি করলুম। কী জানি, মা হয়ে ওর ভাল করলুম কি মন্দ করলুম–আর পরের বাড়ির একটা নিরপরাধ মেয়ের জীবনটাও মাঝখান থেকে বোধ হয় নষ্ট করে দিলুম–
প্রকাশ সান্ত্বনা দিলে। বললে–এসো, তুমি ও নিয়ে আর ভেবো না, তোমারও তো আবার কথায় কথায় বুক ধড়ফড় করে। আর ভেবো না তুমি। আমি সব ঠিক করে দেব, আমাকে দেখছি সেই মাদুলিই আনতে হবে–
