তারপর আবার অন্য দিকে পাশ ফিরলো প্রীতি। আবার সেই চোখ বুজে ঘুমের সাধনা। আবার সেই হাজারটা ভাবনা এসে মাথায় ঢোকে। এতক্ষণ খোকা আর বউমা ঘরের মধ্যে কী করছে কে জানে। হয়ত দু’জনের ভাব হয়ে গেছে। এতক্ষণে হয়ত দুজনে কথা বলছে।
আর প্রকাশ?
প্রকাশের কথা মনে আসতেই ঘুমটা যেন আসতে আসতে আরো দূরে পালিয়ে গেল। প্রীতি দু’চোখ খুলে অন্ধকারের মধ্যেই চেয়ে দেখলে। পাশেই চৌধুরী মশাই ওপাশ ফিরে ঘুমে অসাড়। পাশে একজন মানুষ অমন করে অঘোরে ঘুমোলে কি কারো ভালো লাগে? অথচ কাল সকাল থেকেই আবার সংসারের চাকা ঘুরতে আরম্ভ করবে। ভোরবেলা দেখা হলেই গৌরী ভাঁড়ারের চাবি চাইবে। বিষ্টুর মা জিজ্ঞেস করবে কী রান্না হবে। খাবে সবাই-ই কিন্তু কী রান্না হবে তা ভাবতে হবে একা প্রীতিকেই। যেন সংসার তার একারই, আর কারো নয়।
কিন্তু না, প্রকাশের কথাটা মনে পড়লেই প্রীতি বিছানা ছেড়ে উঠলো। জ্বালাতন হয়েছে তার। সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে রাত্তিরে যে একটু আরাম করে ঘুমোবে তারও উপায় নেই। গায়ের কাপড় ভালো করে সামলে নিয়ে প্রীতি ঘর থেকে বেরোল।
রাত কত হয়েছে কে জানে! কোনও দিক থেকে কারো কোনও শব্দ আসছে না। প্রীতি আস্তে আস্তে খোকার ঘরের দিকে গেল।
কিন্তু খোকার ঘরের সামনে গিয়ে অবাক। দেখে প্রকাশ সেই ঘরের দরজার সামনে খালি মেঝের ওপর শুয়ে নাক ডাকাচ্ছে।
প্রীতি ডাকলে–এই প্রকাশ, প্রকাশ–এই প্রকাশ–
প্রকাশের ঘুম নয় তো যেন হাতীর ঘুম। কেউ যদি তাকে কাঁধে করে তুলে নিয়েও যায় তবু তার ঘুম ভাঙবে না।
–এই প্রকাশ, প্রকাশ—
এবার তার গায়ে ধাক্কা দিয়ে ঠেলতে হলো। মোষের মত ঘুমোচ্ছে। তার কাপড় খুলে নিলেও যেন সে টের পাবে না, এমন ঘুম।
ধাক্কা খেয়ে প্রকাশ ধড়মড় করে উঠে বসলো। বললে–কে? কে? কী হয়েছে?
একে ঘুমের জড়তা, তার ওপর মাঝরাত। তারপর একটু যেন জ্ঞান ফিরলো। প্রীতির মুখের দিকে চাইলে। বললে–কী হলো? আমি কোথায়?
প্রীতি বললে–আমি তোর দিদি রে। আমি তোর দিদি কথা বলছি–
দিদির কথা শুনে যেন ধাতস্থ হলো প্রকাশ। বললে–তাই বলো! তা অমন করে ঠেলতে আছে? আমি তো জেগেই ছিলুম। শুধু চোখ দুটো বুজিয়ে রেখেছিলুম আর কি। তা তুমি আবার কেন কষ্ট করে আসতে গেলে? আমি যখন ভার নিয়েছি তখন তুমি অত ভাবছো কেন?
সে-সব কথায় কান না দিয়ে প্রীতি বললে–খোকা আর দরজা ঠেলেছিল? ধাক্কা দিয়েছিল ভেতর থেকে?
–খোকা? সদা? কই, না তো। ধাক্কা দিলে তো আমি শুনতে পেতুম! আমি তো জেগেই আছি–
প্রীতি যেন মনে মনে খুশী হলো।
–তাহলে এতক্ষণে খোকার ভাব হয়ে গেছে বউমার সঙ্গে, কী বল–
প্রকাশ বললে–আরে, তোমাকে তো আমি বলেই রেখেছি যে তোমার কিচ্ছু ভাবনা নেই। যতক্ষণ আমি আছি তুমি গ্যাঁট হয়ে পায়ের ওপর পা দিয়ে চুপ করে বসে থাকো না। আমিই সদার বউ পছন্দ করে দিয়েছি, ওর দায়িত্ব আমারই–
প্রীতি বললে–সে তো আমি জানি রে। কিন্তু তোর জামাইবাবু যে ভেবে ভেবে ছটফট করছে। ও নিজেও ভাবছে, আমাকেও ভাবিয়ে মারছে।
প্রকাশ বললে–কেন যে জামাইবাবু এত ভাবছে। তা বুঝতে পারছি না। তুমি কি বলতে চাও আমি মেয়েমানুষ কখনও দেখি নি, না মেয়েমানুষকে কখনও বিয়ে করি নি? আমার ও তো এককালে বিয়ে হয়েছে গো! আগুনের পাশে ঘি রাখলে কী হয় তা কি আমি জানি না বলতে চাও? তুমিই বলো আগুনের পাশে ঘি রাখলে কী হয়, তুমিই বলো? তোমারও তো বিয়ে হয়েছে–
প্রীতি কিছু বুঝতে পারলে না। প্রকাশ যে কথা বলছে সে তো সোজা হিসেব। কিন্তু সংসারের সব হিসেব যদি অত সোজা হিসেব হতো তাহলে তো আর কোনও ভাবনাই থাকতো না। তাহলে কি আর প্রীতির এত ভাবনা না চৌধুরী মশাই-এরই এত খরচান্ত। চৌধুরী মশাই যে কেমনভাবে দিন কাটাচ্ছেন তা বাইরের কেউ জানতে পারে না। কিন্তু প্রীতি তো মানুষটার যন্ত্রণার কথা আন্দাজ করতে পারে! কর্তাবাবুকে পর্যন্ত এসব ব্যাপার কিছু বলা হয় নি। কর্তাবাবু জানে সকলে যেমন সংসার-ধর্ম করে তাঁর নাতিও তেমনি সংসারধর্ম করে যাচ্ছে। রেল বাজারের কাঞ্চন স্যাকরাকে গয়না গড়াতে দিয়েছে, বউমার ছেলে হলে তাই দিয়ে তার মুখ দেখবেন। কর্তাবাবুর আগ্রহটাই যেন সব চেয়ে বেশি। বউমার ছেলে হলে কর্তাবাবুই সব চেয়ে খুশী হবেন। কিন্তু বাড়িতে যে শাঁখকাঁসর-ঘণ্টা বাজছে তাঁকে সে-সম্বন্ধে কিছুই বলা হয় নি। তিনি ভাবছেন বেহারি পালের বাড়িতে পূজো হচ্ছে। এখন যদি আসল খবরটা তাঁর কানে যায় তখন কী হবে?
প্রকাশ বললে–তুমি ঘুমোত যাও দিদি, তুমি কেন এখানে দাঁড়িয়ে কষ্ট করবে? এই খুপরির মধ্যে–
প্রীতি বললে–আর তুই? তুই আর কতক্ষণ শেকল বন্ধ করে দরজা আগলে থাকবি?
প্রকাশ বললে–কিন্তু দরজার শেকল খুলে দিলে যদি সদা ঘর থেকে পালিয়ে যায়?
প্রীতি বললে–তুই আস্তে আস্তে শেকল খুলে দে না, আওয়াজ না হলেই তো হলো। ও তো আর টের পাচ্ছে না। আর তা ছাড়া খোকা আর বউমা দুজনেই এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে নিশ্চয়ই
–কী যে তুমি বলো তার ঠিক নেই। এই বলতে গেলে প্রথম ওদের দেখা, আজ রাত্তিরে কখনও ঘুমোয়? আমি তো আমার ফুলশয্যের রাত্তিরে ঘুমোই নি। তুমি ঘুমিয়েছিলে?
প্রীতি সে কথার ধার দিয়ে গেল না। বললে–তাহলে তুই কী করবি? এখেনে সারা রাত বসে থাকবি এমনি করে?
